রেজার দিনকাল বেশ খারাপ যাচ্ছে। কাজের চাপ আগের চাইতে বেশি তো আছেই সেই কীসাথে মনটাও কদিন ধরে খারাপ যাচ্ছে, চুল পড়ার সমস্যায়। বিশেষ করে অফিসে আসার আগে আয়নায় নিজের দিকে তাকালে যখন সে দেখে মাথার চুলগুলো দিন দিন পাতলা হয়ে আসছে, কেমন একটা হতাশা ভর করে তার উপড়ে। এখনো ত্রিশের কোঠায় পৌঁছায়নি রেজা। এখনি চুল পড়তে থাকলে কি হবে সামনে, এই ভেবে আরো মন খারাপ তার।

চুল পড়া সমস্যা কেন হয়?

Alopecia

চুল পড়া সমস্যার অন্যতম কারণ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ত্রুটি। ইংরেজিতে যাকে বলে অটোইমিউন ডিজিজ (autoimmune disease)।

যে কোনো জীবাণু দেহের ভিতরে প্রবেশ করতে দিতে বাঁধা প্রদানকারী ইমিউন সিস্টেম যখন লোমগ্রন্থির সুস্থ টিস্যুকে আক্রমণ করে তখন চুল পড়ার সমস্যা দেখা দেয়। এই সমস্যায় চুল পড়া ছাড়া আর কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায়না!

কেমন একটা শিরশির ভাব অনুভূত হচ্ছে চিন্তা করতেই। আরো একটু বিস্তারিত জানতে তাই নিজের সামনে থাকা ল্যাপটপটায় সার্চ করতে বসলো রেজা। এক জায়গায় সে খুঁজে পেলো,

১৪% রোগীর যে স্থান হতে চুল পড়ে যায় সে স্থানে জ্বালাপোড়া করে এবং চুলকানি হয়। এর কারণে দেহের যেকোনো একটি নির্দিষ্ট অংশ থেকে চুল পড়ে যেতে পারে। তবে মাথার ত্বকে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।

চুল পড়া সমস্যার প্রকারভেদঃ

চুল পড়া, সমস্যা
চুল পড়া সমস্যার প্রকারভেদ

(১)এলোপেসিয়া টোটালিস (Alopecia totalis): শুধু মাথার সমস্ত চুল পড়ে যা

(২)এলোপেসিয়া  ইউনিভার্সালিস (Alopecia universalis):  দেহের সমস্ত লোম পড়ে যায়। এই সমস্যার প্রকৃত কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে এর পেছনে বংশ বা জিনগত কারণ থাকতে পারে।

মাথার ঝরতে থাকা চুল নিয়ে চিন্তিত রেজা লেখা গুলো পড়তে পড়তে একবার মনের অজান্তেই নিজের মাথায় হাত বুলিয়ে নেয়। রিভিল্ভিং চেয়ারটা একটু নেড়েচেড়ে নতুন তথ্যের জন্যে সার্চ করে গুগলে। সে এই চুল পড়ার কারণগুলো কি হতে পারে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চায়।

ইন্টারনেটে চুল পড়া সমস্যার কারণ হিসেবে আলাদা আলাদা বেশ কিছু লেখা খুঁজে পায় রেজা।

অধিকাংশ ব্যক্তির প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ১০০ টি পর্যন্ত চুল ঝরে পড়ে। কিন্ত মাথার ত্বকে প্রায় লক্ষাধিক চুল থাকায় সেটা স্বাভাবিকভাবে বোঝা যায় না। ধীরে ধীরে তাই বয়স বাড়লে বেশিরভাগ মানুষের চুল পাতলা হয়ে যায়।

এইটুকু অংশ স্বাভাবিক অবস্থা। রেজার সমস্যা স্বাভাবিক পর্যায়ে নেই। তাই বিস্তারিত বিবরণ সে পরতে শুরু করলো।

