এমনিতেই জীবনে সমস্যার শেষ নেই নির্ঝরের। তার উপর নিজের ত্বকের তৈলাক্ততা যদি প্রতিদিন নিত্যনতুন সমস্যা সৃষ্টি করে তখন মেজাজ ঠিক রাখা কষ্টকর হয়ে যায়। শীতের দিনে মোটামোটি ভালোই থাকে অবস্থা, কিন্তু যেই গরম পরা শুরু করে ওমনি মুখ যেন রাস্তার পাশের হোটেলে ভাজা তেলতেলে পরটার মতন হয়ে যায় তার। 

এই সমস্যা যে নতুন ভাবে শুরু হয়েছে তা নয়, আজীবনই এই তেল চিটচিটে চেহারা নিয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছে নির্ঝর। কিন্তু লেখাপড়ার গণ্ডি পেড়িয়ে এখন ছোটখাটো একটা চাকরিতে ঢুকেছে সে। এখন এই তেল চিটচিটে চেহারা নিয়ে মিটিং করতে গেলে বা কোন কলিগের সাথে কথা বলতে গেলে কেমন যেন একটু অস্বস্তি ভাব হয় তার। 

নাহ, এভাবে আর পারা যাচ্ছে না, ত্বকের তৈলাক্ততা বিষয়টা নিয়ে একটু ভালো ভাবে জেনে এর থেকে কোন পরিত্রানের উপায় বের করা যায় কি না দেখতে হবে। ছুটির দিনের সকালে নিজের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে এই কথা ভাবছিলো নির্ঝর। ফোন বেজে ওঠায় ভাবনায় ছেদ পরলো তার। কাকতালীয় ব্যাপার হচ্ছে ফোন করেছে তার এক কাছের বন্ধু সেজান। যে কিনা আবার ডাক্তার। 

কি রে খবর কি তোর? ফোনের ওপাশ থেকে জিজ্ঞাস করলো সেজান। 

আর বলিস না, জীবন তেলতেলে হয়ে গেলো একেবারে। উত্তর দিলো নির্ঝর। 

সে আবার কেমন কথা ! জীবন তেলতেলে হয় কিভাবে ! , কিছুটা বিভ্রান্ত শোনালো সেজানের কণ্ঠস্বর। 

জবাবে নিজের বর্তমান অবস্থা বিষয়ে অল্পকথায় জানালো নির্ঝর। 

ওহ আচ্ছা এই ব্যাপার, ঠিক আছে। তোর তেলতেলে জীবন কে ওয়েল-লেস করার জন্যে একটু চেষ্টা করা যাবে। বিকেলে ফ্রি থাকলে চল বসি কোথাও। প্রস্তাব সেজানের। 

বিকেলে আলোচনা করার জন্যে সময় নির্ধারণ করে তখনকার মত ফোন রাখলো নির্ঝর। 

সেজানের সাথে আলোচনায় বসার আগে ইন্টারনেটে একটু খোঁজ খবর করে যাবার কথা মাথায় এলো তার। ল্যাপটপ চালু করে গুগল থেকে সার্চ দিয়ে ত্বকের তৈলাক্ততা নিয়ে পড়তে আরম্ভ করলো সে। 

ত্বকের তৈলাক্ততা কী? 

ত্বকের তৈলাক্ততা কী?

ত্বকের তৈলাক্ততা

মানুষের ত্বকে থাকা সেবাশিয়াস (sebaceous) নামের এক ধরনের গ্রন্থির ক্রিয়াশীলতা অতিরিক্ত মাত্রায় বেড়ে গেলে সেখান থেকে প্রয়োজনের তুলনায় অধিক পরিমাণ তৈলাক্ত পদার্থ উৎপন্ন হয়, এর ফলেই দেখা দেয় ত্বকের তৈলাক্ত।

তৈলাক্ত ত্বক সাধারণত উজ্জ্বল, পুরু এবং কিছুটা ফ্যাকাশে ধরনের হয়ে থাকে। এই  ধরনের ত্বকে ব্রণ ও ব্ল্যাকহেডস (blackheads) সহ নানান ধরনের ত্বকীয় সমস্যা হবার সম্ভবনা বেশি থাকে।   

