জলাতঙ্ক কী সে সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই ভুল ধারণা রয়েছে। জলাতঙ্ক বা হাইড্রোফোবিয়া কিভাবে হয়, জলাতঙ্ক কেন হয়, জলাতঙ্ক রোগের টিকা ও প্রতিকার বিষয়ক কিছু তথ্য নিয়েই আমাদের আজকের ব্লগ।


রাশেদের আচরণে কদিন ধরে ওর বাবা হাসান সাহেব কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করছেন। আলো পছন্দ করছে না। অস্বাভাবিক শব্দ করছে। এমন কি আরও অস্বাভাবিক হচ্ছে ও কারও উপরে রেগে গেল কামড়াতে চাছে। তিনি কিছুটা ভয় পেলেন সেদিন রাতে যেদিন দেখলেন রাশেদ পানি খেতে এসে চিৎকার করে পানির গ্লাস ছুড়ে ফেললো। আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে থাকলো গ্লাসটার দিকে।

হাসান সাহেবের মনে যে সন্দেহ হচ্ছিল সেটি তিনি ভাবতেও চাইছিলেন না। কারণ সন্দেহটার পরিণতি অত্যন্ত অশুভ।

তিনি ছেলেকে নিয়ে সেদিনই ডাক্তারের কাছে গেলেন। ডাক্তার তার সন্দেহকেই সঠিক প্রমাণ করে বললেন যে রাশেদের জলাতঙ্ক হয়েছে। কান্নায় ভেঙে পড়লেন হাসান সাহেব।

কদিন পরেই রাশেদ মারা যায়।

আমরা কেউই চাই না রাশেদের পরিণতি আমাদের প্রিয়জনদের হোক। আসুন জেনে নেই জলাতঙ্ক কী, কেন হয় এবং চিকিৎসা কী।

জলাতঙ্ক কী?

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ কালের কণ্ঠ

জলাতঙ্ক মানে জলের প্রতি ভীতি। যে রোগ হলে মানুষ পানিকে ভয় করে এবং পান করা বন্ধ করে দেয় তাকেই প্রচলিত ভাষা জলাতঙ্ক বলে।

জলাতঙ্ক রেবিস ভাইরাসের কারণে হয়। এটি একটি প্রাণঘাতী রোগ। একবার যদি এই রোগের লক্ষণ প্রকাশিত হয়ে যায় তাহলে এই রোগে মৃত্যু অবধারিত। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার মানুষ জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে।

জলাতঙ্ক রোগ কিভাবে হয়?

এই রোগটিকে বলে জুনোটিক ধরনের রোগ। অর্থাৎ এই রোগটি প্রাণী থেকে মানুষে মধ্যে ছড়ায়।

এই রোগে গৃহপালিত ও বন্য প্রাণীরা প্রথমে সংক্রমিত হয় এবং এরপরে মানুষ এই সংক্রমিত প্রাণীগুলির বা এদের লালার সংস্পর্শে আসলে বা এই প্রাণীগুলো মানুষকে কামড়ালে অথবা আঁচড় দিলে এই রোগ মানুষের মধ্যে ছড়ায়।

বাংলাদেশে শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগ জলাতঙ্ক রোগ হয় কুকুরের কামড়ে।

জলাতঙ্ক রোগের লক্ষণ

এই রোগে আক্রান্ত সন্দেহজনক প্রাণি কামড়ানোর ৯ থেকে ৯০ দিনের মাঝে জলাতঙ্কের লক্ষণ দেখা দেয়। আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে পাগলামো আচরণ এবং চুপচাপ হয়ে যাওয়া আচরণ—এ দুই ধরনের আচরণ দেখা দেয়ার সম্ভাবনা থাকে। যেমনঃ

১। আক্রান্ত ব্যক্তির কথাবার্তা ও ভাবভঙ্গি হবে অস্বাভাবিক। উদ্দেশ্য ছাড়াই ছুটে বেড়াবে।

২। ক্ষুধামন্দা হবে

৩। বিকৃত আওয়াজ করবে

৪। বিনা প্ররোচনায় অন্যকে কামড়াতে আসবে

৫। পানির পিপাসা খুব বেড়ে যাবে, তবে পানি খেতে পারবে না। পানি দেখলেই আতঙ্কিত হবে, ভয় পাবে।

