নিজের গোল মুখ নিয়ে এমনি একটা হালকা দুঃখ ভাব সব সময় কাজ করে রোহানের। সে কারনেই বিরাট আকারের চশমা আর উল্টো পিরামিডের মতন এক গোছা দাড়ি দিয়ে গোল মুখটায় একটু কোন বের করা চেষ্টা করে সে। কিন্তু আজ তিনদিন হলো দাঁতের ক্ষয় রোগ হয়ে ব্যাথার কারণে তার গোল মুখটা একেবারে খানদানী ঢাকাই হোটেলের তুন্দুর রুটির মতন গোল আর ফুলানো হয়ে আছে। একেবারে যে বিনা কারণে এই দাঁত ব্যাথা তার কপালে এসে জুটেছে সেটাও না। অনেক অনিয়ম অত্যাচার যে তার দাঁতের উপর দিয়ে যায় সেটা রোহান জানে। কিন্তু তাই বলে নিজের আপন দাঁত এমন প্রতিশোধ নিবে?

তিন দিনেও দাঁত ব্যাথাটা ঠিক “মান্যেজ” করতে না পেরে নিতান্ত বাধ্য হয়েই ডেন্টিস্টের কাছে পরামর্শ করতে এসেছে সে। তার মতন বেশিরভাগ নতুন চাকরিজীবী মানুষেরা বাসা আর অফিস, পারলে মাঝে সাঝের আড্ডা বাদে অন্য কোন কাজ করার আগ্রহ দেখায় না। গত তিনটা দিন ধরে বাম পাশের মাড়ির দাঁত যেন  শব্দহীন অ্যালার্ম ঘড়ির মতন বেজেই চলেছে। কি এমন হতে পারে দাঁতে সেটা জানার আগ্রহ থেকে রোহান ইন্টরনেটে একটু ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করে। 

খুঁজতে খুঁজতে এনজাইম নামের বাংলাদেশী একটা হেলথকেয়ার ওয়েব সাইটে ঢুকে এই ব্যাপারে বেশ কিছু তথ্য পায় সে।  দাঁতের সমস্যাগুলোর মধ্যে দাঁতের ক্ষয় রোগ বা (Dental caries) যে অন্যতম একটা রোগ সেটা এনজাইমের রোগ ডাইরেক্টরি থেকেই জানতে পারে সে। সেখানে আরো লেখা দেখে, 

যে কোন বয়সেই এই দাঁতের ক্ষয় রোগ হতে পারে, অনেকের যে ধারনা থাকে দাঁত হয় বাচ্চাদের অথবা বুড়ো মানুষের শুধু হয়, আসলে তেমনটা না। তবে শিল্পোন্নত দেশগুলোতে প্রায় ৬০ থেকে ৯০ ভাগ শিশুদের নাকি দাঁতের ক্ষয় রোগ সহ নানান রকমের সমস্যা দেখা যায়।

রোহানের চিন্তা ছুটে গেলো ডাক্তারের রুম থেকে একজন রোগী বের হয়ে আসতে দেখে। বেশ খোশ মেজাজেই তো আছে দেখা যায় রোগী ! সে তো ভাবতো ডেন্টিস্টের কাছে সবাই তার মতন মুখ ভারি করেই শুধু আসে। পরবর্তী রোগী ডাক্তারের রুমের ভেতরে চলে গেল।

রোহানের এই ডাক্তারের কাছে আসার পেছনেও এনজাইমের একটা অবদান আছে। ওয়েবসাটটাতে গোছানো তথ্যগুলো পরে আর কি আছে সেখানে দেখতে একটু ঘোরাঘুরি করছিলো সে। তখন দেখতে পেলো অনলাইনেই ডেন্টিস্টের অ্যাপয়েন্টমেন্টও নেয়া যাবে এনজাইম পেশেন্ট কেয়ার থেকে। আর সেখান থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েই আসলে রোহানের আজ ডাক্তারের কাছে আসা।  

