(পাইলস বা অর্শ কী তা নিয়ে নিম্নোক্ত ঘটনাটি পাবনা মেন্টাল হসপিটালের তিন নম্বর ওয়ার্ডের অত্যন্ত সম্মানিত ‘ইতিহাসবীদ’ পাকিরুদ্দিন গোলাম লতিফ (ওরফে পাগল) আমাদেরকে জানিয়েছেন। তার কাছে ঘটনার সত্যতা জানতে চাইলে এমন অগ্নিঝরা দৃষ্টিতে প্রতিবেদনের দিকে তাকান যে প্রতিবেদক ভয়ে বিশ্বাস করে ফেলেন। উপরন্তু জনাব পাগল কসম খেয়ে বলেছেন যে ঘটনাটি সত্য। চলুন তার মুখ নিজের থেকেই শোনা যাক।)



“বিশ্বযুদ্ধ লাগার উপক্রম!

বিশ্বের মহাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলো একে অপরের দিকে মিসাইল তাক করে বসে আছে। এমতাবস্থায় সারা বিশ্বের সকলের কাছে মান্যগণ্য একজন জ্ঞানী ব্যক্তির ডাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরের এক গোপন স্থানে তারচেয়েও গোপন বৈঠকের ব্যবস্থা করা হল। আমন্ত্রিত হল পরাশক্তি দেশগুলো। আশা করা হচ্ছিল এখানে বসেই আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হবে।

একটি বিশাল কনফারেন্স টেবিলের চারপাশে রাষ্ট্রপ্রধানগণ বসার জায়গা।। মাঝে বসলেন জ্ঞানী ব্যক্তিটি। আলোচনা শুরু হবে এবার। যুদ্ধ যাতে না হয় সে বিষয়ে একটি ঐকমত্যে পৌছতেই হবে। সারা পৃথিবীর ভাগ্য নির্ভর করছে এই বৈঠকের সফলতার উপরে।

সকলেই বসলেন কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। সবাই অবাক। তাকে বসতে বলা হল। তিনি বসলেন না। বললেন তিনি আলোচনা দাঁড়িয়েই করবেন। তার নাকি বসতে ইচ্ছে করছে না!

এই অস্বাভাবিক বক্তব্যে সবাই নির্বাক হয়ে গেল। এক দুই তিন চার করতে করতে তুমুল তর্কযুদ্ধ শুরু হলো। আলোচনা ভেস্তে গেল। বাকযুদ্ধের থেকে শুরু হয়ে গেল রক্তক্ষয়ী বিশ্বযুদ্ধ।

একশত বছর পরে বিস্তর গবেষনার পর জানা গেল আমেরিকার যেই প্রেসিডেন্টের ঘাড় ত্যাড়ামোর কারণে বিশ্বযুদ্ধ লেগেছিল তিনি আসলে পাইলস এ ভুগছিলেন!! আহারে পাইলস! শোনা যায় যারা এই আবিষ্কার করেছিলেন সেই টিমের একজন আক্ষেপ করে বলেছিলেন,  আহারে, একজনের পায়ুর কারণে এতজনের আয়ু ধ্বংস হয়েছিল! আহারে!

আরেকজন জানতে চেয়েছিলেন, এটিকে কি পায়ুপথের প্রথম যুদ্ধ বলা যায়?”

গল্পটি থেকে আমরা জানলাম যে পাইলস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রোগ। এটির জন্যে বিশ্বযুদ্ধও লেগে যেতে পারে। আপনাদের মধ্যে হয়ত কৌতুহল হচ্ছে এটি নিয়ে। চলুন তাহলে জেনে নেই এত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস পাইলস কী, কেন হয় আর এর থেকে সমাধানের উপায়ই বা কী।

পাইলস কী

পাইলস

পাইলস বা অর্শ হলো পায়ুপথে এবং মলদ্বারের নিচের দিকে অবস্থিত স্ফীত ও প্রদাহযুক্ত শিরা। এটি পায়ুপথের ভিতরে বা এর আশেপাশের ত্বকের নিচে হয়। মূলত মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগের জন্য এই সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়াও গর্ভাবস্থা, বয়স বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়ার কারণেও শিরার উপর চাপ বেড়ে গেলে পাইলসের সমস্যা দেখা দিতে পারে।


