“অ্যাসিডিটি” এই শব্দের সাথে নিশান ছোটবেলা থেকেই পরিচিত। বাবা-মা থেকে শুরুকরে আশেপাশের এমন মানুষ সে কমই দেখেছে যাদের কোনো না কোনো সময় কোনো না কোনো কারণে অ্যাসিডিটি সমস্যা হয়েছে। সাধারণ সর্দি কাশির মতন হাভাতে রোগ বলে একে অনেকে গোনায় ধরে না ঠিকই, কিন্তু এই সমস্যা বেশিদিন ধরে চলতে থাকলে যে কি ক্ষতি করতে পারে সেটা নিশান এখন ভালোভাবেই বুঝতে পারছে।

বেশ কিছুদিন ধরেই বুক জ্বালাপোডা করার সমস্যা আর পেটে হালকা হালকা ব্যাথা অনুভূত হচ্ছিলো তার। কিন্তু ভার্সিটির পড়ার চাপ আর টিউশান ক্লাস নেবার ফাঁকে নিজের শরীরের দিকে খুব বেশি খেয়াল করার সুযোগ হয় না তার। গত তিন তিনেক ধরে বুকের জ্বালাটা বিশ্রী রকমের বেড়ে গেছে। এখন মুখটা কেমন তেঁতো হয়ে থাকে সারাক্ষণ। আগে খাবার খেলে পেটের ব্যাথাটা কমে যেতো। এই কয়দিনে খাবার আগে পরে পুরোদমে ব্যাথা চলছে।

কেমন একটা চিন্তা ভাব ধরে গেলো নিশানের মাথায়। সেই সাথে প্রথমআলোর একটা পোস্ট হঠাৎ করেই চোখের সামনে পরে গেলো যেটা তার বর্তমান অবস্থার সাথে যেমন মিলে যায় তেমনি আগ্রহের সৃষ্টি করে। সেখানে লেখা ছিলো,    

লোকমুখে যে সমস্যা “গ্যাস্ট্রিক” নামে পরিচিত সেটা আসলে অ্যাসিডিটি সংক্রান্ত সমস্যা যার প্রধান উপসর্গ হচ্ছে বুকে জ্বালা করা। সেখানে এও উল্লেখ আছে যে, পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি ১০০ জনে অন্তত ৩০ জন এই সমস্যায় ভোগেন।  শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বজুড়েই এই সমস্যা বিরাজমান। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ অনেকেই একটু–আধটু বুকজ্বালা বা গ্যাস নির্গমন হলেই মনে করে তার পেপটিক আলসারে সমস্যা হয়েছে এবং আসলে এ সমস্যা অনেকাংশে মানসিক।

এটুকু পরে নিজের অজান্তেই একবার ঢোক গিললো নিশান। মুখের তেঁতো ভাব দূর করতে না  লেখাটুকু পড়ার অস্বস্তি দূর করতে সে এই কাজ করলো সেটা সে নিজেও নিশ্চিত নয়। একই লেখা থেকে সে জানতে পারলো চিরায়ত এই রোগের বিষয়ে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যার মাঝে আছে,

অ্যাসিড হওয়ার এই সমস্যাকে অ্যাসিড রিফ্ল্যাক্স বা জিইআরডিও বলা হয়। এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের পাকস্থলী থেকে কিছুটা অ্যাসিড খাদ্যনালী হয়ে গলার কাছে উঠে আসে যে অবস্থা প্রতিরোধ করতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে বারবার ঢোঁক গিলতে হয়। আর এর ফলে পাকস্থলীতে বাতাস ঢুকে যায়। এই কারনেই বুকজ্বলা সমস্যা দেখা দেয়া রোগীদের অতিরিক্ত গ্যাসের সমস্যা দেখা যায়। তবে শুধু গ্যাস হলে বুকজ্বলা সমস্যা নাও হতে পারে।

