দেশের বেশ নাম করা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে ফুয়াদ। ঢাকার আধুনিক অফিস এলাকা গুলশানে সাত তলা একটা বিল্ডিং এর পুরোটাই সেই প্রতিষ্ঠানের হেড অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মাত্র মাস দুয়েক আগে এই নতুন অফিসে পুরোদমে কাজ শুরু করেছে তারা।

সেন্ট্রাল এ.সি, ইলেকট্রিক দরজা, মোশন ক্যামেরা আর অটোমেটিক ফায়ার ডিটেক্টিং ব্যবস্থা সহ অনেক আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাজানো হয়েছে অফিস বিল্ডিংটিকে কিন্তু প্রযুক্তি আছে বলেই সব ঠিক আছে এমন মানতে নারাজ প্রতিষ্ঠানের উর্ধতন কর্তৃপক্ষ।

তাদের সব সময় সজাগ দৃষ্টি রয়েছে যেন এখানে কাজ করা কর্মীদের কোন ধরনের সমস্যা বা বিপদ না হয় । তার অংশ হিসেবে সব কর্মীদের জন্যে বাধ্যতামূলক ফায়ার ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করেছে তারা।

দুইদিনের ওয়ার্ক শপের আজ দ্বিতীয় দিন চলছে। প্রথম দিন ফায়ার ডিপার্ট্মেন্টের থেকে আসা ট্রেইনারা সবাইকে শিখিয়েছেন আগুন লেগে গেলে অফিস থেকে কিভাবে বের হয়ে যেতে হবে আর সেই সময় কি করা উচিৎ কিনবা উচিৎ না। 

আজ দ্বিতীয় দিনের আলোচনা রাখা হয়েছে কি ব্যাপারে এই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, আগুনের ভয়াবহতা, যে কোন ভাবে কারো শরীর পুড়ে গেলে কি ধরনের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া যেতে পারে এসব ব্যাপারে।দুপুরে খাবার বিরতির পরে আগুনে পোডা বিষয়ক অভিজ্ঞ ডাক্তার ইকরামুল কবির আসলেন বার্ন / পোড়া (Burn) বিষয়ে তাদের সাথে আলোচনা করতে।

ফুয়াদ এখন সেই আলোচনাই শুনছে। ডাঃ কবির শুরুতে জানালেন শুধুমাত্র অফিসের দুর্ঘটনা নয়, যে কোন পরিস্থিতিতে যে কোন জায়গায় এই সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। কাজেই সব সময় এই বার্ন/পোড়া বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। এরপর তিনি বার্ন/পোড়া বিষয়ে একটা সংক্ষিপ্ত ধারণা দিলেন,

বার্ন / পোড়া কত রকমের হতে পারে?

বার্ন বা পোড়া

অনেক কারনেই আমাদের ত্বক বা চামড়া পুড়ে যেতে পারে। এর কারণ হতে পারে সহ্য সীমার চাইতে বেশি তাপ, বিদ্যুৎ, রাসায়নিক পদার্থ, ঘর্ষণ বা বিকিরণ ইত্যাদি। পুড়ে যাবার ফলে শরীরের ত্বক বা এর ভেতরের অংশ কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার উপর নির্ভর করে একে কয়েক ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।

চামড়ার বাইরের অংশ পুড়ে যাওয়াকে বলা হয়ে থাকে সুপারফিসিয়াল (superficial) বা First Degree Burn। ত্বক বা চামড়া পুড়ে যাবার কারণে এর গভীর স্তর প্রভাবিত হলে তাকে বলা হয় Second Degree Burn। চামড়ার পুরো স্তর পুড়ে যাওয়াকে Third Degree Burn বলা হয়ে থাকে। আর যখন পুড়ে যাওয়ার প্রভাব চামড়ার পুরো স্তর ভেদ করে মাংসপেশী বা হাড়ে পৌঁছে তখন তাকে বলা হয় Fourth Degree Burn।

খবরে অনেক সময় এই বিভন্ন ধরনের বার্নের বিষয়ে শুনে থাকলেও কোনটার কি অর্থ সে ব্যাপারে আলোচনা শুনতে আসা অনেকেরই কোন ধারনা ছিলো না। ফুয়াদের নিজেরও খুব ভালো ধারনা ছিলো এমন নয়। বেশ মনোযোগ দিয়ে তাই পুরো ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছিলো সে। ডাঃ ইকরামুল কবির প্রাথমিক ধারনার সাথে এর কিছু ব্যাখা শুনিয়ে বার্ন এর সাধারণ কারণ সবার সামনে তুলে ধরলেন।

বার্ন বা পোড়ার কিছু কারণ

সাধারণত যে ব্যাপারগুলোর কারণে ত্বক বা চামড়া পুড়ে যেতে পারে :

(ক) আগুন।

(খ) গরম তরল বা বাষ্প।

(গ) গরম ধাতু বা এ ধরনের অন্যনায় বস্তু।

(ঘ) বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা।

(ঙ) ক্যান্সার চিকিৎসার সময় ব্যবহৃত এক্স-রে এবং রেডিয়েশন থেরাপি।

(চ) রাসায়নিক পদার্থ যেমন, এসিড (Acid), ক্ষার জাতীয় বস্তু (Alkali), রং পাতলা করার জন্যে ব্যবহার করা বিভিন্ন পদার্থ, পেট্রল ইত্যাদি।

