টাইপ ১ ডায়াবেটিস কী?

টাইপ ১ ডায়াবেটিস

টাইপ ১ ডায়াবেটিসকে অটোইমিউন (autoimmune) ধরণের রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অগ্ন্যাশয়ে অবস্থিত (pancreas) ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলো পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যাবার ফলে যখন মানুষের শরীরে ইনসুলিন উৎপাদন একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়, সে অবস্থাকে টাইপ ১ ডায়াবেটিস বলা হয়।

টাইপ ২ ডায়াবেটিস কী?

টাইপ ২ ডায়াবেটিস

টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে অগ্ন্যাশয়ে অবস্থিত (pancreas) ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষ কর্মক্ষম থাকে কিন্তু শরীর ইনসুলিন গ্রহণে বাধা দেয়। অন্যভাবে বলা যায় টাউপ ২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে মানুষের শরীর ইনসুলিনের পূর্ণ ব্যবহার করতে অক্ষম হয়ে যায়। 

টাইপ ১ ডায়াবেটিসএবং টাইপ ২ ডায়াবেটিস এর পার্থক্যঃ 

টাইপ ১ এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে, এর মাঝে প্রচলিত কিছু পার্থক্য নিচে দেয়া হলোঃ 

  • টাইপ ১ ডায়াবেটিস মূলত জেনেটিকাল সমস্যার কারণে হয়ে থাকে এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের মাঝে অধিক হারে হতে দেখা যায়। 
  • টাইপ ২ ডায়াবেটিস খাদ্যাভ্যাস বা ওজন সংক্রান্ত কারণে হবার সম্ভবনা থাকে, যার লক্ষণ ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়।  
  • টাইপ ১ ডায়াবেটিস সাধারণত টাইপ ২ ডায়াবেটিস থেকে তুলনামূলক কম হয়ে থাকে। একে জুভেনাইল (juvenile) ডায়াবেটিসও বলা হয় কারণ সাধারণত যাদের অল্প বয়সে ডায়াবেটিস ধরা পড়ে তাদের মাঝেই টাইপ ১ ডায়াবেটিস হবার প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যায়।  
  • টাইপ ২ ডায়াবেটিস বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমান সময়ে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মাঝেও এর প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। সাধারণত স্থূলকায়, অধিক ওজনের মানুষের মাঝে টাইপ ২ ডায়াবেটিস বেশি পরিলক্ষিত হয়। 
  • হাইপোগ্লাইসেমিয়া (hypoglycemia) বা রক্তে সুগারের পরিমাণ কমে যাবার সম্ভবনা টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে বেশি হতে দেখা যায়। 
  • নির্দিষ্ট ধরণের ঔষধ সেবন অথবা ইনসুলিন নেবার প্রয়োজন যে সকল টাইপ ২ রোগীর নেই, তাদের রক্তে সুগারের লেভেল কমে যাবার সমস্যা সাধারণত দেখা যায় না। 
  • অপ্রাপ্ত বয়স্কদের মাঝে অধিক মাত্রায় দেখা গেলেও বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে ৪০ বা এর কম বয়স্ক ব্যক্তিদের টাইপ ১ ডায়াবেটিস হবার সম্ভবনা বেশি থাকে। তবে ৪০ উর্ধ্ব মানুষেরও ডায়াবেটিস হতে পারে। 
  • দক্ষিণ এশিয়ান বাদে বাকি অঞ্চলগুলোতে সাধারণত ৪০ বছরের বেশি বয়স্কদের মাঝে টাইপ ২ ডায়াবেটিস হতে দেখা যায়, তবে দক্ষিন এশিয়দের মাঝে ২৫ বছরের বেশি বয়স্কদের মধ্যেও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের সংক্রামণ লক্ষ করা যায়। 
  • টাইপ ১ ধরণের ডায়াবেটিস দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করে, যে কারণে এ ধরণের ডায়াবেটিস অগ্রাহ্য করা তুলনামূলক ভাবে কঠিন। 
  • টাইপ ২ ডায়াবেটিস ধীরে ধীরে বিস্তারলাভ করে, বিশেষ করে প্রাথমিক অবস্থাতে। এ কারণে টাইপ ২ ডায়াবেটিস হলেও অনেক সময় সেটা বুঝতে বেশ কিছুটা সময় লেগে যেতে পারে। যেহেতু এর লক্ষণ ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় সে কারণে রোগীর অনেক ক্ষেত্রে বছরেরও বেশি সময় লেগে যেতে পারে বোঝার জন্যে যে তার ডায়াবেটিস হয়েছে।
টাইপ ১ ডায়াবেটিস, টাইপ ২ ডায়াবেটিস

টাইপ ১ ডায়াবেটিসএবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসের যে লক্ষণসমূহ একই রকম হয়ে থাকেঃ 

  • ঘন ঘন প্রসাবের বেগ আসা, মূলত রাতের দিকে এই সমস্যা বেশি হতে পারে। 
  • অতিরিক্ত পানি পিপাসা পাওয়া
  • সাধারণ সময়ের চাইতে অধিক ক্লান্ত অনুভব করা 
  • কোনো রকম চেষ্টা ছাড়াই ওজন কমতে থাকা
  • শরীরের যে কোনো কাটা-ছেড়া শুকাতে অনেক বেশি সময় নেয়া 
  • দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে আসা 

ডায়াবেটিস থাকার কারণে যে সকল রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়ঃ 