পুরো লেখাটা পড়ে আর নিজের শরীরের বর্তমান অবস্থার কথা চিন্তা করে নিশান সিদ্ধান্ত নিলো এই অ্যাসিডিটি বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের কাছেও যাবে সে কিন্তু তার আগে যতটা সম্ভব নিশ্চিত হয়ে নিতে চায় সে, যে তার আসলে কি হয়েছে। সবার আগে নিজের ল্যাপটপ নিয়ে গুগলে সার্চ করতে শুরু করলো নিশান। অল্প কিছুক্ষন খুঁজতেই মনের মতন একটা ওয়েব সাইট পেয়ে গেলো সে। যেখানে বিস্তারিত ভাবে এই সমস্যার সংজ্ঞা থেকে শুরু করে কারণ ও লক্ষণ বিস্তারিত ভাবে লেখা আছে। এনজাইম বাংলাদেশের এই ওয়েব সাইট বেশ গুছিয়ে পুরো জিনিষটা উপস্থাপন করেছে। বাংলাদেশী কোনো ওয়েবসাইট এই মানের কাজ করছে দেখে বেশ গর্বিত অনুভুব করলো নিশান।

প্রথমেই সে এর সাধারণ সংজ্ঞা পড়ে নিলো।

অ্যাসিডিটি (acidity) কী?

অ্যাসিডিটি (Acidity)

আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি তা খাদ্যনালী (esophagus) হয়ে পাকস্থলীতে (stomach) জমা হয়। পাকস্থলীতে থাকা গ্যাস্ট্রিক গ্লান্ড (gastric gland) থেকে অ্যাসিড উৎপাদিত হয়ে সেই খাবার হজম করতে সহায়তা করে। এই গ্লান্ড থেকে প্রয়োজনের চাইতে বেশি অ্যাসিড উৎপাদন হলে তখনই আমাদের বুকে জ্বালাপোড়া অনুভূত হয়। এই সমস্যাকেই সাধারণ ভাষায় অ্যাসিডিটি বলা হয়ে থাকে।

এই সমস্যাকে অ্যাসিড রিফ্লাক্সও (acid reflux) বলা হয়ে থাকে । পাকস্থলী থেকে অ্যাসিড খাদ্যনালীতে উঠে আসলে এ সমস্যা সৃষ্টি হয়। এই ধরণের সমস্যায় সাধারণত বুকের নিচের দিকে জ্বালা বা ব্যাথা অনুভূত হয়।

এবার অ্যাসিডিটি বিষয়ে বেশ একটা পরিষ্কার ধারনা হলো নিশানের। ঠিক এর নিচেই আছে কি কারণে এই অ্যাসিডিটির সমস্যা হতে পারে। দেরী না করে নিশান সেটাতেও দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিলো।

অ্যাসিডিটি হবার প্রধান কারণসমুহঃ

  • সঠিক সময়ে খাবার না খাওয়া অথবা খাবারে অনিয়ম করা।
  • ঘুমাতে যাবার আগে খাবার খাওয়া।  
  • অত্যাধিক পরিমাণে খাওয়া।
  • অত্যাধিক ঝাল খাবার নিয়মিত গ্রহণ করা।
  • অতিরিক্ত হারে লবন গ্রহণ করা।
  • আঁশ যুক্ত খাবার কম খাওয়া।  
  • কোমল পানীয় বা ক্যাফেইনযুক্ত তরল অধিক পরিমাণে পান করা।
  • ডুবোতেলে ভাজা খাবার, ফাস্টফুড ইত্যাদি নিয়মিত খাওয়া।
  • উচ্চ রক্তচাপের ঔষধ, অ্যান্টিবায়োটিক্স, ডিপ্রেশোনের ঔষধ সেবন করা।
  • পাকস্থলীর নানান সমস্যা যেমন গ্যাস্ট্রোফেজিয়েল রিফ্লাক্স ডিজিজ (gastroesophageal reflux disease), টিউমার (tumors), পেপটিক আলসার (peptic ulcers) ইত্যাদি থাকা।
  • অতিরিক্ত ধূমপান বা মদ্যপান করা।
  • নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম না করা।
  • প্রচন্ড কাজের চাপে থাকা।
  • পরিমিত ঘুম না হওয়া।

