রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া”। কিন্তু রাকিবকে ইঙ্গীত তো ইঙ্গীত, বার বার ধাক্কা দিয়েও ওর নাক ডাকার সংগীত থামানো যাচ্ছে। শোয়ার পর থেকে প্রচন্ড উৎসাহে যেভাবে শুরু করেছে তাতে মনে হচ্ছে সংগীত সাধনা দেখে দেখেই আজ রাতটা কাটিয়ে দিতে হবে। এ এমনও সংগীত যাকে সুইচ টিপে বন্ধ করা যায় না। এ এমনও সংগীত যাকে উপভোগ করা যায় না। সারা রাত কিভাবে কাটবে ভেবে ইমন কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়লো। এমনিতেই ইমনের সামান্য শব্দ হলেই ঘুম ভেঙে যায়, তার উপরে যে এঞ্জিন ছেড়ে রাকিব তাতে ইমন তো ইমন, কুম্ভকর্ণকে আনলে তার ঘুমও ভেঙে যাবে। শুয়ে শুয়ে চোখ বুঝে আকাশের তারা গুনতে লাগল ইমন। ব্যাকগ্রাউন্ডে চলছে পুউউউউ……পুইইইইইই……খড়ড় ড় ড় ড় ড় ড় ড় ড় ড়!!!!!!

সকালে উঠে সব বেমালুম অস্বীকার করলো রাকিব! সব! একটি বর্ণও তাকে বিশ্বাস করানো গেল না। দুহাত নাড়িয়ে জানিয়ে দিলো এগুলো গুজব! সব মিথ্যা! ওর বিরুদ্ধে নাশকতামূলক ষড়যন্ত্র! ও নাকি নাক ডাকে না! ও নাকি বংশীয় ছেলে। ওদের পরিবারে নাক না ডাকাই নাকি ঐতিহ্য! হাজার বছর ধরে নাকি এই ঐতিহ্য পালন করে আসছে ওর পরিবার।

হাতা নাড়ানোয় নড়ে উঠলো সদরঘাটের কুলির মাথার বস্তার মত থলথলে ওর তেলতেলে ভুরি। মুখে নেহারির হাড়। মনোযোগ দিয়ে চুষে চলেছে। একেবারে জবজবে হয়ে আছে তেলে। নেহারি ছাড়া সকালের নাস্তা নাকি পানসে লাগে ওর কাছে। খেয়ে খেয়ে একটা সুবিধা করেছে ও ইমনের জন্য। হস্তি দর্শনে চিড়িয়াখানায় যেতে হচ্ছে না। দু চোখ খুললেই সামনে দেখতে পায় বাছুর হস্তি।

তবে এই বাছুর হস্তির অতি সুললিত নাসিক্য গীতি আজ রাতেও শুনতে হবে ভেবে ইমনের মনটা খারাপ। রাকিবকে বললো,

“চাঁদু, তুমি যতই অস্বীকার করো, আমি তোমাকে ঢাকা ফিরে ডাক্তারের কাছে নেবোই। প্রয়োজনে ১২০০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে রেকার এনে রেকারে করে টেনে নিয়ে যাবো। তবুও নেবো।“

মুখে নিঠুর হাসি নিয়ে রাকিব চেটে যাচ্ছে নলা। কথা নেই কোনো।

অসহায় ইমন আবার বললো, “তুই যেহেতু বিশ্বাস করছিস না, আমি আজ রাতে তোর ভিডিও করবো। যদি তারপরেও যেতে না চাস ডাক্তারের কাছে তাহলে আমি এই ভিডিও ফেইসবুকে দিয়ে ভাইরাল করবো।“

কিছুটা নড়েচড়ে উঠলো রাকিব। কিছু একটা বললো, তবে মুখ ভর্তি খাবার থাকায় সেটা ইমনের কান অবধি এসে পৌছালো না। তবে বডি ল্যাঙ্গুয়েজে বুঝলো, ও রাজি।

মুচকি হাসলো একটু ইমন।

রাত ১:০০টা। পুইইইইইই পুইইইইইই শব্দে ধ্রুপদী সংগীত বাজছে রাকিবের নাকে। বড় সুললিত সে গীত। শত বছরের লাশও কবর থেকে উঠে এই গানের শিল্পীকে থাপ্পর মেরে চুপ করাতে চাইবে। খুব ভালো করে ভিডিও করে রাখলো ইমন। কাল সকালে দেখাবে বলে।