মূল বিষয়টা কিছুটা বোঝাগেলেও ওয়েলি স্কিনের উপদ্রব থেকে বাঁচার জন্যে আরো কিছু বিষয় জানার তাগিদ অনুভব করলো নির্ঝর। অনেকে আবার বলে গরমের দিনের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন না করলে ত্বকের তৈলাক্ততা বাড়ে। কিন্তু এ বিষয়ে সে নিশ্চিত না। ইন্টারনেটে এ পেজ ও পেজ ঘুরতে যেয়ে এনজাইম নামের বাংলাদেশী একটা ওয়েবসাইটে যেয়ে থামলো এবার সে। এখানে বেশ গোছানো ভাবে ত্বকের তৈলাক্ততার ব্যপারে লেখা আছে। প্রথমে এই তৈলাক্ত ত্বকের কারণগুলো দ্রুত পড়ে নিলো নির্ঝর। 

ত্বকের তৈলাক্ততার কারণসমূহঃ

  • জেনেটিকাল সমস্যা। 
  • স্কিন-কেয়ারের প্রসাধনী অতিমাত্রায় ব্যবহার।
  • মৌসুমগত পরিবর্তন।
  • ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
  • হরমোনগত পরিবর্তন।
  • শারীরিক ও মানসিক চাপ।

ঋতু পরিবর্তনের কারণে নির্ঝরের বেশি সমস্যা হয়, এটা সে নিজের ত্বকের তৈলাক্ততার সাথে মিলাতে পারছে। শারীরিক আর মানসিক চাপের বিষয়টাতো থাকছেই। বাকি কোনটা সে মিলাতে পারছে না।  

একই পেজে ত্বকের তৈলাক্ততার সাথে অন্য যে লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে পড়ে নিলো নির্ঝর। 

তৈলাক্ত ত্বকের কারণে অন্যান্য যে সকল লক্ষণ দেখা দিতে পারে: 

  • জন্ডিস (Jaundice)           
  • ব্রণ/পিমপল (Acne or pimples)
  • ত্বক লাল হয়ে যাওয়া (Flushing) 
  • শুষ্ক খসখসে ত্বক (Skin dryness, peeling, scaliness, or roughness)
  • অস্বাভাবিক ত্বক (Abnormal appearing skin)         
  • যোনিদ্বারে ক্ষত (Vulvar sore)
  • পিঠের মাংসপেশী শক্ত হয়ে যাওয়া (Back stiffness or tightness)   
  • হাঁটুতে শক্ত পিণ্ড দেখা দেওয়া (Knee lump or mass)
  • চোখের পাতায় চুলকানি (Itchy eyelid)     
  • কব্জিতে দুর্বল অনুভব করা (Wrist weakness)
  • মাত্রাতিরিক্ত শারীরিক বৃদ্ধি (Excessive growth)

কিছু কিছু লক্ষণ নিজের সমস্যার সাথে মিলাতে পারলো নির্ঝর। এটুকু পড়ে তখনের জন্যে উঠে গেলো সে। বিকেলে সেজানের সাথে দেখা করার পর কিছুক্ষণ সাধারণ আলোচনার পর ত্বকের  তৈলাক্ততার বিষয়টা উঠলো। সেজান জানালো তার এ ব্যাপারে কিছু লেখাপড়া আর অভিজ্ঞতা আছে, সে নিজের জ্ঞান থেকে প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করে দেখতে পারে। 

নির্ঝর প্রথম প্রশ্ন করলো, লিঙ্গ ভেদে এই রোগ দেখা দেবার সম্ভবনা কম বেশি হতে পারে কিনা।

এর উত্তরে ডাঃ সেজান জানালো, মেয়েদের ত্বকের  তৈলাক্ততা থাকার সম্ভবনা ছেলেদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ থাকে। 

পরের প্রশ্নটা করতে একটু অস্বস্তি বোধ করছিলো নির্ঝর। তারপরও করলো। আচ্ছা, তৈলাক্ত ত্বক ব্যাপারটা কি অস্বাস্থ্যকর কিছু? 

নির্ঝরের এই প্রশ্নের জবাবে সেজান জানালো, 

না, স্বাভাবিক তৈলাক্ত ত্বক অস্বাস্থ্যকর কিছু না। আমাদের শরীরের সুরক্ষা প্রদান করাই ত্বকের প্রধান কাজ। ত্বক শরীরের আর্দ্রতা ভারসাম্য রক্ষা করতে সেই সাথে ক্ষতিকর যে কোন পদার্থের শরীরে প্রবেশ  রোধ করতে তৈলাক্ত পদার্থ উৎপন্ন করে। 

সাবান, শ্যাম্পু এই ধরনের প্রসাধনী ব্যবহার করলে ত্বকের তৈলাক্ত পদার্থ কমে যায়। যার ফলে ত্বকের শুষ্কতা এবং অস্বস্তিভাব সৃষ্টি হতে পারে। তবে ত্বক যদি স্বাভাবিকের তুলনায় অধিক পরিমাণে তৈলাক্ত পদার্থ উৎপন্ন করতে থাকে, সে ক্ষেত্রে ত্বকে ব্রণ, ব্ল্যাকহেডস সহ বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে, যেগুলোকে আর স্বাস্থ্যকর অবস্থা বলা যায় না।

