হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে যেকোনো আলোচনায় আমাদের মনে প্রথম যে শব্দ দুটো আসে তা হল ফ্যাট আর কোলেস্টেরল। আমরা শুনতে পাই যে, ফ্যাট আর কোলেস্টেরলই নাকি যত নষ্টের গোড়া। এগুলোকে শরীর থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করতে পারলেই যেন আমাদের শান্তি। শান্ত হবে আমাদের রক্তচাপ। সুস্থ থাকবে আমাদের হৃৎপিন্ড আর ভালো থাকবো আমরা।

চারদিক থেকে ফ্যাট আর কোলেস্টেরল সম্পর্কে এত এত অভিযোগ চলতে থাকলেও চিকিৎসা বিজ্ঞান ফ্যাট ও কোলেস্টেরলের উপরে ঠিক এতটা ক্ষ্যাপা নয়। সাথে আরও জেনে নেই যে এগুলো কি আসলেই এত বিপজ্জনক কিনা বা হয়ে থাকলে তা ঠিক কতটা। প্রথমে কোলেস্টেরল।

বহুল আলোচিত এবং সমালোচিত এই ফ্যাট ও কোলেস্টেরল সম্পর্কে চলুন কিছুটা বিস্তারিত আমরা জেনে নেই

কোলেস্টেরল (Cholesterol) জিনিসটি আসলে কী?

কোলেস্টেরল অনেকটা মোমের মত এক ধরণের বস্তু যা আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে পাওয়া যায়। কোলেস্টেরল তৈরি হয় আমাদের শরীরের লিভারে। খাবারের মাধ্যমেও কোলেস্টেরল আমাদের শরীরের প্রবেশ করে প্রতিনিয়ত।

কোলেস্টেরলের ভাল দিক কি একেবারেই নেই?

কোলেস্টেরল খারাপ, কোলেস্টেরল পচা, কোলেস্টেরল কালপ্রিট, এসব শুনতে শুনতে আমাদের মাথায় কোলেস্টেরল সম্পর্কে ধারণা নেতিবাচক হলেও চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, কোলেস্টেরলকে আমরা যতটা খারাপ মনে করি, এটি আসলে ঠিক ততটা খারাপ নয়। তার একটি প্রমাণ হচ্ছে কোলেস্টেরল শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ভিটামিন ডি তৈরিতে সাহায্য করে থাকে। পাশাপাশি পুরুষ দেহের টেস্টস্টেরন এবং নারী দেহের এস্ট্রোজেনের মত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরিতেও এটি ব্যবহৃত হয়। আর যে বিষয়টি না বললেই নয় কোলেস্টেরল সম্পর্কে, সেটি হচ্ছে এটি খাবার হজম করার প্রক্রিয়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

ফ্যাট (Fat) জিনিসটি আসলে কী?

এবার ফ্যাট সম্পর্কে একটু জেনে নেয়া যাক। ফ্যাট (Fat), বাংলায় যাকে আমরা স্নেহ জাতীয় পদার্থ বলি, মানব শরীরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদার্থ। ভিটামিন এ, ডি এবং এ- এর মত গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন কাজে লাগাতে ফ্যাট ব্যবহৃত হয়। আমাদের ত্বককে সুস্থ রাখতে ফ্যাট ব্যবহৃত হয়।

আমাদের শরীরের অব্যবহৃত শক্তি, কার্বোহাইড্রেট (Carbohydrate) এবং প্রোটিন (Protein) সাধারণত ফ্যাটে রূপান্তরিত হয়। ফ্যাট আমাদের শরীরের শক্তির সংরক্ষণের উপায় হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। যেমন, এক গ্রাম ফ্যাটে ৯ কিলো ক্যালরি শক্তি থাকে যেখানে এক গ্রাম আমিষ (প্রোটিন) এবং কার্বোহাইড্রেটে থাকে মাত্র ৪ কিলো ক্যালরি শক্তি। সহজেই বোঝা যাচ্ছে ফ্যাট শরীরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এত উপকার থাকার পরে ফ্যাট, কোলেস্টেরলকে আমরা খারাপ বলছি কেনো?