রোহান উঠে ওয়েটিং রুমটাতে চক্কর দিতে শুরু করলো। রিসেপশন টেবিলের উপর একটা দাঁতের ক্ষয় রোগ বিষয়ক একটা লিফলেট পরে থাকতে দেখে সেটা তুলে নিয়ে পড়তে শুরু করলো সে। এমনিও অন্য কোন কাজ নেই যেহেতু দাঁত নিয়ে আরো একটু জানা যাক।

তারপর একটা টুথ পেস্ট কোম্পানির বিজ্ঞাপনের কথা বলা আছে সেখানে। দাঁতের ক্ষয় হবার মূল বিষয়টায় একটু আভাস এখানে পাওয়া গেছে বটে, কিন্তু এই আপদ যে ঠিক কি কারণে শুরু হয়, সে ব্যাপারটা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট না রোহানের কাছে। ডেন্টিস্টের চেম্বারে যেহেতু, কোন না কোন পোস্টার বা বোর্ডে দাঁতের ক্ষয় হওয়া রোগের কারণ নিশ্চই লেখা আছে ভেবে এগুতে শুরু করলো সে । ডাক্তারের রুমে প্রবেশের দরজার পাশেই কাঙ্খিত বোর্ডটা খুঁজে পাওয়া গেল। রোহান সেই বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে পড়তে শুরু করলো কি লেখা আছে তাতে।

যে সকল কারণে দাঁতের ক্ষয় রোগ দেখা দেয়ঃ

দাঁতের ক্ষয় , রোগ

মিষ্টি খাবার রোহানের শুধু পছন্দ না বলা চলে একেবারে প্রধান দুর্বলতা। সেই প্রিয় মিষ্টি খাবার কিনা শেষ পর্যন্ত তাকে দাঁতের ডাক্তারের কাছে নিয়ে এলো ! হায়, এই তার কপাল।  তাছাড়া দাঁত ব্রাশ করা বলতে সকাল আর রাতে দুইবেলা টুথ ব্রাশে লাল নীল পেস্ট নিয়ে দাঁতে ছোঁয়ানোর নিয়ম মেনে চলে সে। কিন্তু তাতে যে খুব একটা কাজ হয় না, সেটা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে রোহান। দাঁত ভালো থাকতে সে দাঁতের মর্যাদা না দেওয়ায়, দাঁত এখন তাকে কোন মর্যাদা দিচ্ছে না।

এবারে ডাক্তারের রুমের ভেতরে ডাক পড়লো রোহানের। কিছুটা ভয় নিয়ে ডেন্টিস্টসের রুমে প্রবেশ করলো সে। তাকে বসতে বলে ডাক্তার জিজ্ঞাস করলেন “তাহলে রোহান সাহেব, বলেন কি করতে পারি আপনার জন্য?” 

রোহান তখন দাঁতের ক্ষয় রোগের যে লক্ষনগুলো নিজের মাঝে খুঁজে পেয়েছে সে ব্যাপারে ডাক্তারকে বিস্তারিরত জানালো, 

দাঁতের ক্ষয় রোগে এর লক্ষণসমূহঃ

  • দাঁতের ব্যথা (Toothache)
  • মাড়িতে ব্যথা (Gum pain)
  • মুখে ব্যথা (Mouth pain)
  • চোখে ব্যথা হওয়া (Pain in eye)

এই সমস্যাগুলো তার হচ্ছে গত তিনদিন থেকে।

শুনে ডাক্তার জিজ্ঞাস করলেন, বিগত কিছু দিনের মধ্যে রোহান নিজের মধ্যে এই লক্ষনগুলোর কোনটা অনুভব করেছে কিনা –

  • মুখমণ্ডলে ব্যথা (Facial pain)
  • কানের ব্যথা (Ear pain)
  • ত্বকের জ্বালাপোড়া (Skin irritation)
  • চোয়াল ফুলে যাওয়া (Jaw swelling)
  • পায়ে পানি আসা (Peripheral edema)

