নভেম্বরের শেষ। শীত পড়া শুরু হয়ে গেছে। বাড়ান্দার দরজায় চুপি চুপি দাঁড়িয়ে আছে তুতুল। ঘাপটি মেরে। মুখে আটকাতে কষ্ট হওয়া হাসি। মুখ চেপে আছে। গায়ে ফ্রক। বাড়ান্দায় দাদু বসা চেয়ার। চা বিস্কিট খেয়েছে। হাটতে বের হবে এখন। চেয়ার থেকে ওঠার চেষ্টা করতেই পটপট করে শব্দ করলো হাড়ের জয়েন্টগুলো।

দরজার এপাশ থেকে হিহি করে হেসে উঠলো তুতুল। এটার অপেক্ষাতেই ছিল ও। দাদু নড়াচড়া করলেই কুটকুট করে শব্দ হয়। আর তা শুনে হেসে কুটিকুটি হয় তুতুল। তুতুল দাদুর নাম দিয়েছে কুটুকুটু। সবে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে ও। নার্সারিতে ভর্তি করা হয়েছে ওকে। এখন ওর মজার সময়। যা দেখে তাতেই হেসে খুন হয়। কিন্তু দাদুর কষ্ট তো আর তুতুল বোঝে না। বোঝার কথাও নয় অবশ্য।

তুতুলের বাবা রাশেদ। রাশেদ আহমেদ। বাবা ফারুক আহমেদের আর্থ্রাইটিস বা বাত সম্পর্কে জানে। বহুদিন যাবত এই সমস্যা আচ্ছে। তবে কদিন ধরে বাবা ব্যাথার কথা বলছে যেটা আগে ছিল না। ডাক্তারের কাছে নেয়ার দরকার বাবাকে। ভাবল রাশেদ। শুক্রবার ওর অফিস নেই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সেদিন বসের বাসায় দাওয়াত। যেতেই হবে। আর শুক্রবার বের হতে না পারলে আবার দুই সপ্তার জন্য তুমুল ব্যস্ত হয়ে যাবে ও। সেক্ষেত্রে ডাক্তার দেখাতে দেখাতে অনেক সময়। ঘরে বসে ডাক্তার দেখাতে পারলে কত ভালো হত এখন!

এসব ভাবতে ভাবতেই টয়লেটে বসে ফেইসবুকে ঘুরছিল। সামনে Enzaime Bangladesh নামে একটি পেইজের অ্যাড আসলো। অ্যাডে বলছে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার করে যেকোনো জায়গা থেকেই নাকি অভিজ্ঞ ডাক্তারের চিকিৎসা নেয়া সম্ভব। ক্লিক করে ওদের পেইজে গেল ও। সেখান থেকে ওয়েবসাইটে গেল ডাক্তার খুঁজে দেখতে। ক্যাটগরি অনুযায়ী ডাক্তার সার্চ করার অপশন। ভিজিটিং ফি অনুযায়ী ডাক্তার সার্চ করার অপশন। বাহ! ও যা খুজছিল ঠিক তাই!

রাশেদ ঝটপট একজন অর্থোপেডিক ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নিল। অনলাইনে ডাক্তারের ভিজিটিং ফি-ও দিয়ে দিল। নিশ্চিন্ত হয়ে অফিসে গেল। সন্ধায় বাসায় ফিরে অপেক্ষা করতে লাগলো অ্যাপয়েন্টমেন্টের। রাত নটায় ওর অ্যাপয়েন্টমেন্ট পড়েছে। নয়টা বাজার কিছুক্ষণ আগে ওর মোবাইলে এসএমএস এলো একটা। সেখানে বলছে যে নয়টার সময় ওর অ্যাপয়েন্টমেন্ট। ওকে রেডি থাকতে বলল। ও ল্যাপটপটা অন করে বসতেই আরেকটা এসএমএস চলে আসলো। বললো ডাক্তার এখন অনলাইনে আছে। ল্যাপটপ থেকে বা চাইলে এই মোবাইল থেকেই ও ভিডিও কলে জয়েন করতে পারে।

ও ল্যাপটপ থেকেই জয়েন করলো। বড় স্ক্রিনের সুবিধার জন্য। পাশেই বাবা বসা।

কলে জয়েন করার পর ও ডাক্তারকে বললো যে ওর বাবার সমস্যা।

ডাক্তার সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কী সমস্যা হচ্ছে আমাকে খুলে বলেন।

বাবা বললো, বেশ কয়েক বছর ধরেই নড়াচড়া করলে হারের জয়েন্টগুলোতে শব্দ হয় মড়মড় করে। গত কিছুদিন যাবত ব্যথা হচ্ছে। আজকে ব্যথাটা বেশ ভোগাচ্ছে। নড়াচড়া করতেও কষ্ট হচ্ছে।

–   আচ্ছা। আমি কিছু পরীক্ষা দিচ্ছি। এই টেস্টগুলোর রেজাল্ট দেখলে নিশ্চিত হওয়া যাবে সমস্যা কোথায় তবে আপনার বয়স আর উপসর্গ শুনে আমার ধারনা আপনি সম্ভবত আর্থ্রাইটিসে ভুগছেন।

একটু খুলে বলবেন ডাক্তার সাহেব প্লিজ এই বিষয়ে?