এই বিষয়টি বোঝার জন্য মোটা দাগে তিনটি তথ্য আমাদের মাথায় রাখতে হবে।

তথ্য নম্বর এক, ফ্যাট মূলত দুই ধরণেরঃ

·         স্যাচুরেটেড বা সম্পৃক্ত ফ্যাট (Saturated Fat) এবং

·         আনস্যাচুরেটেড বা অসম্পৃক্ত ফ্যাট (Unsaturated Fat)

তথ্য নম্বর দুই, কোলেস্টেরল রক্তে দ্রবীভূত হয় না। ফলে কোলেস্টেরলের যে কাজ তা সম্পাদন করার জন্য যেহেতু শরীরের বিভিন্ন স্থানে এটিকে যেতে হয় সেজন্য এমন একটি বাহন প্রয়োজন যেটি কোলেস্টেরলকে এর উৎপত্তিস্থল লিভার থেকে শরীরের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাবে। এখানেই আমাদের তথ্য নম্বর তিন সম্পর্কে জানতে হবে

কোলেস্টেরলকে বহন করার জন্য আমাদের শরীরে লিপিড এবং প্রোটিনের সমন্বয়ে লিপোপ্রোটিন তৈরি হয়। এই  লিপোপ্রোটিনের ঘনত্ব কেমন হবে তার উপরে ভিত্তি করে বহনের উদ্দেশ্যে তৈরি হওয়া এই লিপোপ্রোটিন দুই ধরণের হয়ঃ

·         কম ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন (Low Density Lipoprotein, LDL) যা কোলেস্টেরলকে লিভার থেকে শরীরের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করে নিয়ে যায়। এটিকে খারাপ কোলেস্টেরলও (Bad Cholesterol) বলা হয়।

·         উচ্চ ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন (High Density Lipoprotein, HDL) যা কোলেস্টেরলকে শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে লিভারে ফেরত নিয়ে আসে। এটিকে ভালো কোলেস্টেরলও (Good Cholesterol) বলা হয়।

উপরের তথ্যগুলো মাথায় রেখে এবার আমরা বুঝতে চেষ্টা করবো কেন ফ্যাট এবং কোলেস্টেরলের মত নিরীহ ও উপকারী দুটি পদার্থকে এত লাঞ্ছনা গঞ্জনা সইতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

আমাদের শরীরে যদি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট বৃদ্ধি পায় তাহলে LDL-এর পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। এর ফলে LDL-এর মাধ্যমে কোলেস্টেরল রক্তে প্রবাহিত হবার সময় ধমনীর চারপাশে এক ধরণের আলাদা স্তর (Plaque) হিসেবে জমা হতে থাকে। যতবেশি এই স্তর বাড়তে থাকে ততবেশি রক্তের ধমনীর উপরে চাপ পড়তে থাকে। ফলে ধমনী চেপে যেতে থাকে। এতে করে হৃৎপিন্ডে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয়। ধীরে ধীরে ধমনী শক্ত এবং চারদিক থেকে সংকীর্ণ হতে থাকে। এক সময় অতিরিক্ত প্লাকের কারণে রক্ত চলা বন্ধ হয়ে যায়। যেহেতু রক্তের মাধ্যমেই হৃৎপিন্ডে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন প্রবাহিত হয়, ফলে রক্ত চলাচলে সমস্যা হলে বুকে ব্যথা কিংবা রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।

গবেষনায় দেখা গিয়েছে যে আমাদের শরীরে স্যাচুরেটেড বা সম্পৃক্ত ফ্যাট বৃদ্ধি পেলে LDL বৃদ্ধি পায়। আর LDL বৃদ্ধি পেলে কী হবে তা উপরে দেখেছি। ফলে LDL কোলেস্টেরল বৃদ্ধি পাবার সাথে হৃদরোগের সরাসরি সম্পর্কে দেখা যাচ্ছে। সুতরাং ফ্যাট এবং কোলেস্টেরলের মধ্যকার প্রত্যক্ষ সম্পর্কটি এখানে বোঝা যাচ্ছে সহজেই।

