ডায়পার র‍্যাশ !! এক বিভীষিকার নাম। দুঃখজনক হলেও সত্য, এরপরেও এই আতঙ্ক থেকে খুব কম বাবা মা-ই রেহাই পান। তাদের আদরের সন্তানের জন্য ডায়পার ব্যবহার করেন অথচ বাচ্চার র‍্যাশ হয়নি এমন ঘটনা খুব কম ঘটে। আজকে আমরা বাবা মায়ের জন্য তাদের শিশুদের হওয়া এই ডায়পার র‍্যাশ নিয়ে বিস্তারিত জানবো। জানবো এটি কী, কেন হয় এবং এর প্রতিকার ও প্রতিরোধের উপায়।

যতটা সম্ভব আপনার শিশুকে ডায়পার ছাড়াই রাখতে চেষ্টা করুন!!







ডায়পার র‍্যাশ কী

ডায়পার র‍্যাশ/ফুসকুড়ি এক ধরনের ত্বকের প্রদাহ (dermatitis)। ডায়পার র‍্যাশের ফলে শিশুর নিতম্বে লাল লাল ছোপের সৃষ্টি হয়।

শিশুর পরিহিত ভেজা ডায়পার সময়মত পরিবর্তন না করলে, ডায়পারের ওপর প্লাস্টিকের প্যান্ট পরালে, শিশুকে প্রথমবারের মত শক্ত খাবার দেওয়া হলে, শিশুকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হলে বা ডায়রিয়ার কারণে ডায়পার র‍্যাশ হতে পারে। আবার যেসব মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ান তারা নির্দিষ্ট কিছু খাবার খেলে শিশুর ডায়পার র‍্যাশ হয়ে থাকে। তবে কিছু ঘরোয়া চিকিৎসার সাহায্যে খুব সহজে ডায়পার র‍্যাশের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

ডায়পার র‍্যাশ কেন হয়

বিভিন্ন কারণে শিশুর ডায়পার র‍্যাশ হতে পারে। নিম্নে শিশুর ডায়পার র‍্যাশ হওয়ার কারণগুলো আলোচনা করা হলোঃ

  • ভেজা অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ ডায়পার পরে থাকলে ডায়পার র‍্যাশ হয়ে থাকে। বিশেষ করে মলত্যাগের পর দীর্ঘসময় ধরে শিশুর ডায়পার পরিবর্তন করা না হলে শিশুর নরম ত্বকে র‍্যাশের সৃষ্টি হয়।
  • শিশুকে প্রথমবারের মত শক্ত খাবার দেওয়া হলে বা খাবারের তালিকায় কোনো পরিবর্তন হলে শিশুর মলেও পরিবর্তন আসে। একই সাথে শিশুর মলত্যাগের পরিমাণ বাড়তে পারে এবং এর ফলে ডায়পার র‍্যাশ হতে পারে। আবার যেসব মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ান তারা নির্দিষ্ট কিছু খাবার খেলে শিশুর ডায়পার র‍্যাশ হয়ে থাকে।
  • বেবি ওয়াইপস, নতুন ব্র্যান্ডের ডায়পার ও কাপড়ের তৈরি ডায়পার ধোয়ার জন্য বিভিন্ন পরিষ্কারক দ্রব্য যেমন ডিটারজেন্ট বা ব্লিচ ব্যবহারের ফলে শিশুর ডায়পার র‍্যাশ হতে পারে। এছাড়াও লোশন, পাউডার ও তেল ব্যবহারের জন্যও শিশুর ডায়পার র‍্যাশ হয়ে থাকে।
  • ব্যাকটেরিয়া বা ইস্ট ইনফেকশন ডায়পার র‍্যাশের আরেকটি কারণ। ত্বকের কোনো অংশে ইনফেকশন হলে তা ধীরে ধীরে ছড়াতে থাকে। শিশুর দেহের যেটুকু অংশ ডায়পার দ্বারা ঢাকা থাকে বিশেষ করে নিতম্ব, উরু ও যৌনাঙ্গে সহজে বাতাস চলাচল করতে পারে না। তাই এসব স্থানে খুব সহজে ইনফেকশন হয়ে থাকে এবং শিশুর ত্বকের ভাঁজে লাল লাল গুটির মত র‍্যাশ দেখা দেয়।
  • অ্যাকজিমা বা ত্বকে প্রদাহের সৃষ্টি হলে শিশুর ডায়পার র‍্যাশ হতে পারে। তবে এ্যাকজিমা বা ত্বকের প্রদাহ শরীরের অন্যান্য অংশগুলোকে বেশি আক্রান্ত করে থাকে।
  • শিশুকে আঁটসাঁটভাবে ডায়াপার পরালে র‍্যাশ হতে পারে।
  • অ্যান্টিবায়োটিক শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াসহ উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোও নষ্ট করে থাকে। অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার ফলে শিশুর দেহে ইস্ট ইনফেকশন প্রতিরোধকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো নষ্ট হয়ে যায় এবং র‍্যাশের সৃষ্টি হয়। আবার যেসব মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ান তাদের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলেও শিশুর ডায়পার র‍্যাশ হতে পারে।
  • ভেজা ডায়পার দীর্ঘসময় ধরে শিশুর ত্বকের সংস্পর্শে থাকলে ত্বকে লাল বর্ণের র‍্যাশের সৃষ্টি হয়।
  • বেবি ওয়াইপস, ডায়পার, ডিটারজেন্ট, সাবান, লোশন ও প্লাস্টিকের প্যান্টে ব্যবহৃত ইলাস্টিকের দ্বারা সৃষ্ট অ্যালার্জির জন্যও র‍্যাশ হতে পারে।
  • সেবোরিয়া হলো একপ্রকারের তৈলাক্ত ও হলুদ বর্ণের র‍্যাশ, যা সাধারণত মুখমণ্ডল, ঘাড় ও মাথায় হয়ে থাকে। এই র‍্যাশের কারণেও শিশুর ডায়পার র‍্যাশ হয়ে থাকে।

