কিডনির রোগ বিষয়ে শুনলেই কেমন একটা ভয় কাজ করে অয়নের মনে। এর পেছনে যথেষ্ট কারণও আছে অবশ্য।  অয়নের বাবা বছর তিনেক আগে কিডনি সমস্যার কারণেই মারা গিয়েছেন। সেই স্মৃতি মন থেকে মুছতে পারেনি সে। তাই যে কারো এই রোগ হয়েছে শুনলেই ভেতর থেকে কেঁপে ওঠে সে। 

অয়নের অফিসের খুব কাছের এক বড়,ভাই, শিশিরের কিডনি সমস্যা দেখা দিয়েছে। সমস্যার জটিলতা বেড়েছে আরো একটি কারণে। সেটা হলো শিশিরের আবার ডায়াবেটিস আছে। বয়সের দিক দিয়ে চল্লিশের কোঠা না ছাড়ালেও শরীরে এসব রোগ বাসা বেঁধেছে তার। বেশ কিছুদিন ধরেই অয়নকে সে বলছিলো শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ডাক্তারের কাছে যাবার পর ধরা পড়ে তার কিডনিতেও সমস্যা হয়েছে। তাই কয়েকদিনের ছুটি নিয়েছে শিশির।  

আর সবার মতন ডায়াবেটিস বা কিডনি সমস্যার ব্যাপারে কিছুটা ধারনা আছে অয়নের। কিন্তু ডায়াবেটিস জনিত কিডনি রোগ সম্পর্কে খুব বেশি জানা নেই তার। শিশির ভাই কে অফিস শেষে দেখতে যাবার পরিকল্পনা যেহেতু আছে, এর আগে রোগটার ব্যাপারে একটু বিস্তারিত জেনে নিতে চাইলো অয়ন। 

হাতের কাজ শেষ করে ইন্টারনেটে ডায়াবেটিস জনিত কিডনি রোগ বিষয়ে সার্চ করতে শুরু করলো সে। প্রথমেই সে পেলো বাংলা একটা ওয়েবসাইটের লিংক। এনজাইম নামের সেই সাইটে বিশেষায়িত এই রোগের ব্যাপারেও বিস্তারিত আলোচনা আছে দেখে সে খানিকটা অবাক হলো। বাংলাদেশেও আজকাল স্বাস্থ্য বিষয়ক গোছানো লেখা পাওয়া যায় তাহলে ! লেখার প্রথমেই সে পেলো সাধারন ব্যাখ্যা। 

ডায়াবেটিস জনিত কিডনি রোগ বলতে কি বোঝায়?

ডায়াবেটিস জনিত কিডনির রোগ

মানুষের কিডনিতে  গ্লোমেরুলাস নামের একধরনের কৈশিক জালিকা থাকে, যা ছাঁকন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। ডায়াবেটিসের কারণে এই  গ্লোমেরুলাস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমনকি বিনষ্টও হয়ে যেতে পারে। গ্লোমেরুলাস স্বাভাবিক থাকলে কিডনি থেকে রক্ত ছাঁকন প্রক্রিয়ায় সামান্য পরিমাণে এলবুমিন নামক প্রোটিন নিঃসৃত হয়। অপরদিকে এই কৈশিক জালিকা ডায়াবেটিসের ফলে নষ্ট হয়ে গেলে কিডনি থেকে অস্বাভাবিক পরিমাণে এলবুমিন মূত্রের সাথে নিঃসৃত হতে থাকে।  

ডায়াবেটিসের মাধ্যমে কিডনি ক্ষতিগ্রস্থ হবার প্রথম লক্ষণ মূত্রে প্রোটিনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। কিডনি থেকে কি পরিমাণ এলবুমিন নিঃসৃত হয়েছে তার উপর নির্ভর করে ডায়াবেটিসজনিত কিডনির রোগকে দুইটি ভাগে ভাগ করা যায়। 

