সমস্যাটা এতটাই বিব্রতকর যে মাসুদ কাউকে বলতেও লজ্জা পাচ্ছে। ভুগছে ও এই সমস্যায় বেশ কিছুদিন যাবত। লজ্জায় কাউকে বলতে পারছে না। আবার এদিকে সমস্যা যাচ্ছেও না। এমনকি ডাক্তারের কাছে যেতেও বাধো বাধো ঠেকেছে। ইন্টারনেট ঘেটে মনে হয়েছে ওর গনোরিয়া হয়েছে। এখন নিশ্চিত হওয়া দরকার।

মাসুদ বেশ খোলামেলা ধরনের হলেও এই রোগটা ওকে খুব একটা অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। তবে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো যে ডাক্তার দেখাবে। এভাবে বেশিদিন কষ্ট করা যাচ্ছে না। ইদানিং প্রচুর অনলাইন কনসালটেন্সি হচ্ছে। ওর এক ক্লোজ বন্ধু এমন একটা কোম্পানিতে চাকরি করে। ভাবল ওখান থেকেই ডাক্তার দেখাবে।

কোম্পানির নাম Enzaime Ltd। গুগল করতেই ওয়েবসাইট চলে আসলো। ওয়েবসাইটের লিঙ্ক হচ্ছে https://enzaime.com/। অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্টে যেতে দেখলো Enzaime এর অ্যাপ Enzaime Patient care নামানোর কথা বলছে। তো একে ও বাসায়, তার উপরে ল্যাপটপে বসা দেখে আর অ্যাপ নামালো না। একজন চর্ম ও যৌন ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নিলো। প্রথমে ভেবেছিল মেডিসিনের ডাক্তার দেখাবে। পরে চর্ম আর যৌন ডাক্তার দেখানোর কথাই ভাবলো।

Enzaime ওয়েবসাইটে অনলাইন পেমেন্ট করার পর অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেলো পরের দিন বিকেল ৩টায়। ভিডিও কলে আসতে সালাম দিলো মাসুদ। ডাক্তার সাহেব করলেন,আপনার নাম আর বয়স বলে সমস্যা বলুন।

জ্বি আমার নাম মাসুদুর রহমান। আমার বয়স তিরিশ। সমস্যা বলতে, আসলে…

জ্বি বলুন।

মানে, আমার…

দেখুন, আমি প্রায় ২০ বছর যাবত একজন পেশাদার চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত আছি। আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন যে আপনার এমন কোনো সমস্যা হয়নি যেটা আমি আগে শুনিনি বা চিকিৎসা করিনি। আপনি নিঃসংকোচে বলুন।

মাসুদ কিছুটা ভরসা পেলো। বললো,আমার লিঙ্গ থেকে এক ধরনের তরল বের হয়। লিঙ্গের কালারও কিছুটা লালচে হয়ে গেছে।

আচ্ছা। আর কোনো লক্ষণ?

জ্বি, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া হয়।

পেটে ব্যথা হয় কখনও?

খুব একটা না। তবে হয়।

খুব তীক্ষ্ণ ধরনের ব্যথা?

জ্বি জ্বি!

বুজতে পেরেছি। আমি ধারণা করে নিচ্ছি আপনার গনোরিয়া হয়েছে। তবে টেস্ট লিখে দিচ্ছি। রিপোর্ট নিয়ে আমার সাথে দেখা করবেন। এরপরে আমরা বিস্তারিত কথা বলবো।

দুদিন পর মাসুদ অ্যাপয়েন্টমেট নিল আবার। অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময় রিপোর্টের ছবি আপলোড করে দিলো।

কলে জয়েন করার পর ডাক্তার সাহেব বললেন,যা ভেবেছিলাম তাই। আপনার গনোরিয়া হয়েছে।

কী বলছেন ডাক্তার সাহেব?

জ্বি। কিন্তু আপনি আতঙ্কিত হচ্ছেন কেন? এটা তো এমন কোনো রোগ না যে আপনার চিকিৎসা করা যাবে না!

