পায়ের দুর্গন্ধ! এক নিদারুণ বিভিষিকার নাম! অধিকাংশের ক্ষেত্রেই শীতকালে এই সমস্যাটি বেশি হলেও, অনেকেরই বছরের পুরো সময়টা জুড়েই জুতো পরলে মোজায় অসহনীয় দুর্গন্ধ হয়। অত্যন্ত অস্বস্তিকর এবং বিরক্তিকর এই সমস্যা না যায় এড়ানো না করা যায় সমাধান।

এনজাইমের আজকের ব্লগে আমরা আলোচনা করবো পায়ের দুর্গন্ধ কী, পায়ের দুর্গন্ধ কেন হয় এবং পায়ের দুর্গন্ধ দূর করা উপায় সম্পর্কে।




রাতুলের নাম হয়ে গেল ট্যানারি পট্টি। আর ওদের বাসাকে বলা হতে লাগলো হাজারীবাগ। সেইদিন কী হয়েছিল তা জানতে আমাদেরকে পেছন ফিরতে হবে কয়েকদিন আগে।

সেদিন রাতুলের পাত্রী দেখতে যাবার কথা। দিনটা সে হিসেবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

সেলুন থেকে ও চুল দাঁড়ি, কেটে এসেছে। বেশ সময় নিয়ে একটা ফেশিয়ালও করেছে। ফ্রেস অনুভূতি নিয়ে যেতে চায়। নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপনের একটা ব্যাপার তো সেই সাথে আছেই। রাতুলের সাথে ওর মা, বাবা, ছোটো মামা আর বড় চাচা। আগে থেকেই বলা থাকায় নীচে ওদের স্বাগত জানানোর জন্য পাত্রীর বড় ভাই আর ভাবী অপেক্ষা করছিল।

সবাই জুতো খুলে ঢুকে গেল ড্রয়িং রুমে। রাতুল জুতো খুলতে চাচ্ছে না। জুতো নিয়েই ঢুকতে যাওয়ায় বাড়ির কাজের মেয়ে জমিলা বলল,

“ভাইজান জুতা খুলেন। একটু আগে বহুত কষ্ট কইরা মুছছি।“

কথার জোরটা একটু বেশী থাকায় সবাই শুনে ফেললো।

কিছুক্ষণের একটি অস্বস্তিকর নিরবতা। রাতুল আশা করছিল এই বাসার কেউ একজন বলবে যে জুতো খোলার প্রয়োজন নেই।

কিন্তু বিধিবাম! কেউ কোনো কথা না বলে রাতুলের দিকে তাকিয়ে আছে। রাতুলের তখন ধরণী দ্বিধা হও, মরে ঢুকে যাই অবস্থা!। অগত্যা ওকে জুতো খুলেই ঢুকতে হল। মুখ কালো! মেঘের মত অন্ধকার!

হালকা নাস্তা দেয়া হয়েছে। ধীরে ধীরে খাচ্ছে সবাই। মেয়ের ছোটো ফুপা কিছুক্ষণ পর ইঁদুরের মত নাক কুঁচকে এদিক ওদিক তাকালো একবার। বিড়বিড় করে বললো, ইঁদুর মরা গন্ধ আসছে কোত্থেকে আবার!

রাতুলের প্যালপিটিশন শুরু হয়ে গেল! এই ভয়ই করেছিল। আজ মান সম্মান থাকবে কিনা কে জানে!

রাতুল মনে মনে দোয়া পড়ছে আর বলছে, “ইয়া মাবুদ! তুমিই মালিক! আমার মান সম্মানের মালিকও তুমি! বাঁচাও!”

