সূচনাঃ অ্যান্টিবায়োটিক মানুষের জীবন রক্ষাকারী হিসেবে আবিষ্কৃত হলেও এর অপব্যবহার এটিকে মানুষের জীবনহরনকারী হিসেবে প্রমাণিত করছে। আমাদের আজকের ব্লগ এই বিষয়কে ঘিরেই।



আজকের শেষ রোগীটি দেখার জন্য অপেক্ষা করছে ডাঃ মেহতাব। ক্লান্ত লাগছে আজ খুব। বয়স হয়েছে তো আসলে। শরীর আগের মত সার্ভিস দিতে পারছে না। আগামী মাসে ৫৬ হবে। বুড়োই বলা যায় আমাকে। ভাবলো মেহতাব। একটু হাসিও চলে আসলো মুখে।

আজ সোমবার। আজকের দিনটা সে বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত রাখে। এনজাইম পেশেন্ট কেয়ার এর সাথে এই উদ্যোগে ডাঃ মেহতাব যুক্ত আছেন অনেক দিন হল। সকালের ফ্লাইটে চলে আসেন এনজাইম টিমের সাথে আর সন্ধার ঠিক পরপর যে ফ্লাইটটা থাকে সেটাতে আবার ঢাকা ফিরে যায়। মাঝের সারাদিন নিজের ও আশেপাশের গ্রাম থেকে আসা রোগীদের দেখেন।

ঢাকাতে মেহতাবের পসার বেশ ভালো। প্রচুর আয় করেছে সে এই জীবনে। সফল মানুষ। সৃষ্টিকর্তার কাছে সেজন্য তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারণেই তার মনে হয় যে, যা কিছু আয় করেছে তার সামান্য অংশও যদি সে মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতে পারে তাতেও হয়ত সৃষ্টিকর্তা তার জ্ঞাত অজ্ঞাত পাপ থেকে মুক্তি দেবেন। ক্লিশে শোনালেও মানুষের সেবার জন্যই মেহতাব ডাক্তারি পড়াশোনা করেছিলেন। এরপরে সবার ক্ষেত্রে যা হয়, তিনিও জীবন জীবিকার প্রয়োজনে নিজের ইচ্ছাকে চাপা দিয়ে চোখ মুখ বুজে শুধু আয় করেছেন। গত পাঁচ ছয় বছর যাবত তার মনে হয়েছে যে আর না। অনেক কামিয়েছি। এবার মানুষের জন্য কিছু করি।

অ্যান্টিবায়োটিক- হয়ে যাচ্ছে অজানা অপকার

চিন্তায় বাধা পড়লো রোগীর সালামে।

– আসসালামু আলাইকুম ডাক্তার সাহেব।

– ওয়ালাইকুম সালাম। বসুন।

রোগী বসলে মেহতাব তার নাম জিজ্ঞেস করলেন।

– জ্বে আমার নাম রশিদ ব্যাপারী।

-আচ্ছা। রশিদ ভাই কী করেন?

– জ্বে আমি বদলার কাম করি।

– বদলা দেন মানে দৈনিক চুক্তিতে কাজ করেন তাই তো?

– জ্বে।

– বাড়িতে কে কে আছে?

– জ্বে বৌ বাচ্চা।

– বাচ্চা কয়জন?

– জ্বে আমার দুইটা মাইয়া।

– বয়স কেমন ওদের?

– একজনের পনারো। আরেকজনের আঠারো। বড়টার বিয়া দিয়া দিছি।

– আচ্ছা। এইবার বলেন আমার কাছে কেন আসছেন। আপনার সমস্যার কথা বলেন। কী সমস্যা হচ্ছে?

-ডাক্তার সাহেব, সমস্যা তেমন কিছু না। জ্বর।

– কবে থেকে?

– আজকে দুই সপ্তা।

– জ্বর মাপছেন কখনো?

– একবার মাপছিলাম। অনেক আছিল। একশ দুইশর মত।

– মেহতাব মুচকি হেসে বললো এমন কি সব সময়েই থাকে নাকি মাঝে মাঝে?

– জ্বে মাঝে মাঝে। সব সময় থাকে অল্প অল্প। কিন্তু থাকেই।

– ঔষধ টৌষধ কিছু খেয়েছেন আগে?

– জ্বে খাইছি।

– কী ঔষধ? নাম মনে আছে?

