দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ (Anxiety) থেকে কারো মানসিক অবস্থা কতটা খারাপ হয়ে যেতে পারে সে ব্যাপারটা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করত না নিটোল। অফিসে তার পাশের ডেস্কে বসে কাজ করা গম্ভীর চেহারার কাজ পাগল মেয়েটা এখন নাকি হাসপাতালে ভর্তি আছে এই রোগের কারণে !

আজ অফিসে এসে এই ঘটনা শোনার পর থেকে নিজের ভেতরের খারাপ লাগাটা কমাতে পারছিলো না নিটোল। আবার এটাও ভাবছিলো নিজের ভেতরেও দুশ্চিন্তার লক্ষন তৈরি হতে শুরু করলে সেটা খুব ভালো কিছু হবে না।

অফিসের কাজের ফাঁকে বারবার পাশের ফাঁকা ডেস্কটার দিকে চোখ যাচ্ছিলো নিটোলের। শূন্য পরে থাকা টেবিলটা দেখে সেখানে বসে কাজ করা তানিয়ার কথা বারবার মনে পরে যাচ্ছিলো তার। লাঞ্চের ব্রেকে যাবার একটু আগে হিউম্যান রিসোর্সের এক ভাইয়াকে তানিয়ার কোন খোঁজ জানে কি না জিজ্ঞাস করলো সে।

এইচ.আর এর সেই ভাইয়া জানালো তানিয়ার বাবা ফোন করে জানিয়েছে তার মেয়ের শরীরের অবস্থার কথা। মানসিক এই সমস্যায় তানিয়া বেশ কিছুদিন ধরেই নাকি ভুগছিলো। কিন্তু কারো সাথে এ ব্যাপারে কিছু শেয়ার করতো না তানিয়া কখনই।

নিটোল মনে মনে ভাবলো, প্রায় সমবয়সী মেয়ে হিসেবে পাশের ডেস্কে বসা নিজেই যেহেতু কিছু জানতে পারেনি সে,  বাকিরা আর কিভাবে জানবে। 

লাঞ্চের ব্রেকে খাবার পরেও কিছুটা সময় ছিলো নিটোলের হাতে। দুশ্চিন্তা রোগটার ব্যাপারটা নিয়ে খুব বেশি আসলে জানা নেই তার। এই বাড়তি সময়টায় এ বিষয়ে একটু জানার চেষ্টা করবে বলে ল্যাপটপের সামনে বসলো সে। কি এই রোগ দেখা দেয় এটাই আগে খুঁজে বের করলো ইন্টারনেট থেকে,

দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ (Anxiety) কী?

দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ (Anxiety)

দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ এমন এক ধরনের মানসিক ব্যাধি, যার ফলে দৈনিক স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড সঠিকভাবে করতে মানুষের বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়। এটি এক ধরনের ভয় বা আশঙ্কার অনুভুতি। কোন কাল্পনিক বা সত্যি ঘটনা, ভয় বা চিন্তা থেকে এ সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। তবে অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন কারণ ছাড়াও এই রোগ হতে পারে।

এ রোগের সাধারণ লক্ষনের মধ্যে রয়েছে, মাংসপেশীতে টান, অস্থিরতা, বুক ধড়ফড় করা, শ্বাস-প্রশ্বাস খুব দ্রুত হওয়া, স্নায়বিক দুর্বলতা, ভয় পাওয়া, সন্দেহ করা, সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা, কোনো কিছুর প্রতি একাগ্রতা না থাকা, নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারা প্রভৃতি।

এটুকু পড়ার পর নিটোলের মনে হলো সাধারণ ব্যাখ্যার অংশটা সে বুঝতে পেরেছে ভালোভাবেই, কিন্তু লক্ষনের অংশটা ঠিক পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে না। অন্য কোন ওয়েবসাইটে এই ব্যাপারে কিছু লেখা আছে কিনা খুঁজতেই এনজাইম নামের একটা বাংলা হেলথ কেয়ার সাইটে চার্ট আকারে এই রোগের লক্ষন খুঁজে পেলো সে।

দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ (Anxiety) এর লক্ষনসমূহঃ

  • বিষণ্ণতা (Depression)
  • বুকের তীক্ষ্ণ ব্যথা (Sharp chest pain)        
  • শ্বাসকষ্ট (Shortness of breath)   
  • মাথা ব্যথা(Headache)
  • অনিদ্রা (Insomnia)          
  • বুক ধড়ফড় করা (Palpitations)
  • অস্বাভাবিক অনৈচ্ছিক নড়াচড়া (Abnormal involuntary movements)       
  • অনিয়মিত হৃদস্পন্দন (Irregular heart beat)
  • ভয় এবং আতংক (Fears and phobias)    
  • হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া (Increased heart rate)