ডায়পার র‍্যাশের লক্ষণ

চিকিৎসকেরা এই রোগে আক্রান্তদের মধ্যে সাধারণত নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখতে পানঃ

  • ডায়পার র‍্যাশ (Diapper Rash)
  • ত্বকের ফুসকুড়ি (Skin rash)
  • ডায়রিয়া (Diarrhea)
  • জ্বর (Fever)
  • কাশি (Cough)
  • নাক বদ্ধ হয়ে যাওয়া
  • (Nasal congestion)
  • বমি (Vomiting)
  • মলের সাথে রক্ত যাওয়া (Blood in stool)
  • শিশুর খিটখিটে স্বভাব (Irritable Infant)
  • হাত দিয়ে কান টানার অভ্যাস (Pulling at ears)
  • কান লাল হয়ে যাওয়া (Redness in ears)

ডায়পার র‍্যাশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়সমূহ

যেসকল কারণে শিশুর ডায়পার র‍্যাশ হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় সেগুলো হলো:

  • শিশুকে অপরিষ্কার রাখা।
  • শিশুকে আঁটসাঁটভাবে ডায়পার পরানো।
  • সাবান বা অন্যান্য পরিষ্কারক দ্রব্য দ্বারা সৃষ্ট এ্যালার্জি।
  • বারবার মলত্যাগ।
  • মলে এসিডের উপস্থিতি (ডায়রিয়া আক্রান্ত হলে)।
  • অ্যামোনিয়া।

ডায়পার র‍্যাশ নিয়ে প্রশ্ন/সাধারণ জিজ্ঞাসা

  •  ডায়পার র‍্যাশ হলে কি শিশুকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে?

উত্তরঃ সাধারণত ঘরোয়া চিকিৎসার মাধ্যমেই ডায়পার র‍্যাশ সারিয়ে ফেলা সম্ভব। তাই এক্ষেত্রে চিকিৎসকের প্রয়োজন হয় না। তবে র‍্যাশের সাথে ফোড়া বা ফসকুড়ি, পুঁজসহ গুটি ও হলুদ ছোপ দেখা দিলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। এছাড়া র‍্যাশের সাথে জ্বর হলে এবং ঘরোয়া চিকিৎসার পরও র‍্যাশ ভালো না হলে শিশুকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে।

  • ডায়পার র‍্যাশ দেখতে কেমন হয়?

উত্তরঃ ডায়পার র‍্যাশ হলে শিশুর নিতম্ব লাল বর্ণ ধারণ করে। এ অংশটুকু হাত দিয়ে ধরলে ফোলা ও গরম অনুভূত হয়। আবার খোঁচা খোঁচা লাল দাগসহ শিশুর উরু ও পেটে গুটি দেখা দিলে সেটিও ডায়পার র‍্যাশ হতে পারে।

ডায়পার র‍্যাশের ঘরোয়া সমাধান

সবদিক থেকে সতর্ক থাকার পরেও যদি ডায়পার র‍্যাশ হয়েই যায় তাহলে রয়েছে কিছু ঘরোয়া সমাধান। ডায়পার র‍্যাশের ঠিকঠাক কেয়ার নিলে খুব অল্প সময়ের (দু একদিন) মধ্যেই ঠিক হয়ে যায়। তেমনিও কিছু উপায় এখানে থাকলোঃ

ডায়াপার র‍্যাশ ক্রিমঃ ডায়াপার র‍্যাশ সারিয়ে তোলার জন্য ঘরে বানানো যায় একদম অর্গ্যানিক ক্রিম। অলিভ অয়েল আর শিয়া বাটার নিন সমান পরিমাণে। সাথে এর চেয়ে একটু বেশি নারিকেল তেল। ভালভাবে মিশিয়ে ক্রিম বানিয়ে নিন। রেখে দিন ফ্রিজে। প্রত্যেকবার ডায়াপার পাল্টানোর সময় ফ্রিজ থেকে বের করে হালকা গরম করে শিশুর ত্বকে হাতে ঘষে আলতো করে মাসাজ করে দিন। ক্রিম দেয়ার পর ১৫ মিনিট মতন রেখে এরপরে ডায়পার পরান।

