কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট (Cardiac Arrest), হার্ট ফেইলিওর (Hear Failure) এবং হার্ট অ্যাটাকের (Heart Attack) মধ্যে মৌলিক পার্থক্য থাকলেও আমাদের অনেকেরই সেটি হয়ত জানা নেই। বিষয়টি সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা দেয়ার জন্য তিন পর্বের “হৃদরোগ সিরিজ”-এর আজকে থাকছে প্রথম পর্ব। এই পর্বে আলোচনা হবে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট নিয়ে।






ইশারায় আনিস সাহেবকে শুধু দেখাতে পারলেন যে বুকে ব্যথ্যা। এরপরেই জ্ঞান হারালেন।

জনাব শামসুল হক বিকেলে হাঁটতে বের হয়েছিলেন। সাথে পাশের বাড়ির আনিস সাহেব। তারা প্রতিদিনই গাড়ি করে তাদের মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে বিকেলে সংসদ ভবনে গিয়ে টানা এক ঘন্টা হেঁটে আবার বাসায় ফেরেন।

আজও সেই রুটিন অনুযায়ী তারা বের হয়েছিলেন। তাদের নির্ধারিত এক ঘন্টার হাঁটাও শেষ হয়েছে। গাড়িতে ওঠার জন্য দরজাটা খুলেছেন আর তখনই তার হঠাৎ করে কেমন যেন শ্বাসকষ্ট হতে লাগলো। এর সাথেই সাথেই বুকে তীক্ষ্ণ একটা ব্যথা অনুভব করলেন। বুঝতে পারছিলেন কিছু একটা হতে যাচ্ছে।

ইশারায় আনিস সাহেবকে শুধু দেখাতে পারলেন যে বুকে ব্যথ্যা। এরপরেই তিনি জ্ঞান হারান। জ্ঞান ফিরে পেতে দেখলেন তিনি হাসপাতালে বেডে শোয়া। পাশে শঙ্কিত মুখে তার স্ত্রী ও সন্তানরা দাঁড়িয়ে আছে।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আমার কী হয়েছিল?”

তার স্ত্রী বললেন, “এখন কথা না, আপনি ঘুমান। ডাক্তার কথা বলতে মানা করছে।“

তিনি আবার চোখ বুজলেন। ঘুমিয়েও গেলন।

ডাক্তারের চেম্বারে তার বড় ছেলে সুমন গেলো বিস্তারিত কথা বলার জন্য।

ডাক্তার সাহেব আমাকে কি একটু ডিটেইল বললেন প্লিজ যে বাবার আসলে কী হয়েছে?

ডাক্তার বললেন, “আপনার বাবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছিল।“

সুমন বললো, তার মানে কি হার্ট অ্যাটাক?

ডাক্তার বললেন, “জ্বি না। হার্ট অ্যাটাক আলাদা। এটা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট।“

একটু যদি প্লিজ বুঝিয়ে বলতেন, সুমন অনুরোধ করলো।

ডাক্তার সাহেব বললেন, “সার্টেইনলি।“


কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট কী


ডাক্তার বলা শুরু করলেন,

হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক না হলে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে পাম্প করে রক্ত সরবরাহ না করতে পারলে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট (cardiac arrest) হয়ে থাকে। এ সময় হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়। কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট আক্রান্ত ব্যক্তির আকস্মিকভাবে মৃত্যুও হতে পারে। ভেনট্রিকুলার ফিব্রিলেশন ( ventricular fibrillation) হলো এই রোগের মূল কারণ। সংক্ষেপে একে ভি-ফিভ (V-fib) বলা হয়। কোনো ব্যক্তির মস্তিষ্কে কয়েক মিনিট ধরে পরিশোধিত রক্ত না পৌঁছলে তিনি অচেতন হয়ে পড়বেন এবং শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবেন।

কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের মূল যে বৈশিষ্ট, যেটি অন্যগুলো থেকে এটিকে আলাদা করে তা হচ্ছে, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট সবসময় হঠাৎ করে হবে। অর্থাৎ হুট করেই হার্ট কাজ করা বন্ধ করে দেবে।

পড়ুন হার্ট অ্যাটাক কী

পড়ুন হার্ট ফেইলিয়র কী

ডাক্তার এ পর্যন্ত বলে থামলেন। সুমন জিজ্ঞেস করলো,

– এটা কেন হয় ডাক্তার সাহেব?


কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কারণ


সুমনের প্রশ্নের উত্তরে ডাক্তার সাহেব বললেন,

যে কারণগুলোর জন্য কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়ে থাকে সেগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ

  • করোনারি আর্টারি ডিজিজ: করোনারি আর্টারি ডিজিজে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বেশি হয়ে থাকে। করোনারি আর্টারি ডিজিজ হলে ধমনীতে কোলেস্টরল এবং আরও কিছু উপাদান জমাট বাঁধে, ফলে হৃৎপিণ্ডে রক্ত প্রবাহের মাত্রা কমে যায়। এই অবস্থার জন্য হৃৎপিণ্ডের বৈদ্যুতিক ক্রিয়া ব্যাহত হয়।
  • হার্ট অ্যাটাক:  সাধারণত করোনারি আর্টারি ডিজিজের কারণে সৃষ্ট হার্ট অ্যাটাক ভেনট্রিকুলার ফিব্রিলেশন এবং কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সম্ভাবনা তৈরি করে।
  • হৃদপেশীর অস্বাভাবিকতা (কার্ডিওমাইয়োপ্যাথি, cardiomyopathy): হৃৎপিণ্ডের পেশীবহুল দেয়াল প্রসারিত হলে, বৃদ্ধি পেলে বা পুরু হয়ে গেলে সাধারণত এই সমস্যা দেখা দেয়। এর ফলে হৃৎপিণ্ডের পেশীতে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয় এবং হৃৎপিণ্ডের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বা অ্যারিথমিয়া (arrhythmias) দেখা দিতে পারে।
  • ভালভিউলার হার্ট ডিজিজ (Valvular heart disease): হৃৎপিণ্ডের ভাল্ভে ছিদ্র হলে বা ভাল্ভ সংকুচিত হয়ে গেলে হৃৎপিণ্ডের পেশী প্রসারিত বা মোটা হয়ে যেতে পারে। ছিদ্রযুক্ত বা সংকুচিত ভাল্ভের চাপের কারণে হৃৎপিণ্ডের প্রকোষ্ঠগুলি দুর্বল বা বড় হয়ে গেলে অ্যারিথমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
  • হৃৎপিণ্ডের জন্মগত রোগ: হৃৎপিণ্ডের জন্মগত সমস্যার কারণে শিশু-কিশোরদের কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের হৃৎপিণ্ডের জন্মগত সমস্যা নিরাময়ের জন্য সার্জারি করার পরও তাদের আকস্মিকভাবে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ডাক্তার সাহেব থামনে সুমন বললো, আমাদের কাছে তো ডাক্তার সাহেব সবই এক। এই যে আপনি বললেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট আর আমি বুঝেছি হার্ট অ্যাটাক। কী লক্ষণ দেখলে বুঝবো যে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে?

ডাক্তার সাহেব বললেন, দেখেন, সাধারণত চিকিৎসক ছাড়া এগুলোর মধ্যে তফাৎ ধরতে পারাটা অনেকটা অসম্ভব। চিকিৎসকরাও বিভিন্ন পরিক্ষা করা ছাড়া বুঝতে পারেন না যে আসলে কী হয়েছে। তবুও কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কিছু নির্দিষ্ট লক্ষন রয়েছে। যেমনঃ


কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের লক্ষণ


এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে চিকিৎসকেরা নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি চিহ্নিত করে থাকেন:

  • শ্বাসকষ্ট (Shortness of breath)
  • শ্বাস নিতে সমস্যা দেখা দেওয়া (Difficulty breathing)
  • বুকের তীক্ষ্ণ ব্যথা (Sharp chest pain)
  • দুর্বলতা (Weakness)
  • হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া (Increased heart rate)
  • অনিয়মিত হৃদস্পন্দন (Irregular heart beat)
  • আংশিক দুর্বলতা (Focal weakness)
  • বুক ধড়ফড় করা (Palpitations)
  • শ্বাস নেবার সময় ব্যথা অনুভব করা (Hurts to breath)
  • হৃদস্পন্দন কমে যাওয়া (Decreased Heart Rate)
  • বাহু শক্ত হয়ে যাওয়া (Arm swelling)
  • ত্বক ফ্যাকাসে বা বিবর্ণ হয়ে যাওয়া (Pallor)

আপনাকে এই ফাঁকে আরেকটি কথা বলে রাখি যে কোন কোন বিষয় কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে, ডাক্তার বললেন।


কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়


বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই করোনারি আর্টারি ডিজিজের সাথে কার্ডিয়াক ডিজিজ সম্পর্কযুক্ত। তাই যেসব বিষয়গুলি করোনারি আর্টারি ডিজিজের ঝুঁকি বাড়ায়, সেইসব বিষয়গুলোই কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। এমন কিছু বিষয় হল-

  • পরিবারের/বংশের সদস্যদের করোনারি আর্টারি ডিজিজ হওয়া।
  • ধূমপান।
  • উচ্চ রক্তচাপ।
  • শরীরের অতিরিক্ত ওজন/ স্থূলতা।
  • রক্তে কলেস্টোরলের উচ্চমাত্রা।
  • ডায়াবেটিস।
  • কর্মবিমূখতা
  • অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান।


যারা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ঝুঁকির মধ্যে আছে


পুরুষদের এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা নারীদের থেকে তুলনামূলকভাবে কম থাকে।

ডাক্তার সাহেব এই পর্যন্ত বলার পরে সুমন বললো, ডাক্তার সাহেব আমার বাবা দীর্ঘদিন সিগারেট আসক্ত ছিলেন। তাহলে কি এ কারণেই আজকে বাবা এই অবস্থা হলো?