এই কারণগুলোর ব্যাপারে ধারণা আছে ফুয়াদের। যদিও তাদের অফিসের প্রেক্ষিতে হয়তো সবগুলো কারণ কার্যকরী না। তবু ডাঃ কবির সম্ভাব্য সবকিছুই আলোচনা করছেন দেখে ফুয়াদের ভালো লাগলো।

কারণগুলো সম্পর্কে সবাইকে বিস্তারিত ধারনা দিয়ে ডাঃ কবির পরের বিষয় বর্ননা করতে শুরু করলেন। বার্ন/পোড়া ধরনের কোন দুর্ঘটনা কবলিত রোগীদের মাঝে সাধারণ যে লক্ষণগুলো দেখা যায়। একে একে তিনি বেশ কিছু লক্ষনের নাম মুখে বলে গেলেন সাথে এক দুই লাইন করে ব্যাখাও দিলেন। যাতে সবার বুঝতে সুবিধা হয়। তার পেছনে থাকা বিশাল প্রেজেন্টেশন স্ক্রিনে দেখা গেলো পুরো তালিকাটি।

লক্ষণসমূহঃ

বার্ন, পোড়া

লক্ষন বোঝানোর পর ডাঃ কবির জানালেন, এর পর তিনি বার্ন/পোড়া বিষয়ের সাথে সম্পর্কটি কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন এবং তারপর উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে প্রশ্ন গ্রহণ করবেন।

কারা বার্ন বা পোড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন?

আকস্মিক দুর্ঘটনার কারণে বার্ন বা পোড়ার ঘটনা আমরা শুনে থাকি। তবে এর বাইরেও যে শ্রেণীর মানুষের বার্ন/পোড়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে তাদের মাঝে রয়েছে,

(ক) চার বছর থেকে কম বয়সী শিশুদের তুলনামূলক ভাবে এই সমস্যা বেশি হতে দেখা যায়। এর অন্যতম মূলকারণ বাড়ির অন্যান্য সদস্য বিশেষ করে বাবা মায়ের উদাসীনতা।

(খ) যে সব ব্যক্তি নেশাজাত দ্রব্য ব্যবহার করে, তাদের মানসিক ভারসাম্য সব সময় স্বাভাবিক থাকে না। এ কারণে তাদের অসাবধানতায় আগুন লাগার যেমন সম্ভবনা বাড়ে, তেমনি তাদের বার্ন হবার বা পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।

(গ) বিভিন্ন জরীপের তথ্য অনুযায়ী মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের এই সমস্যায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

(ঘ) ধুমপানের কারণে সৃষ্ট দুর্ঘটনার ফলে ধূমপায়ীদের এই সমস্যার সম্মুখীন হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

(ঙ) অতিরিক্ত সূর্যের তাপের ফলে অনেক সময় ত্বক পুড়ে যাবার ঘটনা ঘটতে পারে।

দুর্ঘটনার বাইরে অন্য কোন কারণে মানুষের বার্ন/পোড়ার সম্ভবনা থাকতে পারে এই ব্যাপারটা আসলে ফুয়াদের মাথায়ই আসে নি আগে। আলোচনা শেষ করে ডাঃ ইকরামুল কবির একটু বিরতি নিলেন।

এতক্ষণ যারা মনোযোগ দিয়ে এই আলোচনা শুনছিল, তারা মনে মনে প্রশ্ন গুছিয়ে নিতে শুরু করলো। শুরুতেই যে প্রশ্নটি এলো এর জন্যে ডাঃ কবির তৈরি ছিলেন। সম্ভবত সব জায়গায় এই প্রশ্নটির উত্তর তাকে দিতে হয়ে থাকে।

সিনিয়র ম্যানেজার লেভেলের এক ভাই প্রশ্নটি করলেন,

স্যার আমি জানতে চাচ্ছিলাম, বার্ন/পোড়ার ক্ষেত্রে রোগীকে কোন কারণে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে দেরি হলে, কোনো ধরনের প্রাথমিক চিকিৎসা কি দেয়া যাবে?

উত্তরে ডাঃ ইকরামুল কবির বললেন,

ফার্স্ট এবং সেকেন্ড ডিগ্রি বার্নের রোগীদের ক্ষেত্রে বিশেষ সময়ে জরুরী চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে প্রাথমিক চিকিৎসায় যেন অতিরিক্ত সময় ব্যয় না হয়। গুরুত্বর বার্ন বা পোড়ার ক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করাই ভালো।

ভাইয়া নতুন প্রশ্ন যুক্ত করলো আগের প্রশ্নের ধারা বজায় রেখে,

কি ধরনের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া যেতে পারে সে বিষয়ে যদি কিছু জানাতেন স্যার। 

ডাঃ কবির এবার ধাপে ধাপে এ প্রশ্নের উত্তর দিলেন,

বার্ন / পোড়া চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু সাধারণ পদ্ধতিঃ