ডায়াবেটিস জনিত কিডনি রোগের প্রকারভেদঃ 

১.  মাইক্রোএলবুমিনুরিয়া (Microalbuminuria):

দৈনিক মুত্রের সাথে  ৩০-৩০০ মিলি্গ্রাম এলবুমিন নিঃসরিত হতে থাকলে তাকে মাইক্রোএলবুমিনুরিয়া বলে। এটি ইনসিপিয়েন্ট নেফ্রোপ্যাথি নামেও পরিচিত। 

২. প্রোটেইনিউরিয়া (Proteinuria): 

দৈনিক মুত্রের সাথে  ৩০০ মিলি্গ্রামের অধিক এলবুমিন নিঃসরিত হতে থাকলে তাকে প্রোটেইনিউরিয়া বলে। কখনও কখনও প্রোটেইনিউরিয়াকে ম্যাক্রোএলবুমিনুরিয়া বা ওভার্ট নেফ্রোপ্যাথিও বলা হয়।

রোগের সঙ্ক্রমণটা যেমন জটিল তেমনি জটিল এর ব্যাখা, মনে মনে ভাবলো অয়ন। লাঞ্চ শেষ করে ফিরে আরো কিছু ব্যাপারে দেখবে ভেবে সে তখনের মত এই ব্যাপারে দেখা শেষ করলো। 

ভাগ্য মনে হয় একেই বলে! লাঞ্চে অয়নের সাথে দেখা তাদের অফিসের হাউজ ডাক্তার ডাঃ নিশানের সাথে। এ কথা ও কথায় শিশির ভাইয়ের কথা তুললো অয়ন। ডাঃ নিশান জানালেন যে, প্রথমে লক্ষন দেখে তিনিই কিছু কিডনীর পরীক্ষা করাতে দিয়েছিলেন শিশিরকে। 

খেতে খেতেই আলোচনা চললো এ নিয়ে। ডাঃ নিশানের কাছে অয়ন জানতে চাইলো, কি কারণে আসলে ডায়াবেটিস জনিত কিডনি রোগ হয়ে থাকে? জবাবে ডাক্তার জানালেন, 

ডায়াবেটিস জনিত কিডনি রোগের কারণঃ 

আমাদের শরীরে বিপাক (Metabolism) ক্রিয়ার সাহায্যে প্রোটিন হজম হলে, হজম না হওয়া বিভিন্ন প্রকারের বর্জ্য ও দূষিত পদার্থ রেচনের (Excretion) মাধ্যমে দেহ থেকে বের হয়ে যায়। কিডনিতে ক্যাপিলারী নামের ক্ষুদ্র কিছু রক্ত নালী থাকে। যার ভেতরে থাকা অতি ক্ষুদ্র কিছু ছিদ্র রক্ত ছাঁকার কাজ করে। যখন বর্জ্য ও দূষিত পদার্থ রক্ত প্রবাহের সাথে ক্যাপিলারীতে প্রবেশ করে তখন এগুলো ক্ষুদ্রাকারের ছিদ্র পথে আটকা পড়ে এবং পরবর্তীতে মূত্রের সাথে দেহ থেকে বের হয়ে যায়। আবার দেহের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান যেমন প্রোটিন ও লোহিত রক্ত কণিকা এই ক্ষুদ্র ছিদ্র পথ দিয়ে বের হতে পারে না, এর ফলে সেগুলো পুনরায় রক্তের সাথে মিশে যায়।

ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দেয়। ব্লাড সুগার বেড়ে যাবার ফলে কিডনিতে রক্ত পরিশোধনের পরিমাণ বেড়ে যায়। লম্বা সময় ধরে এই অবস্থা চলতে থাকলে একসময় দুষিত পদার্থের সাথে প্রোটিনও মূত্রের মাধ্যমে শরীরে থেকে বের হয়ে যেতে থাকে। 