ডাক্তার বললেন, বেশি সম্ভাবনা এটাই। আবার শুধু যে সিগারেটের কারণেই কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয় তাতো না। অনেকেই তো সিগারেট পান করেও কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের শিকার হয় নাই আবার সিগারেট পান না করেও অনেকেই কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের মত বিভিন্ন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।

তিনি বলতে থাকলেন, ধূমপানের সাথে সম্পর্কের জায়গাটা হচ্ছে, এখনও পর্যন্ত যত গবেষণা হয়েছে সকল গবেষণাতেই দেখা গেছে যে ধূমপান যারা করে তাদের ক্ষেত্রে হৃদরোগ হবার সম্ভাবনা যারা করে না তাদের চাইতে অনেক বেশি থাকে। এইটুকুই।

একটু আগে যেমনটি বলেছিলাম, জন্মগত বা বংশগত কারণেই এটা হতে পারে।

সুমন মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, ধন্যবাদ ডাক্তার সাহেব এবার বুঝতে পেরেছি।

বাবার চিকিৎসার বিষয়টা একটু যদি ক্লিয়ার করতেন এবার। মানে তিনি এখন কেমন আছেন, সুস্থ হয়ে যাবার সম্ভাবনা কতটুকু। সামনের দিনগুলো কেমন হবে এইসব আর কী।

আপনার বাবা যে সমস্যা নিয়ে এসেছিলেন সেটি বিষয়ে যা যা করা প্রয়োজন আমরা সেগুলো করেছি। তিনি এখন সুস্থ। তবে, সামনের দিনগুলোতে অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক লাইফ স্টাইল মেইন্টেইন করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

তাছাড়া বর্তমানে করোনা মহামারীতে যেকোনো ধরণের হৃদরোগ থাকা মানুষই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে করোনাভাইরাস সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের (এসসিএ) ঝুঁকি বাড়িয়েছে। হৃদস্পন্দন তার স্বাভাবিক বিট হারিয়ে গেললে রক্ত সঞ্চালনের স্বাভাবিক ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। এ পরিস্থিতিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় – ‘কার্ডিয়াক অ্যারিদমিয়া’ বলা হয়। এই সময় হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারলে মৃত্যুও ঘটতে পারে।


কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বিষয়ক হেলথ টিপস্‌



সুমনকে মনোযোগ দিয়ে শুনতে দেখে ডাক্তার সাহেব বললেন,

আপনার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হওয়ার ঝুঁকি কতোটা, তা শতভাগ নিশ্চয়তার সাথে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। তাই এই রোগের ঝুঁকি কমানোই হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকারী উপায়। এ জন্য নিয়মিত চেক-আপ ও হৃৎপিণ্ডের পরীক্ষা করানো এবং হৃৎপিণ্ডের সুস্থতার জন্য অনুকূল জীবনযাপনের পাশাপাশি নিম্নে লিখিত বিষয়গুলো অনুসরণ করবেন:

  • ধূমপান ত্যাগ করুন।
  • তৈলাক্ত খাবার পরিহার করুন।
  • স্যাচুরেটেড ও ট্রান্সফ্যাট বর্জন করুন এবং আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণ করুন। (লিঙ্ক হবে)
  • পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করুন।
  • নিয়মিত শরীরচর্চা করুন।

আপনার বাবাকে আরও দুদিন এখানে থাকতে হবে পর্যবেক্ষণের জন্য। এরপরে তাকে রিলিজ দেয়া হবে। চিন্তা করবেন না। বাবার দিকে নিয়মিত খেয়াল রাখবেন আর যেভাবে যেভাবে বলে দিব ঠিক সেভাবে চলতে বলবেন। তাহলে ইনশা আল্লাহ আর সমস্যা হবে না। আর আমরা সাথে ১৫ দিন পর দেখা করবেন।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ডাক্তার সাহেব। কিন্তু দেখা করার বিষয়টাই একটু সমস্যা হয়ত হতে পারে এই লকডাউনের মধ্যে।

সমস্যা নেই। আমি Enzaime Ltd (সাইটের লিংক) এ রেজিস্টার্ড। অনলাইনে ভিডিও কলের মাধ্যমেও আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে পারবেন। প্লে স্টোর থেকে Enzaime Patient Care (প্লে স্টোরের লিংক) অ্যাপ নামিয়ে রেজিস্টার করে নিলেই হবে। এরপরে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নেবেন। বেশ সহজ।

চমৎকার! আমি সেটাই করবো তাহলে ডাক্তার সাহেব। থ্যাংক্স!

ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম ইয়াংম্যান।

আমি তাহলে আজকে উঠছি ডাক্তার সাহেব।

ঠিক আছে।



হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে কথা বলুন এনজাইম লিমিটেড (Enzaime Ltd) এর টেলিমেডিসিন সেবা গ্রহণ করার মাধ্যমে। অনলাইনে যেকোনো রোগের ডাক্তারের পরামর্শের জন্য আপনার চাহিদা অনুযায়ী ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন এখানে ক্লিক করে।

স্বাস্থ্য বিষয়ক অন্যান্য আরও ব্লগ পড়ার জন্য ক্লিক করুন এখানে