সকালে প্রথম যে কাজটা ইমন করলো সেটা হচ্ছে রাকিবকে ওর নাসিক্য গীতের মিউজিক ভিডিও দেখালো। কিছুক্ষণ অবাক হয়ে দেখে নিজেকে ধাতস্থ করে বললো, “এইগুলা ফোডুশপ করা যায়”।

তবে কিছুটা যে চিন্তিত হয়ে পড়েছে সেটা ওর চেহারাতেই বোঝা যাচ্ছে। খাওয়াতেও রুচি নাই বলে মনে হচ্ছে। মাত্র দুই বাটি নেহারি খেয়েই আজকে ক্ষান্ত দিল। মনে মনে হাসছে ইমন। ভাবছে, “যাক, ব্যাটাকে বিশ্বাস করানো গেছে তাহলে।“

হোটেলে বসেই রাকিবের মোবাইলে Enzaime Patient Care অ্যাপটা নামিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে, বিকাশে ভিজিটের পেমেন্ট দিয়ে একজন ENT স্পেশালিস্টের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নিলো।

পরদিন ভোরে ঢাকায় পৌঁছে সারাদিন বিছানায় মরার মত ঘুমানো ইমন। দুদিনের নির্ঘুম রাত পুষিয়ে নিতে চাইলো। কিন্তু ঘুমের মধ্যেও স্বপ্ন দেখলো সেই মন পাগল করা নাসিকা সংগীতের। ভেঙে গেল ঘুম। মনে হল  কানের মধ্যে এখনও সেই গানের প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছে। সাথে সাথেই মনে পড়লো আজই রাকিবকে নিয়ে ডাক্তার অর্নবের কাছে যাবার কথা। রাকিবকে কল করে মনে করিয়ে দিলো।

বিকাল ৩টার দিকে রওনা হল সিএনজিতে করে। রিকশার পথ হলেও রাকিব তেলের পাহাড় হওয়ায় এক রিকশায় বসা অসম্ভব। বাধ্য হয়ে সিএনজি।

চেম্বারে ঢুকে সালাম দিয়ে বসলো দুজনে।

–       ওয়ালাইকুম সালাম। জিজ্ঞেস করলেন, কার সমস্যা?

রাকিবের দিকে তাকালো ইমন। রাকিব বললো,

–       জ্বি আমার।

–       কী সমস্যা?

–       তেমন কিছু না। ঘুমের সময় সামান্য নাক ডাকার শব্দ হয় আর কী।

ইমন বাধা দিয়ে বললো,

–       ডাক্তার সাহেব, আপনি ট্রেইনে ঘুমানোর চেষ্টা করলেও পারবেন, কিন্তু রাকিবের পাশে ঘুমাতে পারবেন না। শুধু আপনি কেন, এ জগতে হায় কেউই পারিবে না। ইহা সম্ভব নহে।

ডাক্তার হাসলেন। বললেন,

–       দেখি একটু এগিয়ে আসেন সামনে।

নাকের ভেতরে কি সব যেনো দেখলেন। গলাতেও কী যেন দেখলেন। বললেন,

–       কবে থেকে হচ্ছে এই সমস্যা?

–       দুই একদিন হবে। রাকিব বললো।

–       কিভাবে বুঝলেন?

–       ইমন বললো।

–       ইমন কিভাবে জানলো?

–       ঘুরতে গিয়েছিলাম দুদিনের জন্য কক্সবাজার।

–       তারমানে হল আপনার সাথে রাতে একসাথে ঘুমিয়েছিল বলে জানতে পারলো, তাই তো?

–       জ্বি।

–       অর্থাৎ এর আগেও আপনার নাক ডেকেছিল কিনা সেটা আপনি জানেন না নিশ্চিত করে, তাই তো?

–       জ্বি। কিছুটা অস্বস্তি নিয়েই বললো রাকিব।

ডাক্তার সাহেব বলে যেতে লাগলেন,

–       নাক ডাকা এমন একটি সমস্যা যেটি রোগী নিজে টের পায় না। এমন কি কেউ বললেও বিশ্বাস করতে চায় না।

চট করে রাকিবের অস্বীকার করার কথা মনে পড়ে গেল ইমনের। মোবাইল থেকে ভিডিওটা বের করে দেখালো। আর বললো,

–       ওকে কোনোভাবেই বিশ্বাস করাতে না পেরে রাতে এই ভিডিও করেছিলাম। বিশ্বাস করুন সারা বিল্ডিং কাপছিল ডাক্তার সাহেব। আমি নিশ্চিত যে হোটেলে ছিলাম সে হোটেলের পাইলিং আলগা করে গেছে। যেকোনো মুহূর্তে যদি বিল্ডিংটা ভেঙে পড়ে তাহলে আমি অবাক হবো না। আহারে বিল্ডিংটা!