কিন্তু আল্লাহ মনে হয় পাপী রাতুলের কথা আজ আর শুনলো না। কিছুক্ষণ পর অনেকেই নাক কুঁচকে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। কিন্তু কিছু বলছে না। চাপা অস্বস্তি! রাতুলের আকাশে আজ দূর্যোগের ঘনঘটা! গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মত এর মধ্যেই পাত্রী ঢুকলো ঘরে। দুই পাশে দুই বান্ধবী। এসে বসতে না বসতেই ওদের নাকও কুঁচকে উঠলো। কিছু বলছে না।

এর মধ্যে ছোটো ফুপা থাকতে না পেরে পাশের ঘরে গিয়ে জমিলাকে ধমক দিল।

“বাসা ঠিক মত পরিষ্কার করোছ নাই ক্যান? ইন্দুর মরা গন্ধে ঘরে টিকা যাইতেছে না। তোরে আজকেই কাম থিকা ছুটায়া দিমু! ফাজিল মাইয়া! কাজ কাম করে না খালি জীবন মানে জি-বাংলা লইয়া পইড়া থাকে! মেহমানের সামনে মান সম্মান রাখলি না আর!”

দেখা গেল জমিলার তাপমাত্রা ফুপার থেকে কয়েক ডিগ্রি বেশী! ততধিক চিৎকার করে বলে উঠলো,

“না করলে না করলাম আপনেগো কাম! কিন্তু মিছা কথা কইবেন না আমার লগে কইয়া দিলাম। আমি বাসা ঠিকমত পরিষ্কার করছি। ইন্দুর মরা গন্ধ আপনেগো পোলার পাও থিকা আইতাছে। আমি জমির মিয়ার কন্যা জমিলা বানু। মিছা কথা আমাগো রক্তে নাই কইয়া দিলাম।“

আজ রাতুলের কপাল পুড়বে বলে আগে থেকেই বিধাতা নির্ধারণ করে রেখেছিলেন বোধ হয়। কারণ এই ধরনের অনুষ্ঠানে সবাই আস্তে ধীরে কথা বলে অথচ রাতুলের মান সম্মান খোয়ানো এই কথোপকথনটি ততক্ষণে বসার ঘরে সবাই শুনে ফেলবে কেন? একটু আগেই একবার ধরণী দ্বিধা হও অবস্থা হয়ে যাওয়া রাতুলের অবস্থা এখন আল্লাহ গো রশি ফেলাও, বাই উডি যাই!

সবাই ততক্ষণে বুঝে গেছে ইঁদুর মরা গন্ধ রাতুলের পবিত্র পদযুগল থেকেই আসছে।

আরও প্রায় ঘন্টাখানেক পরে কয়েক দফা এয়ার ফ্রেশনার দিয়ে কোনো রকমে রুমে নাক দিয়ে অক্সিজেন নেয়ার পরিস্থিতি তৈরি করে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ওরা বের হল। কারও মুখে কোনো কথা নাই। সবার মুখ ভার। রাতুল পারে না হাওয়া হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যায়!

পরদিনই ঘটক ফোন দিয়ে জানালো পাত্রীপক্ষ না করে দিয়েছে। ট্যানারী পট্টিতে তাদের মেয়েকে তারা পাঠাবে না বলে দিয়েছে।

রাতুল সবই মেনে নিল, তাই বলে তাকে ট্যানারী পট্টি বলবে! এতটা নিঠুর মানুষ কিভাবে হতে পারে! সিদ্ধান্ত নিল, এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। যেভাবেই হোক। করতেই হবে।

দুঃখের কথা বন্ধু রাজনের সাথে বলতে রাজন বলল, “এক কাজ কর, একটা চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ দেখা। কিন্তু করোনা (কোভিড-১৯) পরিস্থিতিতে এখন ডাক্তাদের চেম্বারে যাওয়া থেকে টেলিমেডিসিনই বেটার চয়েস। বাঙলাদেশে বেশ ভালো কয়েকটা টেলিমেডিসিন সার্ভিস প্রোভাইডার আছে। এনজাইম (Enzaime Ltd) এর টেলিমেডিসিন বেশ ভালো। আমি ওদের সার্ভিস নিয়েছি একবার। ওদের ডাক্তারও আছে অনেক। তুই প্লে স্টোর থেকে এনজাইমের অ্যাপটা নামায়ে একজন ডাক্তারের সাথে আলাপ কর। আমার ধারনা সমস্যার সমাধান পাবি।