চুল পড়ার আরও বেশ কিছু কারণ রয়েছে, যেমন- হরমোনের সমস্যা, বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতা এবং বিভিন্ন ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

যে সকল কারনে চুল পড়ে যেতে পারেঃ

হরমোনজনিত কারণে (Hormonal factors):

• চুল পড়ার সমস্যা সাধারণভাবে বংশগতভাবে হয়ে থাকে।
• জীনগত কারণে নির্দিষ্ট কিছু সেক্স হরমোন স্থায়ীভাবে চুলপড়ার সমস্যাকে বৃদ্ধি করতে পারে।
• বয়ঃসন্ধিকালের সাথে সাথে ছেলেদের চুল পড়া সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। হরমোনের পরিবর্তন এবং ভারসাম্যহীনতার ফলে অস্থায়ীভাবে চুল পড়তে পারে।
• গর্ভাবস্থায় এবং সন্তানের জন্ম দানের ফলে অনেকের চুল পড়া সমস্যা হতে পারে।
• জন্মবিরতীকরণ পিল অনিয়মিতভাবে খাওয়ার ফলে অথবা মেনোপোজের পূর্বে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

অন্যান্য রোগের কারণ (Medical conditions):

• থায়রয়েড গ্রন্থি ( Glands) সঠিকভাবে কাজ না করলে
• ইমিউন সিস্টেম লোমগ্রন্থিকে আক্রমন করলে
• ত্বকে কোনো ধরনের ইনফেকশন হলে

এইটুকু পড়ে একবার থামলো রেজা। এই যে কারণগুলো এখানে উল্লেখ আছে এই ধরনের সমস্যার মাঝে বংশগত ভাবে চুল পড়ার বিষয়টা বাদে আর কোন সমস্যাকে নিজের সাথে খুব একটা মিলাতে পারলো না সে। এর বাইরে আরো কি কারণ থাকতে পারে চুল পড়ার, সে বিষয়ে অন্য লেখা খুঁজে বের করলো সে।

মেডিকেশন /ঔষধ ব্যবহারের কারণে (Medications):

যে সব রোগের ঔষধ ব্যবহারের ফলে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় চুল পড়ে যেতে পারে –

·         ক্যান্সার।

·         আর্থ্রাইটিস

·         বিষণ্ণতা

·         হৃদরোগ।

·         উচ্চ রক্তচাপ।

এর বাইরেও যে সকল কারণে চুল পড়ে যেতে পারে-

·         শারীরিক সমস্যা (অস্বাভাবিক ভাবে ওজন হ্রাস, উচ্চ তাপমাত্রার জ্বর)

·         মানসিক চাপ (পরিবারের কেউ মারা গেলে)

·         নিজের চুল টানার অভ্যাস। এই অভ্যাস সাধারণত মানসিক সমস্যার কারণে হয়ে থাকে। এই অভ্যাসের কারণেও চুলের উপর খারাপ প্রভাব পড়ে, এবং ফলাফলস্বরূপ চুল পড়ে যায়।

·         চুল টেনে পিছনে বাঁধার মতো বিভিন্ন হেয়ারস্টাইলের কারণে চুলের গোড়ায় চাপ সৃষ্টি হলে চুল পড়ে যায়।

·         চুলে সঠিক পুষ্টি যেমন আয়রন এবং প্রোটিনের অভাব হলে চুল পড়ে যায়।

·         ঘন ঘন চুলের স্টাইল পরিবর্তনের ফলে চুলের গোড়া ফেটে যায়, ফলে চুল পড়ে যেতে পারে।

বর্তমানের এই মহামারী পরিস্থিতিতে মানসিক সমস্যায় তো থাকতেই হচ্ছে রেজাকে। সেই সাথে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যাটা হয়েছে তার বছর দু’এক হলো। পুরো ব্যাপারটা তারপরও কেমন জট পাকিয়ে আছে।