৬। খাবার খেতে খুবই কষ্ট হবে, খেতে পারবে না।

৭। শরীরে কাঁপুনি, মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ হবে।

৮। কণ্ঠস্বর কর্কশ হতে পারে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাবে, আক্রমণাত্মক আচরণ দেখা দেবে।

৯। মৌন আচরণে আক্রান্ত স্থান একটু অবশ অবশ লাগবে।

১০। শরীর নিস্তেজ হয়ে ঝিমুনি আসতে পারে। মানুষের চোখের আড়ালে থাকা, শরীরে কাঁপুনি ও পক্ষাঘাত দেখা দিতে পারে।

জলাতঙ্কে আক্রান্ত প্রাণি কামড় বা আঁচড় দিলে যা করবেন

সন্দেহভাজন প্রাণি কামড়ানো বা আঁচড়ানোর সাথে সাথে ক্ষতস্থানটি ১০-২০ মিনিট ধরে সাবান ও প্রবহমান পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলার পর পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দ্রবণ দিয়ে ভালো করে পরিষ্কার করতে হবে। এরপর ক্লোরহেক্সিডিন বা পোভিডোন আয়োডিন দিয়ে ক্ষতস্থানটিকে ভালো করে ওয়াশ করতে হবে। এতে ৭০-৮০% জীবাণু নষ্ট হয়ে যায়।

এরপর অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে অথবা নিকটবর্তী হাসপাতালে নিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ মতো রেবিস ভ্যাকসিন নিতে হবে। সাধারণত প্রথম দিন দেওয়ার পর ৩, ৭, ১৪ ও ২৮তম দিনে মোট ৫টি ডোজে ভ্যাকসিন দিতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে হিউম্যান রেবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিনও দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

ক্ষতস্থানে যা করা যাবে না

১। ক্ষতস্থানে কোনো স্যালাইন, বরফ, চিনি, লবণ ইত্যাদি ক্ষারক পদার্থ ব্যবহার করা যাবে না।

২। বাটিপড়া, পানপড়া, চিনিপড়া, মিছরিপড়া, ঝাড়ফুঁক ইত্যাদি জলাতঙ্কের হাত থেকে কাউকে বাঁচাতে পারে না।

৩। ক্ষতস্থান কখনোই অন্য কিছু দিয়ে কাটা, চোষণ করা বা ব্যান্ডেজ করা যাবে না। এতে বরং ইনফেকশন হতে পারে।

৪। ক্ষতস্থানে বরফ, ইলেকট্রিক শক দেওয়া যাবে না কিংবা হাত-পা বাঁধাও যাবে না।

৫। কোনো কবিরাজ বা ওঝার শরণাপন্ন হয়ে কোনো অবৈজ্ঞানিক কিংবা অপচিকিৎসা গ্রহণ করে সময় ক্ষেপণ করবেন না।

যেসব প্রাণির কামড়ে ভ্যাকসিন নেওয়ার প্রয়োজন নেই

ইঁদুর, খরগোশ, কাঠবিড়ালী, গুঁইসাপ ইত্যাদি কামড় দিলে রেবিস ভ্যাকসিন নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে টিটেনাস ভ্যাকসিন নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

বিশেষ অবস্থায় ভ্যাকসিন নিতে সমস্যা হবে কি

গর্ভাবস্থায়, মায়ের স্তন্যদানকালে, অন্য যেকোনো অসুস্থতায়, ছোট বাচ্চা বা বৃদ্ধ ব্যক্তি এরকম কোনো বিশেষ অবস্থায় জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিতে কোনো সমস্যা নেই।

চিকিৎসা

এই রোগ একবার হলে মৃত্যু অনিবার্য। সাধারণত লক্ষণ দেখা দেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই রোগী মৃত্যুবরণ করে। কোনো অ্যান্টিভাইরাল ঔষধ এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে না। শুধু উপশমমূলক চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব। এই রোগের টিকা আবিষ্কৃত হয়েছে। রেবিড প্রাণী কামড় দেওয়ার সাথে সাথে দ্রুত সময়ের মধ্যে টিকা নিলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