হৃদরোগ – 

যদিও হৃদরোগ হবার প্রধান বা একমাত্র কারণ ডায়াবেটিস নয়, তারপরও ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে হৃদরোগ হবার সম্ভবনা বেশি থাকে। হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতে তাই বেশ কিছু কাজ নিয়মিত করে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে যেমন, ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রনে রাখা, ব্যায়াম বা কায়িক পরিশ্রম করা, স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করা ইত্যাদি। 

ওয়েবএমডি এর হিসেবে ৭৫ বছর থেকে কম বয়স্কদের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার এক চতুর্থাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। সঠিক জ্ঞান এবং উন্নত চিকিৎসার সমন্বয়ে এই কাজ করা সম্ভব। সে জন্যে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট , হার্ট ফেইলিওর , হার্ট অ্যাটাক এর ব্যাপারে পরিষ্কার ধারনা রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উপকারে আসতে পারে। 

কিডনি রোগ 

ডায়াবেটিক রোগীদের মাঝে সচরাচর কিডনির যে রোগ দেখা দেয় তাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়  ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি (Diabetic nephropathy), এ রোগের ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির কিডনি ফেইল হবার ঝুঁকিও থাকে। 

টাইপ ১ এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে কিডনি সংক্রান্ত সমস্যায় আক্রান্ত হবার সময়কাল ভিন্ন। টাইপ ১ ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে আক্রান্ত হবার প্রথম বছর দশেকে কিডনি রোগ হবার সম্ভবনা কম থাকে। অপরদিকে টাইপ ২ ডায়াবেটিস আক্রান্ত কিছু রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাদের দেহে ডায়াবেটিস শনাক্ত হবার সময়ই কিডনি রোগ রয়েছে।  

স্নায়বিক ব্যাথা বা নার্ভ পেইন – 

ডায়াবেটিসের কারণে যে নার্ভ পেইন সৃষ্টি হতে পারে তাকে  পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি (peripheral neuropathy) বলা হয়ে থাকে। এই ব্যাথা মৃদু ভাবে শুরু হলেও পরবর্তীতে অবশ অনুভব করা বা তীব্র ব্যাথার দিকে নিয়ে যেতে পারে। নিয়ন্ত্রণ না করলে এ ব্যাথা রোগীর জন্যে মারাত্মক হয়ে ওঠতে পারে। 

ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখলে এ ব্যাথার বৃদ্ধি পাওয়া রোধ হয় এবং শারীরিক উন্নতি ঘটে। 

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ঔষধ সেবনের মাধ্যমে এই রোগকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।  যার ফলে ব্যাথা কমে এবং আরামদায়ক ভাবে দৈনন্দিন জীবন কাটানো সম্ভব হয়। 

চোখের সমস্যা – 

ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের চোখের সমস্যা হবার সম্ভবনা বেড়ে যায়। মূলত ব্লাড সুগার (রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ) বৃদ্ধি পাবার ফলে এই সমস্যা সৃষ্টি হয়। ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তির প্রথমদিকে রক্তে সুগার বৃদ্ধি পেতে শুরু করলে এর প্রভাবে চোখের ফোকাস করার যে তরল অংশ রয়েছে তার ভারসাম্য নষ্ট হয়। যার ফলে চোখে ঝাপসা দেখা দেয়ার মতন সমস্যা দেখা দিতে পারে। 

রক্তে ব্লাড  সুগারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসলে চোখের ঝাপসা দেখার সমস্যা কমে আসে। তবে দীর্ঘদিন ধরে ব্লাড সুগারের পরিমাণ বেশি থাকলে ডায়াবেটিস সংক্রান্ত চোখের রোগ যেমন –  রেটিনোপ্যাথি (retinopathy), ম্যাকুলার এডেমা (macular edema), গ্লুকোমা (glaucoma) এবং ছানি সমস্যা (cataracts) দেখা দিতে পারে। 

এ ছাড়াও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের মাঝে নানান ধরণের ত্বকীয় সমস্যা, ইনফেকশন সংক্রান্ত রোগ ইত্যাদি অধিক পরিমাণে হয়ে থাকে। 

আপনার যদি কোনো কারনে ধারনা হয় আপনার ডায়াবেটিস হয়েছে বা হবার সম্ভবনা আছে তাহলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন এনজাইম সিম্পটম চেকারের মাধ্যমে তা নিজে ঘরে বসেই পরীক্ষা করে দেখতে পারেন বিনামূল্যে। 

ডায়াবেটিস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ে দেখতে পারেন আমাদের এই সিরিজের অন্য পর্ব ব্লাড সুগার (Blood Sugar) – কী, কেন হয়, লক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রনের জন্যে যা কিছু করতে পারেন এবং ডায়াবেটিস (Diabetes) – ভয়, আতঙ্ক ? না নিয়ন্ত্রণ যোগ্য কোনো রোগ ?

ডায়াবেটিস জনিত কিডনির রোগ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন ডায়াবেটিস জনিত কিডনির রোগ (Diabetic kidney disease) – নিয়ন্ত্রণ না করলে যে রোগ ঘটাতে পারে মৃত্যু পর্যন্ত ব্লগটি।

টাইপ ১ ডায়াবেটিস, টাইপ ২ ডায়াবেটিস বিষয়ক ভিডিওঃ

টাইপ ১ ডায়াবেটিস, টাইপ ২ ডায়াবেটিস

ব্লাড সুগার অথবা ডায়াবেটিস সম্পর্কে আপনার কোনো জিজ্ঞাসা বা পরামর্শ থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুণ ইমেইল, ফেসবুক অথবা ফোন করুণ +০৯৬৩৯০০৬৬২২ নম্বরে।