এবার হা হা করে হেসে উঠলো ডাক্তার সাহেব।

এদিকে রাকিব অধৈর্য্য হয়েছে ইতোমধ্যেই ইমনের টিটকারী খেতে খেতে। খাবার মজা লাগলেও, টিটকারী খেতে কারই বা ভালো লাগে!

বলে উঠলো, এই সমস্যা কেন হচ্ছে ডাক্তার সাহেব?

নাক ডাকার কারণ

ডাক্তার সাবেন বললেন, “ মূলত নাক ও মুখে বাতাস চলাচলে সমস্যা হলে নাক ডাকার সময়ে হয়। নাকের নালীতে পুরু নরম প্রলেপ থাকলে অর্থাৎ কোণো কারণে নাকের নালী সংকুচিত হয়ে গেলে, জিহ্বার পেছনের যে বায়ুপথ সেটি সংকুচিত থাকলে নাক ডাকে মানুষ। এগুলো যে কারণে হতে পারে বা নাক ডাক্তার মূল কারণগুলো হচ্ছে,

·         স্থুলতাঃ অতিরিক্ত ওজনের কারণে নাক ডাকা হতে পারে। নাকের নালী সংকুচিত হয়ে যেতে পারে এই সময়।

·         শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে যাওয়াঃ শীতে বা যেকোনো সময়ে সর্দির কারণে শ্বাসনালী বন্ধ হবার উপক্রম হয় অনেকের। তখনও ঘুমাতে গেলে নাক ডাকতে পারে।

·         মদ ও মাদকঃ অ্যালকোহল বা মাদক জিহ্বা এবং গলার পেশিকে অতিরিক্ত শিথিল করে দিতে পারে। যেটি ঘুমের সময় শ্বাসনালীকে সংকুচিত করে নাক ডাকার কারণ হতে পারে।

·         শোয়ার ভঙ্গিঃ চিৎ হয়ে শুলে নাক ডাকতে পারে।

·         দীর্ঘ সময় ঘুম না হলেঃ লম্বা সময় ঘুম না হলে জিহ্বা এবং গলার পেশি অতিরিক্ত শিথিল হয়ে যেতে পারে। ফলাফল, নাক ডাকা।

·         সাইনাসের সমস্যা থাকলেঃ সাইনাস ইনফেকশন বা নাকের হাড় বাকা থাকলে (Deviated Nasal Septum) নাকের নালীতে বাতাস চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে। ফলত, নাক ডাকা।

·         অতিরিক্ত ক্লান্ত থাকলেঃ অতিরিক্ত ক্লান্তি জিহ্বা ও গলার পেশিকে অতিরিক্ত শিথিল করে দিতে পারে। ফলে, নাক ডাকা

“তবে একটি কথা জানা দরকার”, ডাক্তার সাহেব বলতে থাকলেন, “সেটি হচ্ছে, নাক ডাকা মানে শব্দ যে শুধু নাক থেকেই হবে তা নয়। অনেক সময়েই শব্দ মুখ থেকেও হতে পারে।“

–       কিন্তু আমার কেন হচ্ছে? রাকিব জিজ্ঞেস করলো।

–       আপাত দৃষ্টিতে আপনার ওজন একটা সমস্যা বলে মনে হচ্ছে। তবে আমি কিছু পরীক্ষা দিচ্ছি। এগুলোর রিপোর্ট দেখলে নিশ্চিত হতে পারবো আপনার নাকে স্ট্রাকচারাল কোনো সমস্যা আছে কি না। ইন দ্যা মিনটাইম, আপনার ওজন কমাতে হবে। নো কোয়েশ্চেন অ্যাবাউট দ্যাট।

রাকিব চুপ। মুখ কালো করে বসে আছে।

ইমন বললো,

–       ডাক্তার সাহেব, অন্য কিছু বলেন। খাওয়া ও কমাতে পারবে না।

–       এটা একটা ভুল ধারণা যে ওজন কমাতে হলে আপনাকে খাওয়া কমাতে হবে। আরেকটা ভুল ধারণা হচ্ছে ডায়েট করতে হলে দামি দামি খাবার খেতে হয়। বিষয়টা হচ্ছে আপনার ক্যালোরি পোড়াতে হবে। আপনি কম খেতে করতে পারেন আবার পরিমাণ অনুযায়ী ব্যায়াম করেও করতে পারেন। Enzaime Patient Care অ্যাপ থেকে আপনারা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছেন না আমার?