কিন্তু এর কোনটি রোহানের আগে না হওয়ায় সে না সূচক জবাব দিলো। এবার রোহানের দাঁত পরীক্ষা করলেন ডাক্তার। এরপর আরো কিছু প্রশ্ন করে দাঁতের একটা পরীক্ষা করাতে বললেন তাকে।

রোহানের মনে বেশ কিছু প্রশ্ন জমা হয়ে ছিলো সেগুলোর উত্তর জেনে নেয়ার জন্যে সে ডাক্তারকে জিজ্ঞাস করলো, “স্যার, আমার আসলে ডেন্টাল চেক-আপ আর ট্রিটমেন্টের বিষয়ে একটা ভিতি কাজ করে, তাই চাচ্ছিলাম আপনার কাছ থেকে কিছু বিষয়ে একটু বিস্তারিত জেনে নিতে।”

ডাক্তার হেসে জানালেন, “এই ভীতি অনেকেরই কাজ করে, আর সেটা থেকেই চেক-আপ না করানোর অনীহা জন্ম নেয়। ফলাফলে দাঁতের সমস্যা দেখা দেয়। আপনার যা কিছু জানতে চাওয়ার আছে নির্দ্বিধায় জিজ্ঞাস করুণ।“

আগে থেকে গুছিয়ে রাখা প্রথম প্রশ্নটা এবার করলো রোহান।

স্যার, দাঁতক্ষয় বিষয়টা  আসলে কিভাবে শুরু হয় সেটা জানতে চাচ্ছিলাম। 

ডাক্তার প্রশ্নের উত্তরে জানালেন,

আমাদের দাঁত আর মাড়িতে এক ধরনের স্বচ্ছ ও আঠালো পদার্থ জমতে দেখা যায়, একে আমরা প্লাক (Plaque) বলি। এই প্লাকে অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা আমদের গ্রহণ করা খাদ্যবস্তুতে উপস্থিত সুগার বা চিনির উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। এই প্লাক জমে দাঁতের ক্ষয় শুরু হতে পারে। আবার, আমাদের মুখে থাকা ব্যাকটেরিয়া থেকে একধরনের এসিড তৈরী হয় যা আমারা খাবার খাওয়ার ২০ মিনিট বা এর বেশি সময় পর্যন্ত দাঁতের ক্ষতি করতে থাকে। এই এসিডের প্রভাবে দাঁতের এনামেলের আবরণ নষ্ট হয় সেই সাথে দাঁত ক্ষয়ে যায়।

রোহানের পরের প্রশ্নটা প্রথম প্রশ্নের সাথে মিলিয়েই করা।

অনেক রোগ তো বংশগত কারণে হয়ে থাকে, দাঁত ক্ষয়ের সমস্যা কি বংশগত কারণে হতে পারে?

ডাক্তার নিজের টেবিলের উপড়ে থাকা ফাইল থেকে একটা রঙ্গিন কাগজ বের করে রোহানের প্রেসক্রিপশনের সাথে স্টেপল করতে করতে জবাব দিলেন,

সাধারণত দেখা যায়, পরিবারের কারো যদি এই সমস্যা থাকে, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে কোন একজনের দাঁতের সমস্যা দেখা দিলে একই পরিবারে থাকা অন্য শিশুদেরও এই রোগ দেখা দেয়ার সম্ভবনা থাকে।

এবার কিছুক্ষন আগে চেম্বারের ওয়েটিং রুমে থাকা বোর্ড থেকে পাওয়া একটা পয়েন্টের উপর ভিত্তি করে প্রশ্ন করলো রোহান।

নিয়মিত ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়া আসলেই কতটা জরুরী বলে আপনি মনে করেন স্যার?  