– জ্বে না, নাম মনে নাই তয় রুবেল বলছিল ঐটা নাকি এন্টিবাইটিক।

– অ্যান্টিবায়োটিক ?

– জ্বে জ্বে ঐটাই। এন্টিবাইটিক।

– আচ্ছা। এই “এন্টিবাইটিক” কি আগে খাইছেন? আর এই রুবেলটা কে? মেহতাব ইচ্ছে করেই আঞ্চলিক ভাষায় ঢুকে যাচ্ছে। যাতে রোগী ইজি ফিল করে।

– জ্বে। সব সময়ই তো খাই। ঠান্ডা লাগলে, গলা ব্যাতা করলে, জ্বর ট্বর আইলে। খাই তো। সব সময়েই খাই। আর রুবেল বাজারের ফার্মেসির কম্পাউন্ডার।

– আচ্ছা। আর কী কী সমস্যা হইতেছে শরীরে বলেন।

– শরীল ব্যাতা করে। জোর পাই না। কামেও যাইতে পারি না। গেলেও অল্প করলেই হাপায়া যাই। অনেক ঝামেলা। হজমেও সমস্যা হইতাছে। ঔষধ লেইখ্যা দেন ডাক্তার সাব। এই যন্ত্রনা ভালো লাগে না আর।

মেহতাব বুঝলো, অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার কারণে রশিদ ব্যাপারীর এই অবস্থা আজকে। আবার অন্যান্য কমপ্লিকেশনও থাকতে পারে। লিভার বা কিডনির। সেক্ষেত্রে টেস্ট করাতে হবে। তবে অ্যাটিবায়োটিকের বিষয়টিকেই মূল কারণ মনে হল তার কাছে। মেহতাব রশিদ ব্যাপারীকে বললো, রশিদ ভাই, আমি আপনাকে আগে আপনার সমস্যার কথা বুঝায়ে বলতেছি। এরপরে বলবো যে কী ঔষধ খাবেন। ঠিকাছে?

– জ্বে আচ্ছা।

অ্যান্টিবায়োটিক কী?

– আমাদের কোনো রোগ হইলে বেশিরভাগ সময়েই দেখা যায় জীবানুর কারণে হইছে। জীবানু কি রশিদ ভাই জানেন?

কিছুটা লজ্জা পেয়ে রশীদ জানালো যে সে জানে না।

– জীবানু হইলো ধরেন পোকার মত। তবে অনেক ছোট সাইজে। এত ছোটো যে চোখ দিয়া দেখা যায় না। এই জীবানুগুলাই আপনার আমার রোগের কারণ। যেমন আপনার যে জ্বর বা ঠান্ডা হইছে এইটা কোনো জীবানুর কারণেই হইছে। আমরা ডাক্তাররা আপনার মত রোগীদের কাছ থেকে আগে শুনি যে আপনার কী লক্ষণ আছে শরীরে। শোনার পরে মনে মনে ঠিক করি যে কোন জীবানুটা আপনার এই রোগ বানাইতেছে। এরপরে যখন নিশ্চিত হই কোন জীবানু এই আকামটা করতেছে তখন সেই জীবানুটারে মারার জন্য যে ঔষধ দরকার সেইটা দেই। রশীদ ভাই কি বুঝতেছেন আমি কী বলতেছি?

– জ্বে জ্বে, একদম পরিষ্কার।

– আচ্ছা। তো এই জীবানু আবার কয়েক ধরণের আছে। একটা ধরণের নাম ব্যাকটেরিয়া আর আরেকটার নাম ভাইরাস। তো এই ব্যাকটেরিয়া আর ভাইরাসও আছে অনেক ধরণের। এক জীবানুর ঔষধ আরেক জীবানুর জন্য কাজ করে না। আবার ধরেন এক ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের ঔষধ আবার আরেক ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের জন্য কাজ নাও করতে পারে। বুঝতে পারছেন?

– জ্বে।

– আচ্ছা। জীবানুর এই কথাটা একটু মাথায় রাখেন। এই ফাঁকে আরেকটা কথা বলে নেই।

রশিদ ভাই আপনি তো বদলা দেন। শারীরিক পরিশ্রম করেন। আপনি যে কাজটা করতে পারবেন সেই কাজটা কি আমি করতে পারুম? ধরেন সারাদিন রোদ্রের মধ্যে ক্ষেতে ধান নিড়াইতে বললে আমি পারুম?