এর বাইরেরও অ্যাজমা সমস্যা, ডায়াবেটিস ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অ্যাসিডিটির সমস্যা হবার সম্ভবনা বেশি থাকে।

এখানে উল্লেখ করা বেশ কিছু সমস্যার সাথে নিজের বর্তমান রোজকার জীবন ধারার মিল পেলো নিশান। ধীরে ধীরে সে বুঝতে শুরু করলো এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে বসাটা তার কতটা উপকারে আসছে। কারণগুলো তো জানা হলো এবার নিশানের মিলিয়ে দেখার সময় এই রোগের সাধারণ লক্ষনের কোণগুলোর সাথে তার শারীরিক অবস্থা মিলে যায়। এনজাইমের ওয়েবসাইটে লেখা অ্যাসিডিটির লক্ষণগুলো সে পড়তে আরম্ভ করলো।

অ্যাসিডিটি হবার সাধারণ লক্ষণসমূহঃ

যদিও অ্যাসিডিটির সমস্যা ব্যক্তি ভেদে পরিবর্তিত হয় কিন্তু পেটে গ্যাস জমার সমস্যা এবং অ্যাসিডিটির সমস্যাগুলো একই রকমের হয় বলে অনেকে এদুটো সমস্যাকে মিলিয়ে ফেলেন। অ্যাসিডিটি লক্ষনের মাঝে রয়েছেঃ

  • পাকস্থলীতে জ্বলা এবং ব্যাথা অনুভুত হওয়া
  • গলা জ্বলা এবং ব্যাথা অনুভুত হওয়া
  • বুক জ্বলা এবং ব্যাথা অনুভুত হওয়া
  • ঢোক গিলতে কষ্ট হওয়া বা খাবার গলায় আটকে আছে মনে হওয়া
  • কারণ ছাড়াই হেঁচকি উঠতে থাকা
  • খাদ্য গ্রহণের পর ভারী অনুভূত হওয়া
  • কোষ্ঠকাঠিন্য
  • বমির উদ্রেক হওয়া  
  • ক্লান্তি অনুভূত হওয়া
  • মুখে দুর্গন্ধ হওয়া

কপালে চিন্তার সামান্য ভাঁজ দেখা দিলো নিশানের। বেশ কিছু লক্ষণ ইতিমধ্যে দেখা দিয়েছে তার মাঝে। নাহ! ডাক্তারের কাছে যাওয়া ছাড়া আর উপায় নেই দেখছি। মনে মনে ভাবলো নিশান। তবে অ্যাসিডিটির সমস্যায় ঔষধ খাওয়া লাগলেও ঘরোয়া কি কি উপায়ে অ্যাসিডিটির সমাধান করা যায় সেটা জানার জন্যে আগ্রহ হচ্ছিলো তার। তাই সমাধান অংশটাও এক নিমেষে পড়ে নিলো নিশান।

অ্যাসিডিটির কিছু ঘরোয়া সমাধানঃ

অ্যাসিডিটি একটি বিশ্বব্যাপী সার্বজনীন ধরণের সমস্যা। এবং অনেকেই চান সাধারণ অ্যাসিডিটির সমস্যার জন্যে বাণিজ্যিক ঔষধের পরিবর্তে ঘরোয়া সমাধান খুঁজতে। নিম্নে বর্নিত সমাধানগুলো অ্যাসিডিটির ঘরোয়া কিছু সমাধান তবে সমস্যা বেশি মনে হলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।