বুকের দুধঃ ডায়াপার র‍্যাশের চিকিৎসায় বুকের দুধ বেশ কার্যকরী। র‍্যাশের উপরে কয়েক ফোঁটা বুকের দুধ লাগিয়ে দিতে হবে। এরপরে যখন শুকিয়ে যাবে তখন নরম পরিষ্কার কোনো কাপর দিয়ে মুছে দিন।

দই ও বেকিং সোডাঃ আপনার রান্নাঘরে থাকা উপাদান দিয়েও ডায়পার র‍্যাশের প্রতিকার করা সম্ভব। যেটুকু জায়গায় র‍্যাশ আছে সেখানে ভালো করে পরিষ্কার করে তার উপর টকদই লাগিয়ে দিন। অপেক্ষা করুন। শুকিয়ে যাবার পর ধুয়ে ফেলুন।

এবার একই জায়গায় বেকিং সোডা দিন। এক ঘণ্টা মত অপেক্ষা করুন। এরপরে জায়গাটা পরিষ্কার করে মুছে অলিভ অয়েল লাগান।

গরম জলে স্নানঃ কুসুম গরম পানিতে গোসল ডায়পার র‍্যাশের জন্য অত্যন্ত উপকারী। শিশুকে কুসুম গরম পানিতে গোসল করান। এতে ও আরাম পাবে আবার র‍্যাশের জন্যেও কার্যকরী হবে।

আপনার শিশুর ডায়পার র‍্যাশ যদি এরপরেও না কমে তাহলে কী করবেন?
আর অপেক্ষা না করে দ্রুত একজন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। কোভিড-১৯/করোনার এই বৈশ্বিক মহামারীর এই সময়ে ঘরে বসেই অনলাইনে প্রসিদ্ধ শিশু বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করার জন্য চলে যান অনলাইন চিকিৎসার ওয়ানস্টপ সার্ভিস এনজাইম লিমিটেডে। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে আপনার শিশুর যেকোনো সমস্যার সমাধান নিন ঘরে বসেই আপনার মোবাইল বা ল্যাপটপের মাধ্যমে।

ডায়পার র‍্যাশ প্রতিরোধের টিপস্‌

শিশুকে নিয়মিত ডায়পার পরানো হলে ঐ স্থানটি অবশ্যই পরিষ্কার ও শুষ্ক রাখার মাধ্যমে ডায়পার র‍্যাশ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে যতটা সম্ভব আপনার শিশুকে ডায়পার ছাড়াই রাখতে চেষ্টা করুন। শিশুকে যতবেশি ডায়পার ছাড়া রাখা যায় ততই ভালো। এছাড়া নিম্নলিখিত নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করুন:

  • সময়মত শিশুর ডায়পার পরিবর্তন করতে হবে, বিশেষ করে ডায়পার ভেজা থাকলে।
  • ডায়পার পরিবর্তনের পর ঐ স্থানটি নরম কাপড় বা তুলা ও পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে।
  • ডায়পার ঢিলাঢালাভাবে পরাতে হবে। খুব বেশি আঁটসাঁট করে পরালে বাতাস চলাচলে অসুবিধা হয় এবং শিশুর কোমর ও উরুতে চুলকানি দেখা দিতে পারে।
  • যেসব ডায়পারের শোষনক্ষমতা বেশি সেগুলো ব্যবহার করা উচিত। এতে ত্বক শুষ্ক থাকে ও ইনফেকশন কম হয়।
  • শিশুর ডায়পার পরিবর্তনের আগে ও পরে হাত ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।
  • ডায়পার র‍্যাশ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্রিম, মলম বা পাউডার ব্যবহার করতে হবে।
  • অ্যালকোহল বা সুগন্ধিযুক্ত বেবি ওয়াইপস বা রুমাল ব্যবহার করা উচিৎ নয়, এতে ত্বকে বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে।
  • ট্যালকম পাউডার ব্যবহার করা উচিত নয় কারন এটি শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সাথে শিশুর ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে।
  • ডায়পারের উপরে প্লাস্টিকের প্যান্ট ব্যবহার করা উচিত নয়, এতে বাতাস চলাচলে অসুবিধা হয়।
  • কাপড়ের ডায়পার ব্যবহার করা হলে তা ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে, বিশেষ করে যদি শিশুর ডায়পার র‍্যাশ থাকে।

আমাদের অন্যান্য ব্লগগুলো পড়তে চলে যান আমাদের ব্লগের হোমপেইজে