এই প্রশ্নের উত্তরতা মনে মনে সাজিয়ে একটু সময় নিয়ে দিলেন ডাক্তার। সেই সাথে রোহানের জন্যে লেখা প্রেসক্রিপশনটা তার দিকে এগিয়ে দিলেন।

তিনি বললেন,

অধিকাংশ মানুষ শুধুমাত্র দাঁতের কোন সমস্যা হলেই ডেন্টিস্টের কাছে যায়। এই ধরনের চিকিৎসাকে বলা হয় ‘ক্রাইসিস ট্রিটমেন্ট’ (Crisis treatment)। যেহেতু দাঁতের বেশিরভাগ সমস্যা কোনো লক্ষণ ছাড়াই দেখা দেয় এবং গুরুতর পর্যায়ে গিয়ে এর লক্ষণ প্রকাশ করে। ততদিনে দেখা যায় দাঁত ক্ষয় হয়ে যায়। এমন কিছু হলে কোনো ব্যথা অনুভূত হয় না, তবে নার্ভের ক্ষতি হয়। তখন রোগীকে রুট ক্যানালের সাহায্যে চিকিৎসা করার প্রয়োজন হতে পারে, যা আসলে একটি জটিল প্রক্রিয়া। এতো কিছুর মধ্যে দিয়ে না যেয়ে নিয়মিত ডেন্টিস্টের কাছে গেলে, দাঁতের যেকোনো সমস্যা প্রাথমিক পর্যায়েই বোঝা যায় ও যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। এটাকেই বলা হয়  ‘প্রিভেন্টিভ ট্রিটমেন্ট’(preventive treatment)।

উত্তরের শেষে তিনি আরো বলে দিলেন,  প্রেসক্রিপশনের সাথে কিছু ডেন্টাল হেলথ টিপস লেখা একটা কাগজ দিয়ে দিয়েছি। আশা করি ভবিষ্যতে আপনার কাজে আসবে। আর বাকি যে বিষয়গুলো লেখা আছে প্রেসক্রিপশনে ফলো করা শুরু করুন।

এতক্ষণের আলোচনায় দাঁত ক্ষয় রোগের ব্যাপারে বেশ অনেকটাই জানা হয়ে গেছে রোহানের। হেলথ টিপসগূলো সে এক নজরে দেখে নিলো এবার।

দাঁতের ক্ষয় রোগ জনিত হেলথ টিপসঃ

  • দাঁতের ক্ষয় রোগ প্রতিরোধে চিনি ও মিষ্টি জাতীয় খাবার সীমিত পরিমাণে খেতে হবে।
  • মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়ার পর মুখের ভেতরের অংশ ভালোভাবে পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়ার পর পনির খেলে তা ওরাল ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধে সাহায্য করে।
  • ক্যাফেইন ও ধূমপানের কারণে মুখের লালা শুকিয়ে যায় যার কারণে দাঁতের সমস্যা দেখা দিতে পারে। চিনিবিহীন চুয়িংগাম মুখের লালার পরিমাণ ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
  • শিশুদের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, শিশুর খাবারে আলাদা ভাবে চিনি বা মিষ্টি বাড়ানোর জন্য কোনো উপাদান ব্যবহার করা যাবে না।

ডাক্তারকে ধন্যবাদ জানিয়ে সেদিনের মত চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলো রোহান। এখনো দাঁতে ব্যাথা করছে ঠিকই, কিন্তু দাঁতের পরীক্ষা করিয়ে যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারের চেম্বারে আসবে সে।  ডাক্তারের দেয়া যুক্তিগুলো সঠিক বলে মনে হয়েছে তার কাছে। দাঁতের ক্ষয় হবার পর ডেন্টিস্টের কাছে আসার চাইতে দাঁত সুস্থ রাখতে নিয়মিত চেকা-আপ করানোর বিষয়টা আগামীতে মনে রাখবে রোহান।  

স্বাস্থ্য বিষয়ে আমাদের অন্যান্য ব্লগগুলো পড়তে ঘুরে আসুন আমাদের ব্লগসাইটের হোমপেজ থেকে।

দাঁতের ক্ষয় রোগ সম্পর্কে আপনার কোনো জিজ্ঞাসা বা পরামর্শ থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুণ ইমেইল, ফেসবুক অথবা ফোন করুণ +০৯৬৩৯০০৬৬২২ নম্বরে।