স্যাচুরেটেড বা সম্পৃক্ত ফ্যাট খুব খারাপ তা না হয় বুজতে পারলাম আমরা কিন্তু আনস্যাচুরেটেড বা অসম্পৃক্ত ফ্যাটের বিষয়টি কী তাহলে? এর সাথে আমাদের সুস্থতা কিংবা অসুস্থতার কোনো সম্পর্কি কি রয়েছে? তাহলে কিভাবে?

স্যাচুরেটেড ফ্যাট বাড়লে যেমন LDL বাড়ে ঠিক তেমনি, আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট বাড়লে HDL বৃদ্ধি পায়। HDL কী করে? HDL শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে কোলেস্টেরলকে পুনরায় লিভারে ফেরত নিয়ে আসে যা পরবর্তীতে লিভার কর্তৃক প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে শরীর থেকে বের হয়ে যায়। এতে করে ধমনীতে জমা হওয়া ক্ষতিকর LDL কোলেস্টেরল হ্রাস পায়। ধমনীর চারপাশের ক্ষতিকর LDL না থাকা মানে হৃৎপিন্ড তার প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় যা হৃৎপিণ্ডকে সুস্থ রাখতে ভূমিকা পালন করে।

তাহলে খুব সংক্ষেপে আমরা পুরো বিষয়টিকে এভাবে বলতে পারিঃ

স্যাচুরেটেড বা সম্পৃক্ত ফ্যাট বৃদ্ধি পাওয়া মানে LDL বৃদ্ধি পাওয়া যা হৃদরোগের কারণ হয়।

আনস্যাচুরেটেড বা অসম্পৃক্ত ফ্যাট বৃদ্ধি পাওয়া মানে HDL বৃদ্ধি পাওয়া যা হৃৎপিণ্ডকে ভালো রাখে।

অর্থাৎ ফ্যাট বা কোলেস্টেরল মানেই খারাপ বিষয়টি ঠিক অতটা সহজ সরল নয়।

LDL কিংবা HDL-এর লেভেল কিভাবে জানা যাবে?

কোলেস্টেরল লেভেল মাপার জন্য রক্ত পরীক্ষা করতে হয়। কবে কখন বা কতদিন পর পর এটি পরীক্ষা করতে হবে তা বয়স, ঝুঁকিপূর্ণতা এবং পারিবারিক ইতিহাসের উপরে নির্ভর করে। তবে সাধারণ পরামর্শ হচ্ছেঃ

১৯ বছর বা তার চেয়ে কম বয়সীদের জন্য:

·         প্রথম পরীক্ষাটি ৯ থেকে ১১ বছর বয়সের মধ্যে হওয়া উচিত

·         বাচ্চাদের প্রতি 5 বছর পর পুনরায় পরীক্ষা করা উচিত

·         রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরল, হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে কিছু শিশুর ২ বছর থেকে এই পরীক্ষা শুরু করা যেতে পারে

২০ বা তার বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে:

·         তরুণদের প্রতি ৫ বছর অন্তর পরীক্ষা করা উচিত

·         ৪৫-৬৫ বছরের ব্যক্তিদের প্রতি ১ বা ২ বছর অন্তর পরীক্ষা করা উচিত

কোন খাবারে কত ক্যালরি তা মেপে নিজের সুবিধামত দেশী খাবার ব্যবহার করে নিজের ডায়েট চার্ট বানানোর ব্যবহার করুন এনজাইম ডায়েট প্ল্যানার

কী কী কারনে LDL বৃদ্ধি পেতে পারে?