প্রশ্নের উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে সায় জানানোর ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল নির্ঝর। এবারে সে জানতে চাইলো, এই তৈলাক্ত ত্বকের সাধারণ কোন সুবিধা অসুবিধা কি মোটা দাগে বলা যায় কি না।

সেজান এই প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগে কিচ্ছুক্ষণ সময় নিলো। তারপর গুছিয়ে উত্তরে জানলোঃ 

তৈলাক্ত ত্বকের সাধারণ সুবিধা এবং অসুবিধাসমূহঃ 

তৈলাক্ত ত্বকের সাধারণ সুবিধাগুলোর মাঝে রয়েছে, ত্বকের তৈলাক্ততার কারণে চামড়ায় বলিরেখা পরা অথবা মুখের ত্বকীয় রঙের পরিবর্তন হবার সম্ভবনা কম থাকে। 

অসুবিধার মাঝে রয়েছে, তৈলাক্ত ত্বকে ধূলোবালি খুব সহজে আটকে যায় এবং অতিরিক্ত তেল মুখের রোমকূপ বা পোরগুলোকে বন্ধ করে দেয়। যার ফলে ত্বকে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হয়ে ব্রণ হবার সম্ভবনা বেড়ে যায়। তবে ত্বকে ব্রণ হবার জন্যে শুধুমাত্র জন্মগত ভাবে তৈলাক্তত্বতা দায়ী নয়, কিছু ক্ষেত্রে ত্বক ভালোভাবে পরিষ্কার না করার কারনেও ব্রণ হবার সম্ভবনা থাকে। 

বাহ, বেশ ভালো ডাক্তার হয়ে গেছিস দেখা যায়, হাসি মুখে বললো নির্ঝর। জবাবে হেসে মাথা ঝাকালো সেজান। আচ্ছা শেষ একটা প্রশ্ন করি। বলে নির্ঝর জানতে চাইলো, এই তৈলাক্ত ত্বকের সমস্যা থেকে নিজেকে রক্ষার জন্যে কোন বিশেষ হেলথ টিপস সেজান বলতে পারবে কি না। 

সেজান বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এই ব্যাপারে ধাপে ধাপে বলে গেলো, 

হেলথ টিপসঃ 

  • সকালে ও রাতে মুখমন্ডল স্কিন ক্লিনজার (তৈলাক্ত ভাব/ ব্রনরোধী) দিয়ে ধোয়ার অভ্যাস করা।
  • তেলমুক্ত (Oil free) ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা। 
  • ত্বকের উপরিভাগে জমে থাকা ডেডসেল বা মৃতকোষ পরিষ্কার করতে সপ্তাহে অন্তত দুই বার ফেসিয়াল স্ক্রাব (facial scrub) ব্যবহার করা। এই ধরনের স্ক্রাব ব্যবহার করলে ত্বকের অভ্যন্তরীণ উজ্জ্বলতা বের হয়ে আসার সম্ভবনাও থাকে।
  • পানিশূন্যতায় ত্বকের উপর যাতে কোন ধরনের প্রভাব না পরে, সে জন্য প্রতিদিন অন্তত ২ লিটার পানি পান করার অভ্যাস করা।
  • বেশি পরিমাণে ফল ও শাকসবজি খাওয়া। কারণ, মাছের তেল এবং মাছে বিদ্যমান ভিটামিন এ ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। 
  • তৈলাক্ত ত্বকের ব্যাপারে কোনো ঔষধ গ্রহণের আগে অবশ্যই অভিজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে নেয়া উচিৎ এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়ে জেনে নেয়া প্রয়োজন।

 নির্ঝরের জিজ্ঞাসা পর্ব শেষ হওয়ায় তারা অন্য আলোচনায় চলে গেল। কোন কোন বিষয়ে খেয়াল রাখলে তৈলাক্ত ত্বকের ব্যাপারে সমস্যায় পরতে হবে না সে বিষয়ে ধারনা হয়ে যাওয়ায় নির্ঝরের চিন্তাও অনেকটাই দূর হয়ে গেল। 

এ ধরনের আরো তথ্য এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্যের জন্যে এনজাইম ব্লগের হোমপেজটি দেখুন।

ত্বকের তৈলাক্ততা বিষয়ক ভিডিওঃ

ত্বকের তৈলাক্ততা (Skin oiliness)