প্রতিরোধ

এই রোগ প্রতিরোধের উপায় হলো টিকা নেওয়া। এই ভাইরাসের অনেকরকম টিকা আবিষ্কার হয়েছে তবে সবচেয়ে নিরাপদ টিকা হলো হিউম্যান ডিপ্লয়েড সেল ভ্যাকসিন(HDCV)। অন্যান্য টিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পিউরিফাইড চিক ইমব্রিও সেল ভ্যাকসিন, ডাক ইমব্রিও সেল ভ্যাকসিন, নার্ভ টিস্যু ভ্যাকসিন ইত্যাদি। ডাক সেল ভ্যাকসিনের ইমিউনোজেনেসিটি বা কার্যকারিতা কম এবং নার্ভ টিস্যু ভ্যাকসিন অ্যালার্জিক এনসেফালোমায়েলাইটিস করতে পারে। ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পূর্বে টিকা নেওয়া কে প্রি-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস ও আক্রান্ত হওয়ার পরে টিকা নেওয়া কে পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস বলে।

প্রি-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস

পশুচিকিৎসক, চিড়িয়াখানার প্রাণীদের দেখাশোনাকারী,উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী লোকজন বা উক্ত এলাকায় ভ্রমণকারী ব্যক্তি ও যারা বাড়িতে কুকর পোষে তাদেরকে প্রতিরোধমূলক টিকা দেওয়া হয়। সাধারণত তিনটি ডোজ ০,৭ ও ২১ বা ২৮ তম দিনে ও প্রতিবছর বুস্টার ডোজ দেয়া হয়।

পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস

রেবিজ ভাইরাসের সুপ্তাবস্থা অনেক বেশি হওয়ায় টিকা দেওয়ার পরে প্রতিরোধক ইমিউনিটি তৈরির জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকে তাই এই ভ্যাকসিন পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস হিসেবে নিয়মিত রূটিনমাফিক ব্যবহার করা হয়।সাধারণত আক্রান্ত হওয়ার দশ দিনের মধ্যে দিলেও ক্সজ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

 ক্ষতস্থানটি সাবান ও পানি দিয়ে কমপক্ষে ১৫ মিনিট ধৌত করতে হবে অতঃপর আয়োডিন দ্রবণ দিয়ে পুনরায় পরিষ্কার করতে হবে। টিটেনাস টিকাও দেবার কথা বিবেচনা করতে হবে। পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিসের মধ্যে টিকা ও হিউম্যান রেবিজ ইমিউনোগ্লোবিউলিন(RIG) উভয়ই অন্তর্ভূক্ত।

হিউম্যান ডিপ্লয়েড সেল ভ্যাকসিনের পাঁচটি ডোজ ০,৩,৭,১৪ ও ২৮ তম দিনে দেওয়া হয়। তবে ৯০তম দিনে আরেকটি বুস্টার ডোজ দেওয়া যেতে পারে। RIG শুধু একবার প্রথমদিনে দেওয়া হয়। এটি মূলত ক্ষতস্থানে বেশি দিতে হয়, বাকি অংশটুকু মাংসপেশিতে দিতে হয়।

টিকার মধ্যে নিষ্ক্রয় রেবিজ ভাইরাস থাকে পক্ষান্তরে ইমিউনোগ্লোবিউলিন হলো অ্যান্টিণবডি তাই এই দুটি ইনজেকশন শরীরের দুটি ভিন্ন জায়গায় পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় রেখে দিতে হয় নতুবা RIG মধ্যস্থিত অ্যান্টিবডি ভাইরাসটিকে অকেজো করে দিবে এবং টিকার কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাবে।

যদি কামড় প্রদানকারী প্রাণীকে ধরে ফেলা যায় তাহলে ১০ দিন তাকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। যদি প্রাণীটির মধ্যে রেবিজ আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ প্রকাশ পায় তাহলে তাকে মেরে ফেলা উচিত।যদি লক্ষণ না পাওয়া যায় তাহলে প্রাণীটি রেবিজ প্রাণী নয়। সেক্ষেত্রে রেবিজ ভ্যাকসিন এর প্রয়োজন নেই।



তথ্যসূত্রঃ এই ব্লগের তথ্য জাগোনিউজ এবং উইকিপিডিয়াসহ ইন্টারনেটের বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

এই ধরণের আরও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ব্লগ পড়তে এনজাইম ব্লগের হোমপেইজ ঘুরে আসুন এখানে ক্লিক করে।