রাজনের কথা মত এনজাইমের Enzaime Patient Care অ্যাপটি প্লে স্টোর থেকে নামিয়ে একজন ডার্মাটোলজিস্টের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নিল রাতুল। ভিজিটও দিয়ে দিল বিকাশ করে। পরের দিন সময়মত মোবাইল এসএমএস চলে এলে ডাক্তারের সাথে ভিডিও কলে যুক্ত হল।

–          “ডাক্তার সাহেব আসসালামু আলাইকুম”। রাতুল সালাম দিল।

–          ওয়ালাইকুম সালাম রাতুল সাহেব। কেমন আছেন বলুন।

–          ভালো না ডাক্তার সাহেব। বেঁচে থাকিবার স্পৃহা হারাইয়া ফেলিয়াছি।

–          হাহাহাহা। রাতুলের বলার ভঙ্গিতে ডাক্তার হেসে দিলেন। জিজ্ঞেস করলেন কী হয়েছে।

রাতুল পায়ের দুর্গন্ধ তার দুঃখের মহাকাব্য বলে গেল ৫ মিনিট ধরে। শেষে বললো,

–          বলুন, এই জীবন রাখিয়া কী লাভ!

হাসিমুখে ডাক্তার সাহেব মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। বললেন,

–          সমস্যাটা আসলে খুবই সিম্পল। কিন্তু অনেকেই জানেন না দেখে সমাধান করতে পারেন না।

–          ডাক্তার সাহেব প্লিজ একটু বুঝিয়ে বলেন বিষয়টা।

পায়ের দুর্গন্ধ

পায়ের দুর্গন্ধ কী

পায়ের দুর্গন্ধ

জুতো পরলে পায়ের দুর্গন্ধ হবার সমস্যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলে ব্রোমোডোসিস (Bromodosis)। ঘামের সাথে ব্যাক্টেরিয়া জমে পায়ের দুর্গন্ধ সমস্যা হয়।



পায়ের দুর্গন্ধ কেন হয়?

পায়ের দুর্গন্ধ কেন হয়

পায়ের দুর্গন্ধ হয় যখন পায়ে থাকা ব্যাক্টেরিয়া জুতো পরার কারণে হওয়া ঘাম, পায়ের মৃত কোষ ও তেল খায় এবং পরবর্তীতে মলত্যাগ করে তখন। এই মল থেকে আসা দুর্গন্ধই পায়ের দুর্গন্ধ হিসেবে আমাদের নাকে আসে।

মূল কারণ হচ্ছে ঘাম এবং তার সাথে ব্যাক্টেরিয়া। আমাদের শরীর থেকে যে ঘাম হয় সে ঘামের আসলে কোনো ভালো মন্দ গন্ধ থাকে না। ঘাম মূলত গন্ধহীন। সমস্যা হয় যখন সেই ঘামে ব্যাক্টেরিয়া জন্মায় তখন।

তো আমাদের শরীরের ঘামগ্রন্থির মধ্যে সবচেয়ে বেশি থাকে দুই পায়ে। আমাদের দুই পায়ে প্রায় দুইলক্ষ পঞ্চাশ হাজার ঘামগ্রন্থি রয়েছে। ফলে যখন আপনি জুতো পরেন তখন পা থেকে ঘাম বের হয়। কারও কম বা কারও বেশী।

এই ঘামের কারণে আপনার জুতোর মধ্যে ময়েশ্চার মানে আদ্র পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এই পরিবেশ ব্যাক্টেরিয়ার জন্য অত্যন্ত অনুকূল। এখন ব্যাক্টেরিয়ার যেহেতু বেঁচে থাকতে হবে তারমানে হল তার খাবার দরকার।

ব্যাক্টেরিয়াগুলো সাধারণত আপনার পায়ের ত্বকের মৃত কোষ (বিশেষত পায়ের পাতার সাদা চামড়ার অংশটুকুতে) এবং ত্বক থেকে বের হওয়া তেল খেয়ে বাঁচে।

খাবার যেহেতু খেয়েছে তার তো মলত্যাগও করতে হবে তাই না? তো এই ব্যাক্টেরিয়াগুলো যে মলত্যাগ করে সেটার দুর্গন্ধই জুতো খুললে আমাদের নাকে আসে। এই হচ্ছে জুতো পরলে পায়ের দুর্গন্ধ হবার কারণ। একদম সহজ না?