–  জ্বে না ডাক্তার। আপনি এই কাম পারবেন না। আপনেরা বড়লোক মানুষ। আপনেগো শরীরে এই সব সইবো নে।

–  আসলে রশীদ ভাই সমস্যা বড়লোক গরীবে না। আমি পারুম না কারণ এই কাজ আমি করি না। যদি আপনার মত সব সময় করতাম তাইলে পারতাম। অভ্যাস হইয়া যাইতো। ঠিক কিনা?

–  তা ঠিকই বলছেন। আমিও তো প্রথমে পারতাম না, আস্তে আস্তে পারছি।

– ঐটাই। সারাদিন রোদের মধ্যে কাজ করা মানে হইলো বার বার করার কারণে যেমন আমাদের অভ্যাস হইয়া যায় ঠিক তেমন ভাবে একটা ঔষধ যেইটা হয়ত আপনার ঠান্ডার জন্য ঠিকাছে কিন্তু ঐটা যদি আপনি জ্বরের জন্য খাওয়া শুরু করেন তাইলে আস্তে আস্তে এই জীবানুরা এই ঔষধরে আর পাত্তা দেয় না। ঘন ঘন শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার মত অবস্থা আর কী।

– হেহেহে

–  তাহলে বিষয় হচ্ছে, ভাইরাসের ঔষধ ব্যাকটেরিয়ার জন্য দেয়া যাবে না। এক ব্যাকটেরিয়ার ঔষধ আরেক ব্যাকটেরিয়ার জন্য দেয়া যাবে না।

– জ্বে।

–  দিলে রোগ সাড়বে না। ঠিকাছে রশিদ ভাই?

–  জ্বে।

–  আপনার বাজারের ফার্মেসির রুবেল মিয়া যে অ্যান্টিবায়োটিক সুযোগ পেলেই আপনারে টাকার জন্য গছায়ে দেয় সেই অ্যান্টিবায়োটিক মানে হইলো এই ঔষধটা ব্যাক্টেরিয়া মারার জন্য। আবার সব ব্যাক্টেরিয়া না কিন্তু। কিছু কিছু ব্যাক্টেরিয়া। তো আপনার জ্বর বা ঠান্ডা যদি ভাইরাসের কারণে হয় তাহলে কি রুবেল মিয়ার অ্যান্টিবায়োটিকে কাজ করবে মনে করেন?

– জ্বে না ডাক্তার সাব। করবো না।

–  তারপরেও ধরলাম যে আপনার হয়ত ব্যাক্টেরিয়ার কারণেই জ্বর আসছে। কিন্তু কোন ব্যাক্টেরিয়ার কারণে এই জ্বর হয়েছে সেটা কি রুবেল মিয়া জানবে? সে কি ডাক্তার? ফার্মেসির কম্পাউন্ডারই যদি এটা জানতো তাইলে আমরা বছরের পর বছর পড়াশোনা করেছি কি ঘাস কাটার জন্য রশীদ ভাই?

– জ্বে না ডাক্তার সাব। এইটা তো অর জানার কথা না।

–  তাইলে এইবার বোঝেন যে কিছু হইলেই আপনাকে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দিয়ে কী ক্ষতি করছে আপনার। এখন আর রোগ দ্রুত সাড়তে চায় না। সময় লাগে। তো রশীদ ভাই আপনার যাতে মনে থাকে সেইজন্য আপনি আবারও বলতেছি দেখেন লিস্ট বানায়ে যে কী কী করলে শরীরে অ্যান্টিয়ায়োটিক কাজ করবে না আর। রোগ পাত্তা দিবে না ঔষধরে।

কী কী করলে শরীরে অ্যান্টিয়ায়োটিক কাজ করবে না

  • বিনা প্রেসক্রিপশনে ঘন ঘন অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া।
  • পুরো কোর্স শেষ না করে মাঝপথে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া বন্ধ করে দেয়া।
  • প্রয়োজনের তুলনায় স্বল্প ডোজের অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া।
  • ভাইরাসজনিত কোন অসুখে, অর্থাৎ যেসব ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময় পরে এমনি ভালো হয়ে যেত। বিশেষ করে শিশুদের অ্যান্টিবায়োটিক দিলে।

– এইবার কি রশীদ ভাই বুঝতে পারছেন?