আর্থ্রাইটিস কী?

–   অবশ্যই। চিকিৎসাবিজ্ঞানে আর্থ্রাইটিস বা সন্ধিপ্রদাহ কিংবা সহজ ভাষায় অস্থিসন্ধিতে ব্যথার মাধ্যমে প্রায় ১০০ ধরণের রোগের কথা বোঝানো হয়ে থাকে। তবে দুই ধরণের আর্থ্রাইটিস সবচেয়ে বেশি হয়। একটি হচ্ছে অষ্টিওআর্থ্রাইটিস (Osteoarthritis) আর আরেকটি হচ্ছে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (Rheumatoid Arthritis)।

মুরগী বা গরুর মাংস খাবার সময় আমরা এক ধরণের নরম হাড় দেখি না? আমরা অনেকেই এগুলোকে কুরকুরে হাড় বলে থাকি। এই হাড়গুলো দুটো অস্থির সন্ধিস্থলে থাকে। যাতে দুই অস্থির মধ্যে সরাসরি আঘাত না লাগে।

মানুষের অস্থিসন্ধিতেও একইরকম এই “কুরকুরে হাড়” রয়েছে যেটিকে বলা হয় কার্টিলেজ (Cartilage)। এই কার্টিলেজ কোনো কারণে যদি ক্ষয় হয়ে যায় তাহলে অস্থির মধ্যে ঘর্ষন হয় যেটি তীব্র ব্যথার সৃষ্টি করে। এটিকেই অষ্টিওআর্থ্রাইটিস বলা হয়।

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস

ডাক্তার সাহেব বলতে থাকলেন, “রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি ক্রনিক ইনফ্লামেটোরি (জ্বালাপোড়া) ব্যাধি যা হাত ও পায়ের ক্ষুদ্রাকারের অস্থিসন্ধির (জয়েন্ট) ক্ষতি করে থাকে।

অস্টিওআর্থ্রাইটিস

অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে অস্থিসন্ধির তরুণাস্থি ক্ষয় হতে থাকে এবং নষ্ট হয়ে যায়। অপরদিকে, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে হাড়ের সংযোগস্থলের আস্তরণের ক্ষতি হয় ও ব্যথা হওয়ার সাথেসাথে হাড় ফুলে যায়। যার ফলে হাড় ক্ষয় হতে শুরু করে ও হাড়ের গঠনে বিকৃতি দেখা দেয়। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি অটোইমিউন ডিসঅর্ডার (Autoimmune Disorder), কারণ এই রোগের ফলে প্রতিরোধকারী কোষগুলো ভুলক্রমে শরীরের টিস্যুগুলোকে আক্রমণ করে থাকে। হাড়ের সংযোগস্থল ছাড়াও এ রোগ দেহের অন্যান্য অঙ্গ যেমন ত্বক, চোখ, ফুসফুস ও রক্তনালীরও ক্ষতি করে থাকে। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস যেকোনো বয়সেই হতে পারে। তবে এটি ৪০ বছর বয়সের পর বেশি হয়। মহিলারা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। চিকিৎসার সাহায্যে এ রোগের লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং হাড়ের সংযোগস্থল নষ্ট হওয়া প্রতিরোধ করা যায়।

–   বাবার তাহলে কোনটি হয়েছে? রাশেদ জিজ্ঞেস করলো।

–   সেটি আসলে টেস্টগুলোর রেজাল্ট ছাড়া বলা সম্ভব নয়। তবে আর্থ্রাইটিস যে ধরণেরই হোক না কেন যে বিষয়টি এর সাথেই সংশ্লিষ্ট থাকবে তা হচ্ছে, অস্থিসন্ধি যেমন কব্জি, হাঁটু, কোমর বা আঙ্গুলের গিটে ব্যথা। তবে কিছু ধরণের আর্থ্রাইটিস ত্বকসহ অন্যান্য সংযোজক টিস্যু এবং অঙ্গগুলোকেও আক্রান্ত করতে পারে।

আর্থ্রাইটিসের উপসর্গ দেয়া মাত্র “ক্যালসিয়ামের অভাগ, ভিটামিনের অভাব, ট্যাবলেট খেলে এমনিই চলে যাবে” ধরণের কথাবার্তাকে পাত্তা না দিয়ে অতিদ্রুত চিকিৎসকের শরনাপন্ন হতে হবে কারণ আর্থ্রাইটিস এমনি এমনি ভালো হয় না। এর জন্য প্রয়োজন যথাযথ চিকিৎসা। চিকিৎসা নিতে বিলম্ব হলে শরীর গুরুত্বপুর্ণ অঙ্গ হারাতে হতে পারে।

–   বাবার ক্ষেত্রে তো আমরা শুধু হাড়ের জয়েন্টে শব্দ আর ব্যথা দেখছি। আর কোনো উপসর্গ কি রয়েছে এই রোগের?