মূত্রের সাথে নির্গত প্রোটিনের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম থাকলে তাকে মাইক্রোএলবুমিনুরিয়া বলে। এ অবস্থায় বিভিন্ন চিকিৎসার সাহায্যে কিডনি সম্পূর্ণভাবে বিকল হওয়া থেকে রক্ষা করা যায়। তবে মূত্রের সাথে অধিক হারে প্রোটিন বের হয়ে যেতে থাকলে (ম্যাক্রোএলবুমিনুরিয়া) আক্রান্ত ব্যক্তির কিডনি সম্পূর্ণভাবে বিকল হয়ে যাবার সম্ভবনা থাকে।  এ অবস্থায় রক্ত পরিশোধনের জন্য ডায়ালেসিস বা কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের প্রয়োজন হয়।

কারণগুলো শুনতে শুনতে মনটা আরো খারাপ হয়ে গেলো অয়নের। শিশির ভাইয়ের কোনটা ধরা পরেছে সেটা জানতে হবে, ভাবলো সে। ডাঃ নিশানকে ধন্যবাদ জানিয়ে তখনের মতন নিজের ডেস্কে ফিরে এলো অয়ন। বিকেল পর্যন্ত কাজের ফাঁকে সে দেখে নিলো এই রোগের প্রধান লক্ষনগুলো কি, আর কোন ধরনের ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা হবার সম্ভবনা বেশি থাকে। 

ডায়াবেটিস জনিত কিডনি রোগের লক্ষণসমূহঃ 

● পা ফুলে যাওয়া (Leg swelling)

● পুরুষত্বহীনতা (Impotence)

● শ্বাস নেবার সময় ব্যথা অনুভব করা (Hurts to breath)

● শারীরিক বৃদ্ধির অভাব (Lack of growth)

● তৃষ্ণা/ পিপাসা (Thirst)

● ডিলিওশন অথবা হ্যালুসিনেশন (Delusions or Hallucinations)

● অস্বাভাবিক নখ (Irregular Appearing Nails)

● পায়ের মাংসেপশীতে টান ধরা বা খিঁচুনি হওয়া (Leg cramps or spasms)

● বুক জ্বালা (Heartburn)

● মলের সাথে রক্ত যাওয়া (Blood in stool)

● অতিরিক্ত রাগ (Excessive anger)

যে কারণে ডায়াবেটিস রোগীদের কিডনির সমস্যা হবার ঝুঁকি বেশিঃ 

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত যেকোন ব্যক্তির এ সমস্যা হতে পারে। তবে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু কারণে এ রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। যেমনঃ

● রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে না থাকা 

● দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসে ভোগা 

● ওজন নিয়ন্ত্রণে না রাখা

● উচ্চ রক্তচাপ থাকা

মাইক্রো অ্যালবুমিনুরিয়ায় আক্রান্ত বক্তিদের পরবর্তীতে যেসকল কারণে মূত্রে প্রোটিনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে সেগুলো হলোঃ

● ধূমপান

● উচ্চ রক্তচাপ 

● রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বৃদ্ধি

বিকেলে অফিস শেষ করে সোজা শিশির ভাইকে দেখতে চলে গেলো অয়ন। অয়নকে দেখে বেশ খুশিই হলেন তিনি। জানালেন আজকে কিছুটা ভালো আছেন। আর ডাক্তার জানিয়েছে তার সমস্যা একেবারে প্রাথমিক ধাপে আছে, যেটা চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রনে রাখা সম্ভব। এ কথা শুনে কিছুটা শান্তি পেলো অয়ন। বেশ কিছুক্ষন সেখানে কাটিয়ে বাসায় চলে এলো সে। সারাদিনের ক্লান্তি থাকা স্বত্বেও তার মনে হতে লাগলো যেহেতু এই বিষয়ে পড়া শুরু করেছি, পুরো ব্যাপারটা ঠিক মতন জেনে নেয়া ভালো। তাই ঘুমাতে যাবার আগে মোবাইল ফোনে আবার সেই এনজাইমের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলো অয়ন। রোগের বিস্তারিত বিবরনীর সাথে সেখানে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের দেয়া হেলথ টিপস আর রোগীদের প্রশ্নের উত্তরও আছে দেখতে পেলো সে। 

