ব্যক্তি জীবনে চলার পথে আমাদের এমন বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, যেগুলো আমরা অন্যকারো সাথে আলোচনায় যেতে চাই না। এই সমস্যা হতে পারে শারীরিক কোন অসুবিধা আবার হতে পারে মানসিক কোন স্বাস্থ্য সমস্যা। বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন (Depression) এমনই একটি সমস্যার উদাহরণ।  

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাঃ জাকির আলোচনা শুরু করলেন এই বক্তব্য দিয়ে। তাঁর সামনে বসে আছে প্রায় শ’খানেক মানুষ। এতোদিনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝতে পারেন কে মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনছে আর কে কেবল তাকিয়ে আছে অন্যমনস্ক ভাবে। এখানে বসে থাকা বেশিরভাগ শ্রোতা মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনছে বুঝতে পেরে তিনি আবারো আলোচনা শুরু করলেন। 

বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন কী?

বিষণ্ণতা, ডিপ্রেশন

কোন কারণে একজন মানুষ যদি দীর্ঘ সময়ের জন্যে  দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে থাকে এবং সবকিছুতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে থাকে, তাকে মোটাদাগে বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন বলা চলে।

এই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা আরো বেশ কিছু নামে পরিচিত, যার মাঝে রয়েছে মেজর ডিপ্রেশন (major depression), মেজর ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডার (major depressive disorder) ও ক্লিনিকাল ডিপ্রেশনও (clinical depression)। 

অনেকে বিষণ্ণতাকে সাধারণ মানসিক দুর্বলতার সাথে গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু দুটো ব্যাপার সম্পূর্ণ আলাদা। ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ব্যক্তির পক্ষে নিজ থেকে এ সমস্যার সমাধান করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। এ রোগ্র আক্রান্ত হলে অনেকক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় চিকিৎসা নেয়ার প্রয়োজন পরে। 

এটুকু বলে থামলেন ডাঃ জাকির। স্বনামধন্য একটি ডিজিটাল মার্কেটিং ফার্মে তিনি আজ এসেছেন মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে একটি ওয়ার্কশপে অংশ নিতে। এনজাইম বাংলাদেশ নামের একটি স্বাস্থ্যসেবা প্লাটফর্ম বিভিন্ন অফিসে এ ধরনের ওয়ার্কশপের আয়োজন করে আসছে।

প্রথম যেদিন এ ব্যাপারে তাঁর সাথে যোগাযোগ করা হয় এনজাইম থেকে খুবই অবাক হয়েছিলেন তিনি।  বাংলাদেশে এই ধরনের সেবাদানের জন্য যে একটি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে ব্যাপারটা জানতে পেরে বেশ গর্ব অনুভব করেছিলেন সেদিন। প্রাথমিক ব্যাখ্যার শেষ অংশে চলে এলেন এবার তিনি, 

বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন কেবলমাত্র যে মানুষের অনুভূতি, চিন্তা এবং আচরণের উপর প্রভাব ফেলে তাই নয়, এই রোগের কারণে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়ার সম্ভবনাও থাকে। নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে গেলে এই রোগ আক্রান্ত ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনে যেমন বিরুপ প্রভাব সৃষ্টি হয়, তেমনি তার নিজের কাছে জীবনকে অর্থহীন বলে মনে হতে শুরু করে। 

সবারদিকে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিজের পেছনে থাকা বিশাল স্ক্রিনের স্লাইড বদলে নিলেন ডাঃ জাকির। সবাইকে নতুন স্লাইডে নজর বুলিয়ে নেবার জন্যে সময় দিয়ে বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশনের কারণ কি হতে পারে সে বিষয়ে আলোচনায় চলে গেলেন তিনি। 

বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন এর কারণসমূহঃ 

  • অতিরিক্ত মদ্যপান (Alcohol abuse)         
  • অ্যালঝেইমার ডিজিজ (Alzheimer’s disease)
  • দুশ্চিন্তা / উদ্বেগ (Anxiety)           
  • ঔষধের অপব্যবহার (Drug abuse)
  • অস্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস (Eating disorder)
  • সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia)
  • ব্যক্তিত্বের ব্যাধি (Personality disorder)    
  • পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (Post-traumatic stress disorder)
  • বাইপোলার ডিজঅর্ডার (Bipolar disorder)             
  • রেস্টলেস লেগ সিন্ড্রোম (Restless leg syndrome)
  • হান্টিংটন ডিজিজ (Huntington disease)
  • মারিজুয়ানা অ্যাবিউজ (Marijuana abuse)            
  • নিউরোসিস (Neurosis)
  • কনডাক্ট ডিজঅর্ডার (Conduct disorder)
  • ডিসোশিয়েটিভ ডিজঅর্ডার (Dissociative disorder)
  • ডিজথাইমিক ডিজঅর্ডার (Dysthymic disorder) 
  • কাপোসি সারকোমা (Kaposi sarcoma)
  • ফ্যাক্টিশাস ডিজঅর্ডার (Factitious disorder)        
  • সোমাটাইজেশন ডিজঅর্ডার (Somatization disorder)      
  • অ্যাস্পারজারস সিন্ড্রোম (Asperger’s syndrome)
  • অ্যাকিউট স্ট্রেস রিঅ্যাকশন / ডিজঅর্ডার (Acute stress reaction/disorder)
  • ব্যাসেট ডিজিজ (Behcet disease)             
  • সাইকোসেক্সুয়াল ডিজঅর্ডার (Psychosexual disorder)

স্লাইডে অনেকগুলো কারণ লেখা থাকলেও এর সবগুলোতে একই ব্যক্তির আক্রান্ত হতে হবে এমনটা নয়। এর যে কোন একটি থেকেও দেখা দিতে পারে বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন। এরপর তিনি এই কারণগুলোর ব্যাপারে অল্প কথায় বিস্তারিত আলোচনা করলেন। দীর্ঘ বক্তৃতা যাতে একঘেয়ে না হয়ে যায়, সে ব্যাপারে বরাবরই সতর্ক থাকেন ডাঃ জাকির। তাই কারণ আলোচনার পরে ১০ মিনিটের ছোট একটি বিরতি ঘোষণা করলেন তিনি। 

বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন

বিরতি থেকে ফিরে ঠিক যেখানে আলোচনা থামিয়েছিলেন এরপর থেকে নতুন আলোচনা শুরু করলেন তিনি। বিরতির মাঝে এনজাইমের স্বাস্থ্যকর্মীরা শ্রোতাদের কাছ থেকে প্রশ্ন গ্রহণ করেছে। সেই সাথে কারো এই রোগের ব্যাপারে কোন জিজ্ঞাসা থাকলে যাতে ব্রিফিং শেষে ডাঃ জাকিরের সাথে কথা বলতে পারে সে ব্যাপারেও ব্যবস্থা করেছে। 

ডাঃ জাকির বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশনের লক্ষনগুলো নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করলেন। 

বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন এর সাধারণ লক্ষণসমূহঃ 

  • উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা (Anxiety and nervousness)
  • বিষণ্ণতা সমস্যা (Depressive or Psychotic symptoms)
  • অনিদ্রা (Insomnia)
  • ডিলিওশন অথবা হ্যালুসিনেশন (Delusions or Hallucinations)
  • ঔষধের অপব্যবহার (Drug Abuse)
  • অতিরিক্ত মদ্যপান (Abusing alcohol)
  • অতিরিক্ত রাগ (Excessive anger)
  • হীনমন্যতায় ভোগা (Low self-esteem)

অনেকের কাছে এই রোগের লক্ষণগুলোর সাথে অন্য রোগের লক্ষনের মিল আছে বলে মনে হতে পারে। এবং সেটা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বেশিরভাগ মানসিক ব্যাধির ক্ষেত্রে রোগনির্ণয় করতে পারা রোগের চিকিৎসার মতই জরুরি ব্যাপার হয়ে ওঠে। ডাঃ জাকির জানালেন, শ্রোতাদের কাছ থেকে প্রশ্ন নেয়ার আগে এই রোগের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি আলোচনা করবেন। 

গবেষনায় দেখা গেছে বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশনের  ঝুঁকি বৃদ্ধি করার পেছনে বেশ কিছু বিষয় কাজ করে থাকে। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় হচ্ছেঃ 

বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন এর ঝুঁকি বৃদ্ধি করে যে বিষয়গুলোঃ 

  • শিশু বা কিশোর থাকা অবস্থায় বিষণ্ণতায় ভোগা।
  • অ্যাঙজাইটি ডিজঅর্ডার, বর্ডারলাইন পারসোনালিটি  ডিজঅর্ডার (Borderline Personality) অথবা পোস্ট-ট্রম্যাটিক ট্রেস ডিজঅর্ডার (Post traumatic stress disorder) হওয়া।
  • আত্মমর্যাদাহীনতা, পরনির্ভরশীলতা, আত্মসমালোচনা করা ও হতাশাপ্রবণ হওয়ার মতো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকা।
  • ক্যান্সার, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের মতো গুরুতর বা ক্রনিক (chronic) কোনো রোগ হওয়া।
  • ঘুমের ঔষধ বা উচ্চ রক্তচাপের ঔষধের মতো নির্দিষ্ট  কিছু ঔষধ গ্রহণ করা।
  • ট্রমা বা মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী কোনো ঘটনা ঘটা, যেমন- শারীরিক বা যৌন নিগ্রহণ, নিকটজনের মৃত্যু, সম্পর্কের জটিলতা ও আর্থিক সমস্যা।
  • বংশে/পরিবারে নেশাগ্রস্ত, আত্মহত্যাকারী,  বিষণ্নতায় ভোগা ও বাইপোলার ডিজঅর্ডারে (bipolar disorder) আক্রান্ত ব্যক্তি থাকা।