–   রয়েছে ।

আর্থ্রাইটিসের উপসর্গ

আর্থ্রাইটিসের আরও কিছু উপসর্গ হল,

·         হাড়ের জয়েন্টে ফুলে যাওয়া

·         আড়ষ্ট হয়ে যাওয়।

·         লালচে হয়ে যেতে পারে

·         হাড় বাকা হয়ে যেতে পারে

·         একসময় হাত পা নাড়ানো কষ্টকর হয়ে পড়ে

·         দৈনন্দিন কাজে কর্মে সমস্যা হওয়া

ডাক্তার সাহেব বলতে থাকলেন, “আপনার একটি মজার তথ্য দেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ১৬৮ জন রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস রোগীর উপরে একটি গবেষনায় করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল তাদের নিজেদের হওয়া রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বিষয়ে তাদের জ্ঞান কতটুকু বা কেমন সেটি আবিষ্কার করা। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে এই গবেষনার ফলাফল প্রকাশিত হয় The knowledge level of rheumatoid arthritis patients about their disease in a developing country. A study in 168 Bangladeshi RA patients নামে।

সেখানে ফলাফল অংশে উল্লিখিত রয়েছে যে “Disease-related knowledge of Bangladeshi RA patients was poor in all domains. Using these findings, improved education and knowledge will result in better disease control.”

অর্থাৎ “বাংলাদেশী রোগীদের রোগ-সম্পর্কিত জ্ঞান সকল ক্ষেত্রেই অত্যন্ত দূর্বল ছিল। এই ফলাফল ব্যবহার করে উন্নত শিক্ষা এবং জ্ঞান এই রোগ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হবে।“

আর্থ্রাইটিস সম্পর্কে জানা থাকলে উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার মাধ্যমে বাঁচানো সম্ভব মূল্যবান প্রাণ।

–       আর্থ্রাইটিস তাহলে মূলত এই দুই ধরনেরই? রাশেদ জিজ্ঞেস করলো।

·         প্রায় ১০০ ধরণের আর্থ্রাইটিস রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় অস্টিওআর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, যে দুটো সম্পর্কে আপনাদের বললাম। আরেকটি রয়েছে যার নাম হচ্ছে গাউট বা গেঁটেবাত।

–       সেটি কেমন?

গাউট বা গেঁটেবাত

–       রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেড়ে গেলে অস্থিসন্ধিতে এক ধরণের ক্রিস্টাল জমা হয়। এর নাম হচ্ছে মনোসোডিয়াম ইউরেট মনোহাইড্রেট। এই ক্রিস্টাল অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, ফুলে যাওয়া, লালচে হয়ে যাওয়া সৃষ্টি করে। এটিই গেঁটেবাত। গাউটের প্রথম আক্রমনটি সাধারণত হয় পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলে। এছাড়াও আরও যেখানে যেখানে আক্রমণ করতে পারে তা হল, পা, গোড়ালি, হাঁটু, কব্জি, আঙুল, কনুই।

–       কী দেখলে বুঝবো যে কারও গেটে বাত হয়েছে?

–       এটির উপসর্গগুলো। যেমনঃ

·         খুব দ্রুত ব্যথা শুরু হয়ে ২-৬ ঘণ্টার মধ্যে তীব্র আকার ধারণ করে

·         ব্যথা এতই তীব্র হয় যে রোগী পায়ে মোজাও পড়তে পারেনা

·         আক্রান্ত জয়েন্ট বেশ ফুলে যায়

·         চামড়া চকচকে লাল হয়ে যায়

·         ব্যথা কমে গেলে আক্রান্ত স্থান চুলকায় ও চামড়া উঠে যেতে পারে

–       রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলে তাকে হাইপারইউরিসেমিয়া বলে। এটি কিডনিতে পাথরও তৈরি করতে পারে

–       বাবা তো সারাজীবন বেশ সুস্থই ছিলেন। তার ওজনও খুব বেশি না। কিন্তু বাবার কেন এই সমস্যা হলো?

আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকির কারণ

–       যে কারণে হবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায় সেগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ

·         বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে এটি হবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়

·         পরিবারের কারও থাকলে

·         লিঙ্গ। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস নারীদের ক্ষেত্রে বেশি হয়ে থাকলে অন্যান্য সকল আর্থ্রাইটিসে পুরুষদের আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশি

·         অস্থিসন্ধিতে কখনও আঘাত পেলে

·         শারীরিক স্থুলতা

এর যেকোনো একটি বা একাধিক বা সবগুলোর কারণে আর্থ্রাইটিস হতে পারে।

–       বাবার জন্য তাহলে এখন কী চিকিৎসা দেয়া হবে?

–       টেস্টের রেজাল্ট আসার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। টেস্টের রেজাল্ট দেখে আমাদের আগে নিশ্চিত হতে হবে যে আপনার বাবার ঠিক কোন ধরণের আর্থ্রাইটিস হয়েছে বা আদৌ আর্থ্রাইটিসই হয়েছে কিনা। এরপরে আমরা চিকিৎসার দিকে এগোবো।

–       বুঝতে পেরেছি। অনেক ধন্যবাদ ডাক্তার সাহেব।

–       আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।