পাইলস হলো পায়ুপথে এবং মলদ্বারের নিচের দিকে অবস্থিত স্ফীত ও প্রদাহযুক্ত শিরা। এটি পায়ুপথের ভিতরে বা এর আশেপাশের ত্বকের নিচে হয়। মূলত মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগের জন্য এই সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়াও গর্ভাবস্থা, বয়স বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়ার কারণেও শিরার উপর চাপ বেড়ে গেলে পাইলসের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

সাধারণত বয়স ৫০ হওয়ার পূর্বেই এই সমস্যা দেখা যায়। মলত্যাগের সময় রক্তপাত হওয়া এই রোগের একটি সাধারণ লক্ষণ।

মলদ্বার থেকে রক্তক্ষরণ হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। কোনো মারাত্মক শারীরিক সমস্যা যেমন কোলোরেক্টাল ক্যান্সার বা অ্যানাল ক্যান্সার এর কারণে রক্তপাত হচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত হতে হবে। এর চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে ঐ স্থানে গরম পানি দিয়ে ধৌত করার পর ঔষধ বা ক্রিম লাগানো। পাইলসের আকার বড় হলে অপারেশন করাতে হবে।

পাইলস এর লক্ষণ

চলুন জেনে নেই পাইলসের লক্ষণসমূহ। অর্থাৎ কী দেখলে বুঝবেন পাইলস হয়েছে।

·         মলদ্বার দিয়ে রক্তক্ষরণ (Rectal bleeding)

·         পায়ুপথে জ্বালাপোড়া, যন্ত্রণা, চুলকানি বা ব্যথা হওয়া (Pain of the anus)

·         মলের সাথে রক্ত যাওয়া (Blood in stool)

·         কোষ্ঠকাঠিন্য (Constipation)

·         পেটে তীক্ষ্ণ ব্যথা (Sharp abdominal pain)

·         পায়ুপথের চারিদিকে ফোলা বা চাকা (Mass or swelling around the anus)

·         পায়ুপথে চুলকানি (Itching of the anus)

·         শরীরের নিম্নাংশে ব্যথা (Lower body pain)

·         কালো বর্ণের মল (Melena)

·         মল দেখতে অস্বাভাবিক লাগা (Changes in stool appearance)

·         বুক জ্বালা (Heartburn)

·         যোনীপথে ব্যথা (Vaginal pain)


পাইলস এর টেস্ট

এছাড়াও চিকিৎসকগণ রোগীকে নিম্নলিখিত মেডিকেল টেস্টগুলোও দিয়ে থাকেনঃ

·         সি-বি-সি (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট) (CBC, Complete Blood Count)

·         এইচ-বি% (হিমোগ্লোবিন) (HB% (Haemoglobin))

·         পি-টি (প্রোথ্রম্বিন টাইম) (PT (Prothrombin time))

·         হেমোরয়েড প্রসিডিউরস (Hemorrhoid procedures)

·         প্রোক্টস্কপি এন্ড অ্যানোরেক্টাল বায়োপসি (Proctoscopy and anorectal biopsy)

·         সিগময়ডোস্কপি অর কোলনস্কপি (Sigmoidoscopy or colonoscopy)

·         অ্যানো-রেক্টাল এক্সামিনেশন (Ano-rectal examination)

·         এনোসকপি (Anoscopy)


পাইলস কেন হয়?

যে যে কারণে পাইলস হতে পারেঃ

·         দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া

·         শাকসবজি ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার এবং পানি কম খাওয়া

·         অতিরিক্ত ওজন

·         গর্ভাবস্থা

·         লিভার সিরোসিস

·         মলত্যাগের সময় বেশী চাপ দেয়া

·         অতিরিক্ত মাত্রায় লেক্সেটিভ (মল নরমকারক ওষুধ) ব্যবহার করা বা এনিমা (শক্ত মল বের করার জন্য বিশেষ তরল মিশ্রণ ব্যবহার করা) গ্রহণ করা

·         টয়লেটে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা

·         বৃদ্ধ বয়স

·         পরিবারে কারও থাকলে

·         পায়ুপথে যৌনমিলন

·         ফ্যাটি ও উচ্চ প্রোটিন যুক্ত খাবার যেমন : গরুর মাংস, চিজ, মাখন, ফ্রাইড, চকোলেট, আইসক্রিম, কোমল পানীয় ইত্যাদি বেশি খেলে