  • ডাবের পানি পাকস্থলী এবং হজমের ব্যবস্থাকে শান্ত রাখে যার ফলে অ্যাসিডিটি হবার সম্ভবনা কমে আসে। দিনে দুই গ্লাস করে ডাবের পানি অ্যাসিডিটি সমস্যা কমাতে উপকারে আসতে পারে।
  • অতিমাত্রায় অ্যাসিডিটির সমস্যায় তরমুজের রস পান করা ভালো কাজে আসে। সকালের নাস্তার সাথে এক গ্লাস পরিমাণ তরমুজের রস পান করলে উপকার পেতে পারেন।
  • দুপুরের খাবারের অন্তত এক ঘণ্টা আগে তাজা লেবুর শরবত পান করলে অ্যাসিডিটির কারণে যে শারীরিক অস্বস্তি অনুভূত হয় সেটা হবার সম্ভবনা কমে যাবে।
  • তুলসী পাতার রস করে অথবা পানিতে সেদ্ধ করে সেই পানি পান করলে অ্যাসিড রিফ্লেস্ক সমস্যায় আরাম পাওয়া যায়।
  • প্রতিবেলা খাবার গ্রহনের পরে কুসুম গরম পানি পান করলে অ্যাসিডিটির সমস্যা কমে আসবে।
  • আদা অ্যাসিডিটি উপসমে ভালো কাজে আসে তাই খাবারের সাথে অথবা পানিতে সেদ্ধ করে সেই পানি পান করলে অ্যাসিডিটি হলে উপকার পেতে পারেন।
  • অবাক করা বিষয় লবঙ্গ বা লং চিবিয়ে খেলেও অ্যাসিডিটি সমস্যায় উপকার পাওয়া যায়।
  • তাৎক্ষণিক অ্যাসিডিটির সমস্যা কমানোর জন্যে খাদ্য তালকায় যুক্ত করতে পারেন কলা, শশা এবং দই।
  • প্রতিদিন অন্তত দুই লিটার সাধারণ তাপমাত্রার পানি পান করার অভ্যাস করুণ।
  • খাবারের সময় সম্পর্কে সচেতন হোন এবং সময় মত নিয়ম করে খাদ্য গ্রহনের অভ্যাস করুণ।
  • ধূমপান বা মদ্যপান পরিত্যাগ করতে হবে
  • ক্যাফেইন বা কার্বনেটযুক্ত পানীয় যতটা সম্ভব কম পান করতে হবে।
  • ডানদিকে পাশ ফিরে ঘুমানোর অভ্যাস কমিয়ে আনতে হবে।
  • নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে সেই সাথে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমানোর অভ্যাস করতে হবে।  
  • অতিরিক্ত ঝাল-মসলাযুক্ত খাবার ও তেলেভাজা খাবার পরিহার করতে হবে।

সবটা লেখা পড়া শেষ করার পর নিশান বেশ বুঝতে পারলো যে কি পরিমাণ অনিয়ম সে করে যাচ্ছিলো।  আর তাতে আরো কতো মারাত্মক অবস্থা হয়ে যেতে পারতো তার ! এনজাইমের ওয়েবসাইটে ঘুরতে ঘুরতে আরো একটা জিনিষ নজর কারলো তার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে রোগ নির্নয়ের ব্যবস্থা আছে সেখানে। নিজের রোগের লক্ষণগুলো নির্বাচন করে ধাপে ধাপে প্রশ্নের উত্তর দিলে স্বয়ংক্রিয় ভাবে চলে আসে কোন রোগ পরীক্ষাকারীর থাকার সম্ভবনা রয়েছে। এনজাইম সিম্পটম চেকার ব্যবহার করে নিশান তার সমস্যাগুলো নির্বাচন করে দেখলো তার অ্যাসিডিটি সমস্যা থাকার সম্ভবনা বেশি।

তাই সে সিদ্ধান্ত নিলো যে আগামীকালই সে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে এই বিষয়ে চিকিৎসা নেয়া শুরু করবে।  

স্বাস্থ্য বিষয়ে আমাদের অন্যান্য ব্লগগুলো পড়তে ঘুরে আসুন আমাদের ব্লগসাইটের হোমপেজ থেকে।

অ্যাসিডিটি সম্পর্কে আপনার কোনো জিজ্ঞাসা বা পরামর্শ থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুণ ইমেইল, ফেসবুক অথবা ফোন করুণ +০৯৬৩৯০০৬৬২২ নম্বরে।

অ্যাসিডিটি বিষয়ক ভিডিওঃ