অফিসের লাঞ্চের বিরতিতে মাথার এই জট ছাড়াতে একজন বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলার বিষয় চিন্তা করলো রেজা। চুল ঝরে যাবার সমস্যায় কি করা যায় এ নিয়ে স্বাস্থ্য পরামর্শ নেয়াই ভালো হবে ভাবলো সে। ফোনে থাকা এনজাইম কেয়ার অ্যাপ থেকে একজন ডাক্তার খুঁজে বের করে সেই দিন সন্ধ্যার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নিলো রেজা। চেম্বারে যেয়ে বা ফোন নাম্বার খুঁজে বের করে  অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেয়ার ঝঞ্ঝাট এড়াতে এই অ্যাপ রেজা ব্যবহার করছে বেশ কিছুদিন ধরে। 

ডাঃ মিরাজ আহমেদের চেম্বার তার অফিস থেকে কাছেই। তিনি একজন ডারমাটোলজিস্ট। রেজা অফিস শেষে সময় মত ডাক্তার মিরাজের চেম্বারে যেয়ে উপস্থিত হলো। রেজার ডাক পড়তেই চেম্বারে যেয়ে বসলো সে। প্রাথমিক ভাবে নিজের চুল পড়ার সমস্যা নিয়ে কিছুক্ষন আলোচনা করলো রেজা। তারপর ডাঃ মিরাজ রেজাকে চুল পড়ার কিছু লক্ষন লেখা একটা চার্ট দিয়ে জিজ্ঞাস করলেন এর কোনগুলো রেজার দেখা দিয়েছে। 

চুল পড়ার সাধারন লক্ষনসমূহ:

  • চুল পড়ে যাওয়া (Too little hair) 
  • মাথার অস্বাভাবিক ত্বক (Irregular Appearing scalp)
  • ত্বকের ফুসকুড়ি (Skin rash)         
  • ত্বক ফুলে যাওয়া (Skin swelling)
  • শুষ্ক বা খসখসে মাথার ত্বক (Dry or Flaky Scalp)
  • ব্রণ/পিমপল (Acne or pimples)  
  • মাথার ত্বকে চুলকানি (Itchy scalp)                             
  • ত্বকের বৃদ্ধি (Skin growth)

লক্ষন হিসেবে এর মাঝে যে কয়টা রেজার মনে হলো তার দেখা দিয়েছে , সেগুলো সে ডাঃমিরাজ কে জানালো।

উত্তর দেয়া শেষ হওয়ার পর রেজা ডাঃমিরাজ কে জিজ্ঞাস করলো, “স্যার, চুল পড়া কি কোন মারাত্মক রোগের লক্ষন?”  

জবাবে ডাঃ মিরাজ বললেন,

চুল পড়া কোনো প্রাণঘাতি রোগ তো না। এই রোগে আলাদা শারীরিক কোন সমস্যা দেখা যায় না কিন্তু অনেকে চুল পড়ে যাওয়াকে সৌন্দর্য হানিকারক বলে মনে করে, তাদের জন্য এটি একটি গুরুতর সমস্যা। এর কারণে মানুষ মানসিক ও সামাজিকভাবে চাপের সম্মুখীন হয়।

তবে এর বাইরেও অন্য ধরনের যে রোগ আছে, যেমন- “এলোপেসিয়া  ইউনিভার্সালিস” Alopecia universalis (AU)। এই রোগে চোখের পাপড়ি, ভ্রু, নাক ও কানের লোম পড়ে যায়। এর কারণে সহজেই ধুলা, ময়লা এবং বিভিন্ন জীবাণু চোখে, কানে বা নাকে প্রবেশ করে।

রেজার পরের প্রশ্ন, “ আমার বাবার মাথায় টাক আছে, আসলে পারিবারিরক ভাবে এই রোগ হবার বিষয়টা আমার কাছে  ঠিক পরিষ্কার না। এই বিষয়টায় যদি কিছু বলতেন?”