–          বুঝতে পেরেছি বিষয়টা ডাক্তার সাহেব।

পায়ের দুর্গন্ধ দূর করার উপায়

রাতুল জিজ্ঞেস করলো,

–          কিন্তু ডাক্তার সাহেব, এই পায়ের দুর্গন্ধের সমাধান কী? আমার জীবন তো ওষ্ঠাগত!

–          সমাধান খুব সহজ। তবে পায়ের দুর্গন্ধ সমস্যার জন্য কোনো একটি সমাধান নয় বরং কয়েকটি বিষয় নিয়মিত অনুসরণ করতে হবে।

আপনার মূল ঊদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যাক্টেরিয়ার খাবার পায়ে জমতে না দেয়া এবং আদ্র পরিবেশ সৃষ্টি হতে না দেয়া। তাতে করে ব্যাক্টেরিয়া জন্মাতে পারবে না এবং জন্মালেও খাবার পাবে না। ফলে দুর্গন্ধও হবে না।

আমি আপনাকে তালিকা দিয়ে দিচ্ছি একটা যেগুলো নিময়িত অনুসরণ করবেন। এগুলো মেনে চললে পায়ে দুর্গন্ধ হবে না কখনওঃ

পায়ের দুর্গন্ধঃ সমাধান

·         প্রতিদিন অন্তত একবার পায়ের পাতা শক্ত কিছু দিয়ে (পাথর কিংবা প্লাস্টিক বা শক্ত মাটির ঢেলা যেগুলো বাজারে কিনতে পাওয়া যায়) ভালো করে ঘসে মৃত চামড়া পরিষ্কার করে ফেলুন।

·         কোনোভাবেই একই মোজা প্রতিদিন পরা যাবে না।

·         সবসময় সুতি মোজা পড়ুন।

·         অন্তত দুই জোড়া জুতো ব্যবহার করুন। পাল্টে পাল্টে পরবেন।

·         সারাদিন পরে থাকার পর বাসায় রাতে এসে জুতোর মধ্যে টি ব্যাগ রেগে দিন। জুতোর মধ্যকার আদ্রতা শুষে নেবে।

·         নিয়মিত জুতো রোদে রাখুন।

·         কোনভাবেই ভেজা পায়ে জুতো পরা যাবে না।

·         সম্ভব হলে বেশী সময় জুতো পরে থাকবেন না। অফিসে গেলে অফিসের জন্য আলাদা স্যাণ্ডেল ব্যাবহার করুন। এতে করে পায়ে আলো বাতাস লাগবে যা পায়ের ব্যাক্টেরিয়ার যম।

·         পায়ের নখ বড় রাখা যাবে না। নখের নীচে প্রচুর ব্যাক্টেরিয়া জমে থাকে। নখ কেটে ছোটো করে রাখুন।

এরপরেও কাজ না হলে আমার সাথে আরেকদিন যোগাযোগ করবেন। বাজারে প্রচুর অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল, অ্যান্টিফাংগাল স্প্রে পাওয়া যায়। সেগুলো ব্যাবহার করতে পারেন। এগুলো পায়ের ব্যাক্টেরিয়া মেরে ফেলে। এতে করেও দুর্গন্ধ আসা বন্ধ হবে।

–          বিষয়টা আমি বুঝতে পেরেছি ডাক্তার সাহেব। আমি কদিন এগুলো পদ্ধতিগুলো ফলো করে দেখি। যদি তারপরেও কাজ না হয় আমি আপনার সাথে আবার যোগাযোগ করবো।

–          নিশ্চই।

–          আসসালামু আলাইকুম ডাক্তার সাহেব। আল্লাহ হাফেজ।

–          ওয়ালাইকুম সালাম। আল্লাহ হাফেজ।


স্বাস্থ্য সম্পর্কিত এমন আরও নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় সমস্যা সম্পর্কিত ব্লগের জন্য চলে যান এনজাইম ব্লগের হোমপেইজে