এখন নিটোলের মনে পড়লো তানিয়াকে প্রায়ই বিষণ্ণ হয়ে বসে থাকতে দেখতো সে। কোন কাজের জন্যে নাম ধরে ডাকলে অনেক সময় ভয়ও পেয়ে যেত।

এনজাইমের এই ওয়েব সাইটে লক্ষনের সাথে এ রোগের কারণ লেখা একটা অংশ দেয়া আছে। সেটাও একবার পড়ে নিলো নিটোল। প্রথমে একটু ব্যাখ্যা লেখা আছে সেখানে।

দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগের সাথে অন্যান্য মানসিক সমস্যার সম্পর্ক এখনও সঠিকভাবে জানা সম্ভব হয় নি। যে সব ব্যক্তির আগে থেকেই এ সমস্যা রয়েছে তাদের জীবনে নতুন কোনো আশঙ্কাজনক ঘটনা ঘটলে এই সমস্যা আরও বেড়ে যাবার সম্ভবনা থাকে। বংশগত এবং জীনগত কারণেও এই রোগ হতে পারে।

তারপর পয়েন্ট আকারে কিছু কারণ উল্লেখ করা,

দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ এর কারণে অন্য যে রোগ হতে পারেঃ

  • হৃদরোগ
  • ডায়াবেটিস
  • থাইরোয়েড গ্রন্থির রোগ যেমন হাইপারথাইরয়েডিজম
  • অ্যাজমা
  • ড্রাগের (ঔষধ) অপব্যবহার
  • অন্ত্রের যন্ত্রণাদায়ক ব্যাধি
  • ঋতুস্রাব সম্পর্কিত ব্যাধি

রোগটার বিষয়ে একটা সামগ্রিক ধারনা পাওয়া গেলেও এখনো এই ব্যাপারে বেশ কিছু প্রশ্ন মনের ভেতরে উঁকি দিচ্ছে নিটোলের। আপাতত লাঞ্চ আওয়ার শেষ হয়ে যাওয়ায় এই চিন্তা স্তগিত রেখে অন্য কাজে মন দিলো সে।

সারাদিন কাজের ব্যাস্ততায় এ নিয়ে বসা হলো না তার। অফিস শেষে বাসায় ফিরে সে দেখলো বাড়িতে আজ মেহমান এসেছে। বড় খালা আর খালাতো বোন সাবিহা। 

সাবিহা আর নিটোল ছোট বেলা থেকেই ভালো বন্ধু। একই সাথে স্কুলেও পড়েছে। যদিও সাবিহা পরে ডাক্তার হয় আর নিটোল ইঞ্জিনিয়ার। সাবিহাকে দেখতে পেয়ে সারাদিনের ক্লান্তি এমনি দূর হয়ে গেল নিটোলের।

বোনের সাথে গল্পে গল্পে অফিসের পাশের ডেস্কের কলিগ তানিয়ার কথাও চলে এলো এক সময়। সেখান থেকে দুশ্চিন্তা/উদ্বেগের বিষয়টা নিটোল জিজ্ঞাস করলো সাবিহা এই ব্যাপারে নিটোলকে কিছু বিস্তারিত জানাতে পারে কি না।

যে কারণে দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ সমস্যা দেখা দিতে পারেঃ

একটু সময় নিয়ে চিন্তা করে সাবিহা বললো, “লক্ষন, কারণ এগুলোতো জেনেই ফেলছিস, আমি এর বাইরে যেটুকু জানি সেখান থেকে বলছি”  এই বলে সে যে কারণে দুশ্চিন্তা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে সেগুলো বলতে শুরু করলো,

  • পুরুষদের তুলনায় মেয়েদের মাঝে এই রোগ হবার সম্ভবনা বেশি দেখা যায়।
  • অপ্রাপ্তবয়স্ক বা প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় কারো জীবনে যদি কোন ধরনের ভয় বা আশঙ্কার ঘটনা ঘটে থাকে বা কেউ দেখে থাকে তাদের  দুশ্চিন্তা/উদ্বেগ রোগ হবার সম্ভবনা বেড়ে যায়।
  • বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা থেকেও এটি হতে পারে।
  • বংশের কারো এই রোগ থাকলেও এই রোগ সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
  • বিভিন্ন ধরনের ঔষধ সেবনের ফলে এবং অ্যালকোহলের অপব্যবহারের ফলে এটি হতে পারে।
  • কোনো ধরনের মারাত্মক বা গুরুতর রোগ থাকলে তা থেকেও দুশ্চিন্তা হয়।
  • পারিবারিক কোনো দুর্ঘটনা, যেমন কেউ মারা গেলে অথবা অন্য সমস্যা, যেমন আর্থিক অসুবিধা প্রভৃতি কারণেও দুশ্চিন্তা হতে পারে।
  • যে সব ব্যক্তি খুব সহজেই আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে যায় তাদের এই সমস্যা হবার সম্ভবনা বেশি থাকে।

দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ এর ঝুঁকি কমাতে যা করণীয়ঃ

এর সাথে সাবিহা দুশ্চিন্তা ঝুঁকি কিছুটা কমানোর জন্যে কি কি পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে সেগুলোও জানালো নিটোলকে।  

  • অবহেলা না করে যত দ্রুত সম্ভব সকল প্রকার মানসিক ব্যাধির চিকিৎসা করানো উচিৎ।
  • অলসভাবে বসে না থেকে কোনো কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করা।
  • ড্রাগ বা অ্যালকোহলের ব্যবহার এড়িয়ে চলা।
  • যে সব কাজ করলে মন ভালো থাকে সেই কাজগুলো করা আর যে বিষয়গুলোতে মন খারাপ হয় সেগুলো এড়িয়ে চলার জন্যে পদক্ষেপ নেয়া।
  • দুশ্চিন্তা কমানোর জন্য সময় এবং কাজের  মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখতে চেষ্টা করা।

“বেশ অনেক কিছু জানালি রে তুই, এখন এই রোগের অনেকটাই আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে এসেছে” বলে উঠলো নিটোল। জবাবে চা খেতে খেত্রে একটু হাসি মুখে সম্মতিভাব প্রকাশ করলো সাবিহা।

নিটোল বললো, “রোগ শোক নিয়ে আলাপ করছি তুই বেড়াতে আসছিস তার পরেও, কিন্তু আমার আরো কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে করার, এখন করবো?”  সাবিহা বললো, “অবশ্যই, এই ব্যাপারে জানা তো জরুরী বল কি জানতে চাস, আমার জানা থাকলে আমি অবশ্যই তোর প্রশ্নের উত্তর দিবো”

নিটোল ভেবে প্রশ্ন মনে গুছিয়ে নিয়ে একে একে জিজ্ঞাস করতে শুরু করলো,

নিটোল, “মানসিক চাপ থেকে দুশ্চিন্তা হয় নাকি দুশ্চিন্তা থেকে মানসিক চাপ হয়?”

ডাঃসাবিহা, “মানসিক চাপ থেকেও দুশ্চিন্তা হতে পারে আবার দুশ্চিন্তা থেকেও মানসিক চাপ হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুটো ব্যাপার একসাথেই হয়ে থাকে। একটির কারণে অন্যটির অবস্থার অবনতি হতে পারে।“

নিটোল, “এই দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করার উপায় কি?”

ডাঃসাবিহা, “এক্সারসাইজ এ ক্ষেত্রে কাজে আসতে পারে। সপ্তাহে কমপক্ষে ২-৩ বার আধা ঘন্টা থেকে এক ঘন্টা ঘাম ঝরানো ধরনের ব্যায়াম করা যেতে পারে। এছাড়াও যোগব্যায়াম আর মেডিটেশনও করা যেতে পারে।

আচ্ছা শেষ একটা প্রশ্ন আছে, বলে নিটোল প্রশ্নটা করলো, “দুশ্চিন্তা প্রতিরোধ করার উপায় কি?”

সাবিহা উত্তর দিলো, “এক্ষেত্রে এমন কারো সাহায্য নেয়া আসলে জরুরী যে এই সমস্যার ব্যাপারে অভিজ্ঞ এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। দুশ্চিন্তা/উদ্বেগ সমস্যার কারণ, লক্ষন এগুলো জানা থাকলে এই রোগ প্রতিরোধ করতে সুবিধা হয়।“

“তুই তো বিরাট ডাক্তার হয়ে গেছিস দেখা যায়” হেসে বললো নিটোল। সাবিহা এবার একটু যেন লজ্জা পেয়ে গেলো। কথা পাল্টে তাই জিজ্ঞাস করলো, “তোর ওই কলিগকে দেখতে যাবি না? ওকে একটু সময় দিয়ে নরমাল করার চেষ্টা করিস পারলে।“ 

নিটোল জানালো, তানিয়ার শরীরের অবস্থা একটু ভালো হলেই বাসায় যেয়ে তাকে দেখে আসবে সে। আর এখন যেহেতু এই রোগের ব্যাপারে বেশ অনেকটা জানা হয়েছে তার সে চেষ্টা করবে তার নিজের বা আশেপাশের কারো যাতে এই সমস্যা হলেও বড় আকার ধারন না করে। 

দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ বিষয়ক ভিডিওঃ

স্বাস্থ্য বিষয়ে আমাদের অন্যান্য ব্লগগুলো পড়তে ঘুরে আসুন আমাদের ব্লগসাইটের হোমপেজ থেকে।

দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ সম্পর্কে আপনার কোনো জিজ্ঞাসা বা পরামর্শ থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুণ ইমেইল, ফেসবুক অথবা ফোন করুণ +০৯৬৩৯০০৬৬২২ নম্বরে।