–       জ্বি।

–       এই কোম্পানিরই Enzaime Diet Planner নামে একটা টুল আছে। অ্যাপেই পাবেন। ওখানে দেশি খাবার দিয়ে আপনি নিজের ডায়েট চার্ট নিজে বানাতে পারবেন।

নাক ডাকা কি সাধারণ সমস্যা নাকি এটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে?

রাকিব জিজ্ঞেস করলো,

–       ডাক্তার সাহেব, নাক ডাকা কি কোনো সাধারণ সমস্যা নাকি এটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে?

–       আপাতভাবে নাক ডাকায় শারীরিক কোনো সমস্যা নেই। তবে কিছু সমস্যা আবার রয়েছেও। যেমন ধরুন, আমাদের মধ্যে ধারণা আছে যে নাক ডাকা মানেই খুব ভালো ঘুম হচ্ছে। এটা ঠিক নয়। নাক ডাকা মানেই ভালো ঘুম নয়। বরঞ্চ অধিকাংশ ক্ষেত্রে নাক ডাকা মানে যে ডাকছে তিনি যথাযথ পরিমাণে অক্সিজেন পাচ্ছেন না। ফলে আসলে তার ভালো ঘুম হচ্ছে না। ফলে দেখা যায়  প্রায়শই তিনি দিনে ঝিমাচ্ছেন। কারণ রাতে ঘুম হয়নি তার ভালো করে।

এই গেলো একটি। তবে এবার যেটি বললো সেটি অনেক মারাত্বুক। নাক ডাকা মৃত্যুর কারণও হতে পারে!

–       এ্যাঁ!!!!! রাকিব প্রায় চিৎকার করে উঠলো।

–        হ্যাঁ। নাক ডাকার কারণ যদি স্লিপ অ্যাপনিয়া (Sleep Apnea) হয় তাহলে স্ট্রোক হবার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সাম্প্রতিক গবেষনায় দেখা গেছে। স্লিপ অ্যাপনিয়ার কারণে মানুষের মস্তিষ্কে অক্সিজেনের প্রবাহ কমে যায়। যেটি স্ট্রোকের দিয়ে নিয়ে যায়। অর্থাৎ নাক ডাকাকে যতটা মাসুম ধরে নিচ্ছি, সে ততটা মাসুম নয়। হা হা

–       ডাক্তার সাহেব, আমি এখন কী করবো?? প্রায় কেঁদেই দিলো রাকিব!

নাক ডাকার ঘরোয়া সমাধান/নাক ডাকা বন্ধের উপায়

ডাক্তার সাহবে বলতে থাকলেন, “নাক ডাকা বন্ধের জন্য ঔষধ বা মেডিকেল চিকিৎসা ছাড়া প্রাথমিকভাবে যে কাজগুলো করা যায় সেগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ

·         ওজন বেশি থাকলে কমানো

·         মদ ও সিগারেটসহ যেকোনো ধরণের মাদক বর্জন করা

·         চিৎ হয়ে নয়, কাৎ হয়ে শুতে হবে। প্রয়োজনে কোমরের পেছনের অংশ বল বা কিছু বেঁধে রাখুন যাতে চিৎ হতে না পারেন। পরে অভ্যাস হয়ে যাবে।

·         পর্যাপ্ত ঘুমানো। বেশিও নয়, কমও নয়। ছয় থেকে সর্বোচ্চ আট ঘন্টা

·         ঘুমানোর সময় মাথার নীচে বালিশের আকার এমন রাখুন যাতে সারা শরীরের তুলনায় মাথা কিছুটা উপরে থাকে

এগুলোতেও কাজ না হলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরনাপন্ন হতে হবে যেটি আপনারা করেছেন। এই পরামর্শ মোতাবেক চলুন। যে পরীক্ষাগুলো দিলাম সেগুলো করে নিয়ে আসুন। এরপরে নিশ্চিত করে বলা যাবে যে আপনার সমস্যায় কি শুধুমাত্র স্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইল মেনে চললেই হবে নাকি চিকিৎসারও প্রয়োজন রয়েছে।

চিন্তিত স্বরে রাকিব বললো,

–       আচ্ছা ডাক্তার সাহেব। আজ আসি তাহলে।

–       জ্বি আসুন। চিন্তা করবেন না। যেটিই হোক, সমাধান রয়েছে।-       জ্বি আচ্ছা।



এনজাইমের সকল ব্লগ পড়ার জন্য ক্লিক করুন এখানে