মানে, মানুষ শুনলে খারাপ ভাবে।

মানুষের কথা নিয়ে থাকলে তো আর চিকিৎসা হবে না।

ডাক্তার সাহবে আমাকে প্লিজ একটু বুঝিয়ে বলুন রোগটি সম্পর্কে।

ডাক্তার সাহেব বলা শুরু করলেন,

গনোরিয়া কী?

গনোরিয়া গনোকক্কাল ইনফেকশন (Gonococcal Infection) নামেও পরিচিত।

গনোরিয়া ব্যাক্টেরিয়া দ্বারা সংঘটিত একটি ইনফেকশন, যা যৌনমিলনের মাধ্যমে ছড়ায়।

এই রোগ সাধারণত মূত্রনালী, পায়ুপথ অথবা গলায় হয়ে থাকে। নারীদের ক্ষেত্রে এই রোগ জরায়ুমুখে হতে পারে। গর্ভবতী মহিলারা যদি এই রোগে আক্রান্ত হয় তবে তাদের শিশুদেরো এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।  শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগটি সাধারণত চোখে আক্রমণ করে থাকে।

গনোরিয়া এমন একটি ইনফেকশন যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণ ছাড়াই হয়ে থাকে। কোনো কোনো সময় এতে আক্রান্ত হলেও টের পাওয়া যায় না। অনিরাপদ যৌনমিলন থেকে বিরত থাকা, অথবা যৌনমিলনের সময় কনডম ব্যবহার করা অথবা শুধুমাত্র একজন সঙ্গীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন ইনফেকশন থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

গনোরিয়ার কারণ

নাইসেরিয়া গনোরিয়া (Neisseria gonorrhoeae) নামক ব্যাক্টেরিয়ার কারণে গনোরিয়া  হয়ে থাকে। এই রোগ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের যৌন সম্পর্ক যেমন ওরাল সেক্স, পায়ুপথ অথবা যোনিপথের যৌন মিলনের মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করে।

গনোরিয়া রোগের লক্ষণ

মূলত লিঙ্গ থেকে তরল নির্গত হওয়া আর প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া করা। সামগ্রিকভাবে এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে আমরা যে লক্ষণগুলো দেখি সেগুলো হচ্ছেঃ 

  • পুরুষাঙ্গ দিয়ে তরল নির্গত হওয়া (Penile discharge)
  • পেটে তীক্ষ্ণ ব্যথা (Sharp abdominal pain)
  • যোনী দিয়ে স্রাব নির্গত হওয়া (Vaginal discharge)
  • যোনীপথে চুলকানি (Vaginal itching)
  • মূত্রত্যাগের সময় ব্যথা হওয়া (Painful urination)
  • পেনিস বা পুরুষাঙ্গে লালভাব দেখা দেওয়া (Penis redness)
  • নড়াচড়া করতে সমস্যা হওয়া (Problems with movement)
  • ত্বকে অস্বাভাবিক অনুভূতি হওয়া (Paresthesia)
  • ত্বকে চুলকানি (Itching of skin)
  • যোনীপথে ব্যথা (Vaginal pain)
  • গর্ভকালীন রক্তক্ষরণ (Spotting or bleeding during pregnancy)
  • মাংসপেশীর খিঁচুনি/টান (Cramps and spasms)

গনোরিয়া হবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায় যা করলে

ডাক্তার সাহেব বলতে থাকলেন, যে সকল কারণে এই রোগের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে সেগুলো হচ্ছেঃ

  • অল্প বয়স্ক ব্যক্তিদের এই রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশি। 
  • একের অধিক যৌন সঙ্গী থাকা।
  • পূর্বে গনোরিয়ায় আক্রান্ত হওয়া।
  • অন্যান্য যৌনবাহিত ইনফেকশন থাকা।

যাদের ঝুঁকির বেশি

পুরুষদের মধ্যে এই রোগ হবার সম্ভাবনা নারীদের চেয়ে কিছুটা কম।

মাসুদ জিজ্ঞেস করলো, গনোরিয়ার চিকিৎসার পর কি নিরাপদে যৌন মিলন করা যাবে? করা গেলে কবে থেকে?

  • ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সকল ঔষধ সেবনের সাত দিন পর যৌনমিলন শুরু করা যেতে পারে।
  • গনোরিয়ার চিকিৎসা না করলে কী হবে?
  • গনোরিয়ার চিকিৎসা করা না হলে পুরুষ এবং নারী উভয়ের স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি এবং স্থায়ী সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর থেকে মহিলাদের পেলভিক ইনফ্লামেটরী ডিজিজ (PID) হতে পারে। পেলভিক ইনফ্লামেটরী ডিজিজ (PID) এর কিছু জটিলতা গুলো হলোঃ
  • একটপিক প্রেগনেন্সি (গর্ভাশয়ের বাহিরে ভ্রূণ তৈরী হলে)
  • ক্ষতগ্রস্ত টিস্যুর সৃষ্টি হয় যা নিষেক নালীতে (fallopian tubes) বাধা প্রদান করে।
  • বন্ধ্যাত্ব
  • তলপেটে দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা।

পুরুষদের ক্ষেত্রে গনোরিয়ার কারনে অণ্ডকো্ষে্র নালীতে প্রচণ্ড ব্যথা হতে পারে। মাঝে মধ্যে এর চিকিৎসা করা না হলে রক্তে অথবা সন্ধিতে এ রোগ ছড়িয়ে যেতে পারে, এরকম অবস্থা জীবনের জন্য হুমকি সরূপ হতে পারে।

চিকিৎসা করা না হলে গনোরিয়া থেকে এইডস (AIDS) রোগের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। যারা অসুরক্ষিত যোনীপথ, পায়ুপথ এবং ওরাল সেক্সে অভ্যস্থ তাদের গনোরিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

এ পর্যন্ত বলার পরে ডাক্তার সাবেব বললেন, আপনাকে গনোরিয়ার কিছু টিপস দেই।

হেলথ টিপস্‌

  • যৌন মিলনের সময় কনডম ব্যবহার করা: যৌনমিলন থেকে বিরত থাকলে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকেনা। কিন্তু যেকোনো ধরণের যৌন সম্পর্ক যেমন যোনিপথ, পায়ুপথ অথবা ওরাল সেক্সের ক্ষেত্রে অবশ্যই কনডম ব্যবহার করতে হবে।
  • সঙ্গীকে যৌনতার মাধ্যমে সংক্রমিত ইনফেকশনের টেস্ট/পরীক্ষার জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করা:  নিজের সঙ্গী গনোরিয়া সহ অন্যান্য সেক্স এর মাধ্যমে ইনফেকশনের পরীক্ষা করিয়েছে কিনা তা জানতে হবে। যদি না করিয়ে থাকে তাহলে তাকে তা করার জন্য উৎসাহিত করতে হবে।
  • কারও অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে তাদের সাথে যৌনমিলন থেকে বিরত থাকা: সঙ্গীর যৌনতার মাধ্যমে সংঘটিত কোনো ইনফেকশন যেমন প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া অথবা যৌনাঙ্গে ফুসকুড়ি বা ফোস্কা/ঠোসার লক্ষণ দেখা দিলে তার সাথে যৌন সম্পর্কে যাওয়া যাবে না।
  • গনোরিয়া হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে গেলে  নিয়মিত পরীক্ষা করানো: গনোরিয়া ইনফেকশন বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে ডাক্তারের শরণাপণ্ণ হতে হবে। অতীতে যৌন মিলনের মাধ্যমে সংঘটিত ইনফেকশন অথবা নতুন যৌন সঙ্গী অথবা একের অধিক যৌন সঙ্গী থাকলে এই রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

মাসুদ বললো, ডাক্তার সাহেব, সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যাবে তো এই রোগ?

আমি ঔষধ লিখে দিচ্ছি, নিয়মিত খাবেন। একদম ১০০% সুস্থ হয়ে যাবেন। চিন্তার কিছু নেই।

অনেক অনেক ধন্যবাদ স্যার!

ভালো থাকবেন।

আসসালামুয়ালাইকুম স্যার। আল্লাহ হাফেজ।

ওয়ালাইকুম সালাম। আল্লাহ হাফেজ।




স্বাস্থ্য সম্পর্কিত এনজাইমের এই ধরনের ব্লগ আরও পড়তে ক্লিক করুন এখানে