রোগী ভেদে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতে পারে। সে কারণে আলোচনায় বলা পদ্ধতিগুলো সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে এমন না। সব সময় চেষ্টা করতে হবে রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার।

তারপরও সাধারণ বার্ন/পোড়ার চিকিৎসায় কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে যেমন –

  • শরীরের পুড়ে যাওয়া অংশে সম্ভব হলে ট্যাপের পানি বা এ ধরনের শীতল প্রবাহমান পানির ধারার নিচে দশ-পনেরো মিনিট মতন ধরে রাখা যেতে পারে।
  • এই ব্যবস্থা করা সম্ভব না হলে পুড়ে যাওয়া অংশ বালতি বা অন্য কোন পাত্রের পানিতে ডুবিয়ে রাখার চেষ্টা করতে হবে। কাছাকাছি অঞ্চলে পরিষ্কার পানির জলাশয় থাকলে সেখানেও শরীরের পুড়ে যাওয়া অংশ ডুবিয়ে রাখা যেতে পারে।
  • যদি এই ব্যবস্থাও তাৎক্ষণিক করা সম্ভব না হয়, তাহলে শরীরের পুড়ে যাওয়া অংশে সাধারণ তাপমাত্রার পানি (গরম বা ফ্রিজের শীতল পানি নয়) পর্যাপ্ত পরিমাণে ঢালতে থাকতে হবে।
  • জীবানুর সংক্রামণ এড়ানোর জন্যে বার্ন / পোড়া অংশ জীবাণুমুক্ত গজ বা ব্যান্ডেজ (তুলা নয়) দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

এইটুকু বলে তিনি থামলেন, এবার একই প্রশ্নের উত্তরের পরবর্তী অংশ তিনি আবার বলতে শুরু করলেন,

বার্ন বা পোড়ার ক্ষেত্রে যে কাজগুলো করা উচিৎ নয়ঃ

প্রাথমিক চিকিৎসায় কি করা যাবে সেটা জানা যেমন জরুরী তেমনি কোন কাজ গুলো করা উচিৎ নয় সেগুলোও জেনে রাখা ভালো,

  • যে কোন ধরনের বার্ন/পোড়ার ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে গরম পানি, বরফ/ফ্রিজের শীতল পানি ঢালা উচিৎ নয়।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ডিম, টুথপেস্ট, মাখন, পেট্রোলিয়াম জেলি বা কোনো ধরনের মলম আগেই ব্যবহার করা উচিৎ না।
  • ক্ষত স্থান ঢাকার জন্যে তুলা দিয়ে ড্রেসিং করা উচিৎ নয়, সে ক্ষেত্রে সম্ভব হলে শুকনো গজ বা ব্যান্ডেজ ব্যবহার করতে হবে।

এবার ফুয়াদ তার মাথায় ঘুরতে থাকা প্রশ্নটি করলো,

স্যার, সাধারণ পোড়ার ক্ষেত্রে বা চিকিৎসা সম্পন্ন করার পরও রোগীকে যে হেলথ টিপসগুলো মেনে চলতে হবে, সেই ব্যাপারে যদি কিছু ধারনা দিতেন।

এই প্রশ্নের উত্তরে ডাঃ ইকরামুল কবির জানালেন,

হেলথ টিপস

যদিও রোগী ভেদে এ ক্ষেত্রেও হেলথ টিপসে পরিবর্তন আসতে পারে তবে সাধারণত যে ব্যাপারগুলো করতে বলা হয় –

  • কোমল সাবান এবং পানি দিয়ে ক্ষত স্থান পরিষ্কার করতে হবে। ক্ষত স্থানে কোন কিছু লেগে থাকলে সেগুলো আলতোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। যদি ফোসকা অক্ষত থাকে তাহলে সেগুলোকে গেলে দেওয়া ঠিক নয়।
  • ক্ষত স্থানের শুষ্কতা দূর করতে লোশন এবং ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে হবে। তাছাড়া, ক্ষত স্থানে চেতনা নাশক ক্রিম (anesthetic cream) ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • ক্ষত স্থানকে জীবানুমুক্ত পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ঢিলা করে বাঁধে রাখা যেতে পারে।

সবগুলো প্রশ্নের সুন্দর গোছানো উত্তর পেয়ে আলোচনায় অংশ নেয়া সবাই বেশ সন্তুষ্ট বোঝা গেলো। কারণ ফুয়াদের প্রশ্নের পর আর কারো কোন প্রশ্ন বাকি রইলো না। ডাঃ কবির নিজেদের বার্ন / পোড়া থেকে রক্ষা করতে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়ে সেদিনের আলোচনা শেষ করলেন।

স্বাস্থ্য বিষয়ে আমাদের অন্যান্য ব্লগগুলো পড়তে ঘুরে আসুন আমাদের ব্লগসাইটের হোমপেজ থেকে।

বার্ন বা পোড়া সম্পর্কে আপনার কোনো জিজ্ঞাসা বা পরামর্শ থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুণ ইমেইল, ফেসবুক অথবা ফোন করুণ +০৯৬৩৯০০৬৬২২ নম্বরে।