ডায়াবেটিক আক্রান্ত কিডনির অবস্থা

হেলথ টিপসঃ 

যে উপায়গুলো মেনে চললে এ রোগের ঝুঁকির পরিমাণ কমানো যায় –

● রক্তে সুগারের পরিমাণ সব সময় নিয়ন্ত্রণে রেখে 

● রক্তচাপ নিয়মিত পরিমাপ করে এবং নিয়ন্ত্রণে রেখে 

● কোলেস্টেরল এবং এলবুমিনুরিয়ার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রেখে 

● ধূমপান পরিহার করার মাধ্যমে 

● নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করে 

হেলথ টিপসের নিচেই ছিলো এ রোগ সম্পর্কে জানতে চাওয়া ব্যক্তিদের প্রশ্নের উত্তর পর্ব, যেখান থেকে নিজের জানতে চাওয়ার শেষ ভাগটুকুও খুঁজে পেলো অয়ন। 

ডায়াবেটিস জনিত কিডনী রোগের ফলে আর কি শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে? 

ডায়াবেটিস জনিত কিডনি রোগের কারণে অন্যান্য যেসকল শারীরিক সমস্যা দেখা দেয় সেগুলো হলোঃ

● কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (Cardiovascular disease)

● রেটিনোপ্যাথি (Ratinopathy)

● নিউরোপ্যাথি (Neuropathy)

একবার কিডনী সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসার মাধ্যমে কি এ অবস্থার উন্নতি সাধন করা সম্ভব? 

সাধারণত একবার কিডনিতে সমস্যা দেখা দিলে এবং চিকিৎসা করা না হলে তা ধীরে ধীরে গুরুতর পর্যায়ে চলে যায় এবং এর ফলে কিডনি ফেইলিয়রও হতে পারে। এ অবস্থায় একমাত্র ডায়ালেসিস বা কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের সাহায্যে চিকিৎসা সম্ভব। তবে নিয়মিত চিকিৎসায় থাকলে কিডনির সমস্যা নিয়ন্ত্রনে রাখা যেতে পারে। 

ডায়াবেটিসকে খুব বেশি গুরুত্বর সমস্যা মনে না করলেও এই রোগের ফলে শরীরে কি ভয়ানক প্রক্রিয়া হতে পারে সেটা বুঝতে পারলো অয়ন। এ ধরনের সমস্যা যেন নিজের বা কাছের মানুষের কারো না হয় সেই প্রার্থনা করে সেদিনের মত শুয়ে পড়লো সে। 

ডায়াবেটিস সিরিজের প্রথম পর্ব – ডায়াবেটিস – ভয়, আতঙ্ক ? না নিয়ন্ত্রণ যোগ্য কোনো রোগ ? ব্লগটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে

ডায়াবেটিস মুল কারণ ব্লাড সুগার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন ব্লাড সুগার (Blood Sugar) – কী, কেন হয়, লক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রনের জন্যে যা কিছু করতে পারেন ব্লগটি।

টাইপ ১ ডায়াবেটিস ও টাইপ ২ ডায়াবেটিস এর পার্থক্য সেই সাথে ডায়াবেটিস থাকলে কোন রোগ হবার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় সে বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন টাইপ ১ ডায়াবেটিস ও টাইপ ২ ডায়াবেটিস এর পার্থক্য কী ? ডায়াবেটিস থাকলে কোন রোগ হবার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় ? ব্লগটি।

ডায়াবেটিস জনিত কিডনির রোগ সম্পর্কে আপনার কোনো জিজ্ঞাসা বা পরামর্শ থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুণ ইমেইল, ফেসবুক অথবা ফোন করুণ +০৯৬৩৯০০৬৬২২ নম্বরে।