ডাঃ মিরাজ উত্তর দিলেন,

সাধারণত পরিবারের কারও অটোইমিউন ডিজঅর্ডার (autoimmune disorder) যেমন টাইপ ১ ডায়াবেটিস, বাত, থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা, সিস্টেমিক লুপাস ইরাইথ্রমেটসাস (Systemic lupus erythematosus), মারাত্মক রক্তস্বল্পতা অথবা  এডিসন’স ডিজিজ থাকলে চুল পড়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। যাদের চুল পড়া রোগ আছে তাদের সাধারণত থাইরয়েড ডিজিজ, এটোপিক অ্যাকজিমা, নেজাল অ্যালার্জি এবং অ্যাজমা জাতীয় রোগ হয়ে থাকে।

রেজার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সাথে সাথে চিহ্নিত লক্ষনগুলো দেখে নিয়ে, রেজাকে রোগ সংক্রান্ত আরো কিছু প্রশ্ন করলেন ডাঃ মিরাজ। তারপর সমস্যা অনুযায়ী কিছু চিকিৎসার ব্যাপারে প্রেসক্রিপশনে লিখে দিলেন। রেজা প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে দেখলো দেখানে চিকিৎসার সাথে নিচে ছাপার কালিতে কিছু হেলথ টিপস লেখা আছেঃ

হেলথ টিপস:

·         নিয়মিত সুষম খাবার খেতে হবে।

·         টান করে চুল বাঁধা যাবে না যেমন ঝুটি, বিনুনি বা পনিটেইল।

·         বারবার চুল টানা, চুলকানো বা আঙ্গুল দিয়ে চুল প্যাঁচানো যাবে না।

তবু একটা প্রশ্ন রেজার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিলো। তাই বিদায় নেবার আগে প্রশ্নটা করেই ফেললো সে। “আচ্ছা স্যার, চুল পড়া সমস্যা যাদের হয়, তাদের কি আবার চুল গজাতে পারে?”

ডাঃ মিরাজ নিজের চশামাটা ঠিক করে রেজার দিকে তাকিয়ে জবাব দিলেন,

চুল পড়া সমস্যার চিকিৎসা নিলে এর আগে বা পরে চুল আবারো গজাতে পারে। কিন্তু পরবর্তীতে সেই চুল পড়ে যেতে পারে। চুল কখন গজাবে বা পড়ে যাবে সেটা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। এক এক জনের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এক এক রকম ভাবে ঘটে। কারও খুব কম চুল পড়ে এবং সেগুলো আবার গজিয়েও যায়। আবার অনেকে লম্বা সময় ধরে এই সমস্যায় ভুগতে পারে। তাদের ক্ষেত্রে অবস্থা ভিন্ন হতে পারে।

সব শুনে আর চিকিৎসা পরামর্শ হাতে পেয়ে রেজা কিছুটা স্বস্তি বোধ করলো। ডাঃ মিরাজকে ধন্যবাদ জানিয়ে চেম্বার থেকে বের হয়ে এলো। নিজের মনে মনে ভাবলো, চুল পড়া সমস্যার সমাধান যেহেতু রয়েছে, তাহলে আগেই চিন্তিত হবার কি আছে। সমাধান পাওয়ার চেষ্টাটা থাকতে হবে মন থেকে। আর সেই চেষ্টা সে করেই যাবে। এই ভেবে হালকা মনে নিজের বাড়ির পথ ধরলো রেজা। 

স্বাস্থ্য বিষয়ে আমাদের অন্যান্য ব্লগগুলো পড়তে ঘুরে আসুন আমাদের ব্লগসাইটের হোমপেজ থেকে।  

চুল পড়া সম্পর্কে আপনার কোনো জিজ্ঞাসা বা পরামর্শ থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুণ ইমেইলফেসবুক অথবা ফোন করুণ +০৯৬৩৯০০৬৬২২ নম্বরে।