খাবারঃ খাবারের স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং কোলেস্টেরল থাকলে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি পায়

ওজনঃ অতিরিক্ত ওজন LDL বাড়ায়, HDL হ্রাস করে এবং আপনার সামগ্রিক কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি করে

শারীরিক কার্যকলাপঃ শারীরিক কর্মকান্ডের অভাব ওজন বৃদ্ধি করতে পারে যা LDL স্তর বাড়িয়ে তুলতে পারে

ধূমপানঃ সিগারেট HDL হ্রাস করে। রক্তে HDL কম থাকলে LDL বৃদ্ধি পেতে পারে।

বয়স এবং লিঙ্গঃ বয়সের সাথে সাথে কোলেস্টেরল লেভেল বৃদ্ধি পায়। মেনোপজের পূর্বে একই বয়সের একজন পুরুষ থেকে একজন নারীর কোলেস্টেরল কম থাকলেও মেনোপজের পরে তা বৃদ্ধি পাবার প্রবণতা দেখা যায়।

বংশগতিঃ LDL এর পরিমাণ পারিবারিক ইতিহাসের উপরেও নির্ভর করে।

ঔষধপত্রঃ স্টেরয়েড, কিছু রক্তচাপের ওষুধ এবং এইডসের ওষুধসহ সুনির্দিষ্ট কিছু ঔষধ LDL বাড়িয়ে তুলতে পারে।

অন্যান্য অসুস্থতাঃ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ, ডায়াবিটিস এবং এইডস-র মতো রোগ LDL বৃদ্ধি করতে পারে।

কী কী খাবার থেকে উপকারী আনস্যাচুরেটেড বা অসম্পৃক্ত ফ্যাট পাওয়া যাবে আর অপকারি স্যাচুরেটেড বা সম্পৃক্ত ফ্যাট যাতে আমরা এড়িয়ে চলতে পারি সেজন্য কী কী খাবার বর্জন করতে হবে আসুন এবার তাহলে সেটি জেনে নেই।

আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের কিছু উৎসঃ

·         জলপাই, ক্যানোলা, চিনাবাদাম এবং তিলের তেল

·         আভোকাডো

·         জলপাই

·         বিভিন্ন ধরণের বাদাম

·         চিনাবাদাম বা পিনাট বাটার

·         সূর্যমূখী, তিল এবং কুমড়ার বীজ

·         বিভিন্ন ধরণের মাছের চর্বি

·         স্যামন মাছ

স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকা কিছু খাবারের তালিকাঃ

·         চর্বিযুক্ত মাংস

·         মাংসজাতীয় খাবার

·         মাখন, ঘি

·         পনির, বিশেষত চেডারের মতো শক্ত পনির

·         বিস্কুট, কেক এবং পেস্ট্রি

·         পাম তেল

গবেষনায় দেখা গিয়েছে একজন পুরুষ দৈনিক ৩০ গ্রামের মত স্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণ করতে পারে এবং একজন নারীর জন্য সেই পরিমাণ হচ্ছে ২০ গ্রাম। 

আমরা সম্ভবত এই আলোচনা থেকে এটুকু বুঝতে পারছি যে ফ্যাট বা কোলেস্টেরল মানেই খারাপ এতটা সহজ সরল নয় বিষয়টি। ফ্যাট এবং কোলেস্টেরল দুটোরই ভালো এবং মন্দ উভয় দিকই রয়েছে। কোন ফ্যাট এবং কোন কোলেস্টেরল আমরা আমাদের শরীরের প্রবেশ করাচ্ছি, কী পরিমানে করাচ্ছি সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

আপনি যদি হৃদরোগে আক্রান্ত হন তাহলে ঘরে বসে অনলাইনে কিংবা চেম্বারে যেয়ে ডাক্তারের পরামর্শের জন্য এনজাইমের শতাধিক ডাক্তারের তালিকা থেকে আপনার জন্য উপযুক্ত ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে পারেন। বিস্তারিত এখানে।

উপসর্গ দেখে রোগ নির্ণয়ের জন্য ব্যবহার করুন এনজাইম সিম্পটম চেকার

স্বাস্থ্য সম্পর্কিত এনজাইমের এই ধরণের আরও ব্লগ পড়ার জন্য ক্লিক করুন এখানে