– জ্বে। একদম পরিষ্কার।

– এইবার আরেকটা কথা বলি শোনেন। দেশে আইইডিসিআর নামে একটা প্রতিষ্ঠান আছে। রোগ টোগ নিয়ে গবেষনা করাই ওনাদের কাজ। তো ওনারা গবেষনা করে দেখছে যে আপনার মতন এইভাবে যখন ইচ্ছা তখন অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার কারণে আমাদের দেশে ১৭টার মত অ্যান্টিবায়োটিক এখন প্রায় কাজই করে না আমাদের শরীরে। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ দেখলেন?

– জ্বে।

ভাইরাসের সমস্যায় অ্যান্টিবায়োটিক খেলে কী হয়?

ভাইরাস জীবানুর সমস্যায় যদি আপনি ব্যাক্টেরিয়া জীবানুর ঔষধ মানে অ্যান্টিবায়োটিক খান তাহলে কী হবে দেখেনঃ

  • রোগ নিরাময় হবে না
  • অন্যদেরকেও অসুস্থ হওয়া থেকে আটকাতে পারবেন না
  • ক্ষতিকারক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে
  • অ্যান্টিবায়োটিকে আর কাজ করবে না আস্তে আস্তে


অ্যান্টিবায়োটিক খাবার আগে যা যা মনে রাখতে হবেঃ

· জ্বর হলেই অ্যান্টিবায়োটিক না। ব্যাকটেরিয়ার কারণেই জ্বর হয়েছে—এমন প্রমাণ হাতে পাওয়ার আগে অ্যান্টিবায়োটিক নয়।

· ওষুধ কয়দিন, কত ঘণ্টা পরপর খেতে হবে, তা ভালোমতো জানতে হবে। ঠিক সেই সময় মেনে ওষুধ খেতে হবে। কোনো একটা ডোজ খেতে ভুলে গেলে পরবর্তী ডোযে বেশি খাওয়া যাবে না।

· অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স শেষ হওয়ার আগেই শরীর ভালো লাগতে পারে। কিন্তু তাতে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া বন্ধ করা যাবে না। পুরো কোর্সটি শেষ করতে হবে।

· অন্য কেউ কোনো অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে জ্বর সারিয়েছেন—এমন কথা শুনে কখনো অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া যাবে না।

· শিশুদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সাবধানে অ্যান্টিবায়োটিক নিতে হবে। একই বয়সী আলাদা ওজনের দুই শিশুর অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স দুই রকম হতে পারে।

· খাওয়ার আগে অ্যান্টিবায়োটিকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জেনে নিতে হবে। কোনো অ্যান্টিবায়োটিকে প্রস্রাবের রং লাল হয়ে যায়, কোনোটাতে আবার পেটে গ্যাস হয়। কোনটা খেলে রুচি কমতে পারে বা বমি পেতে পারে। এগুলো জানা থাকতে হবে।

· কোনো কোনো অ্যান্টিবায়োটিক খেলে বেশি করে পানি পান করতে হয়। কিছু অ্যান্টিবায়োটিক আছে যেগুলো কিডনির সমস্যা থাকলে খাওয়া যাবে না। তাই নিজের শরীর স্বাস্থ্য সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য দিয়ে চিকিৎসককে সাহায্য করতে হবে।

সবচেয়ে আসল কথা হচ্ছে, কোনোভাবেই সকল তথ্য ডাক্তারকে না জানিয়ে, না বুঝে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া যাবে না। রুবেলরা বললেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া যাবে না। ঠিকাছে?

– জ্বে আচ্ছা।

এত বড় লেকচার দিয়ে মেহতাব নিজেও ক্লান্ত। রশীদকে আরও কিছু পরামর্শ দিতে দিতে প্রেসক্রিপশনে প্রয়োজনীয় ঔষধ আর পরামর্শ লিখে দিয়ে এক সপ্তাহ পর আবার দেখা করতে বলে রশীদকে বিদায় করে দিলো। এখনই ঝটপট করে বের হতে হবে। নইলে ফ্লাইটটা মিস করবে। সকালে আবার চেম্বারে যেতে হবে।


স্বাস্থ্য বিষয়ক আমাদের অন্যান্য ব্লগ পড়তে ক্লিক করুন এখানে