·         ভার উত্তোলন, দীর্ঘ সময় বসে থাকা ইত্যাদি


পাইলস এর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়সমূহ

চলুন জেনে নেই যে যে বিষয়ের কারণে পাইলস হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়:

 ·         গর্ভাবস্থায় প্রোজেস্টেরন হরমোনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে মলদ্বারের শিরার প্রাচীর দুর্বল হয়ে গিয়ে পাইলস হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

·         অতিরিক্ত ওজনের কারণে মলদ্বার ও পায়ুপথে চাপ পড়ে এবং পাইলস হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

·         বংশগত কারণে পাইলস হতে পারে।

·         আঁশযুক্ত খাবার কম খেলে বা মশলাযুক্ত খাবার বেশি খেলে পাইলস হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

·         অনেকক্ষণ যাবৎ বসে থাকলে বা কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে পাইলস হতে পারে।


পাইলস এর ঘরোয়া চিকিৎসা ও সমাধান

পাইলস এর যদি একটি মাত্র সমাধান থাকতো তাহলে সেটি হত নিয়মিত মলত্যাগ। এই একটি কাজই পাইলের সমস্যার একমাত্র সমাধান হবার যোগ্যতা রাখে।

·         কোনোভাবেই কোষ্ঠকাঠিন্য হতে দেয়া যাবে না এবং নিয়মিত মলত্যাগ করতে হবে

·         প্রচুর শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার খাবার খেতে হবে এবং পরিমিত পরিমাণে পানি পান করতে হবে

·         পরিমিত মাত্রার অধিক পরিশ্রম না করা

·         প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে (৬-৮ ঘন্টা) ঘুমানো

·         ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা

·         টয়লেটে দীর্ঘ সময় বসে না থাকা। ফোন নিয়ে টয়লেটে না যাওয়ার অভ্যাস করা যেতে পারে এ উদ্দেশ্যে

·         সহজে হজমযোগ্য খাবার গ্রহণ করা

·         ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত লেক্সেটিভ সেবন না করা

·         মল ত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া

·         দীর্ঘমেয়াদী ডায়রিয়া থাকলে দ্রুত চিকিৎসা করা


পাইলস রোগীর জন্য উপকারী কিছু খাবার

পাইলস হলে হজম ঠিকঠাক থাকা যে প্রয়োজনীয় সেটি উপরে বলা হলে। হজম ঠিক রেখে এবং পর্যাপ্ত পুষ্টি থাক খাবার গ্রহণ করার মাধ্যমে পাইলস এর সমস্যা খুব সহজেই প্রতিরোধ করা যায়। শাকসবজি, ফলমূল, সব ধরণের ডাল, সালাদ, দধি, পনির, গাজর, মিষ্টি কুমড়া, লেবু ও এ জাতীয় টক ফল, পাকা পেপে, বেল, আপেল, কমলা, খেজুর, ডিম, মাছ, মুরগীর মাংস, ভূসিযুক্ত (ঢেঁকি ছাঁটা) চাল ও আটা ইত্যাদি।


পাইলস রোগে যে খাবারগুলো বর্জন করতে হবেঃ

খোসাহীন শস্য, গরু, খাসি ও অন্যান্য চর্বিযুক্ত খাবার, মসৃণ চাল, কলে ছাঁটা আটা, ময়দা, চা, কফি, চীজ, মাখন, চকোলেট, আইসক্রীম, কোমল পানীয়, সব ধরণের ভাজা খাবার যেমনঃ পরোটা, লুচি, চিপস ইত্যাদি খাবার পাইলস থাকলে এড়িয়ে চলতে হবে।


পাইলস রোগীদের জন্য টিপস

যেকোনো মূল্যে কোষ্ঠকাঠিন্যকে প্রতিরোধ করতে হবে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকবে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো প্রকার ঔষধ বা অপারেশন ছাড়াই পাইলস ঠিক হয়ে যাব এই দুটো নিয়ম মেনে চলতে পারলে। তবে অবশ্যই একজন নিবন্ধিত, বিশেষজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।


এনজাইম ব্লগ এনজাইম লিমিটেড (Enzaime Ltd) কর্তৃক পরিচালিত হয়। স্বাস্থ্য বিষয়ক আরও ব্লগ পড়তে চলে যান এনজাইম ব্লগে হোমপেইজে এখানে ক্লিক করে