উপোরক্ত আলোচনা শেষ করে ডাঃ জাকির এবার শ্রোতাদের কাছ থেকে প্রশ্ন নেয়া শুরু করলেন। প্রথম প্রশ্নটি করলো কোম্পানির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তাঁর প্রশ্নটি ছিলো, 

ঔষধ গ্রহণ না করলেও বিষণ্ণতা নিয়ন্ত্রণ করা কি সম্ভব? 

এ প্রশ্নের উত্তরে ডাঃ জাকির জানালেন,   থেরাপির মাধ্যমে বিষণ্ণতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে ঔষধ গ্রহণ করা বা থেরাপি নেয়ার বিষয়ে চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে নেয়া জরুরী। 

বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন নিয়ন্ত্রণের জন্য আক্রান্ত ব্যক্তি কিছু বিষয় অনুসরণ করতে পারেন। যেমন- নিয়মমাফিক জীবনযাপন, সঠিকভাবে ঘুমানো, ইতিবাচক বিষয় সন্ধান করা, সমগ্র দিনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ইতিবাচক বিষয়ের তালিকা করা এবং সবসময় হাসিখুশি  থাকার চেষ্টা করা ইত্যাদি।

প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্নকর্তাকে বেশ সন্তুষ্ট মনে হলো। ডাঃ জাকির এবার পরবর্তী প্রশ্ন নেয়ার জন্যে প্রস্তুত হলেন। ডিজিটাল মার্কেটিং এর কন্টেন্ট টিমের একজন নতুন কর্মী এবার প্রশ্নটি করলো। 

গর্ভাবস্থায় নারীরা বিষণ্ণতায় ভুগলে কি করা উচিৎ? 

বেশ বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন। এ প্রশ্নের জন্যে প্রশ্নকর্তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ডাঃ জাকির উত্তর দেয়া শুরু করলেন, 

আমার অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি  গর্ভাবস্থায় অনেক নারীই বিষণ্ণতায় ভুগে থাকেন। এবং বিষণ্ণতার কারণে গর্ভে থাকা শিশুর উপর প্রভাব পড়তে পারে। তাই এ অবস্থায় ডিপ্রেশন দেখা দিলে এ বিষয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। গর্ভাবস্থায় ঔষধ গ্রহণ করলে যেহেতূ  ভ্রুণের উপর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে তাই ঔষধ ছাড়া সাইকোথেরাপির মাধ্যমে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। 

আর কোন প্রশ্ন আছে কিনা জিজ্ঞাস করার পর যখন তেমন কোন প্রশ্ন না আসায় ডাঃ জাকির আলোচনা শেষ করার আগে বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্যে কিছু হেলথ টিপস সবার জন্যে বলে দিলেন। 

হেলথ টিপসঃ 

  • চিকিৎসা পদ্ধতি মেনে চলা: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। সাইকোথেরাপি বা ঔষধ যে ব্যাপারেই চিকিৎসকরা পরামর্শ দিয়ে থাকুক সেটা বাদ দেয়া উচিৎ নয়। কারণ চিকিৎসা মাঝ পথে বাদ দিয়ে দিলে বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশনের লক্ষণগুলো আবারও দেখা দিতে পারে।
  • বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশনের ব্যাপারে সঠিক তথ্য জানা: বিষণ্ণতা সম্পর্কিত সঠিক তথ্যগুলো নিজেকে মানসিক ভাবে শক্তিশালী করে তুলতে সহায়তা করে। তাই এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির  নিজের এবং পরিবারের সদস্যের এ রোগের ব্যাপারে বিস্তারিত জানা জরুরী। 
  • নিয়মমাফিক ব্যায়াম করা: শারীরিক করসত বা ব্যায়াম বিষণ্ণতার লক্ষণগুলোকে কমিয়ে রাখতে সহায়তা করে। তাই বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন কমানোর জন্যে হাঁটা, জগিং করা, সাঁতার কাটা, বাগান তৈরি ইত্যাদি কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। 
  • মাদকাসক্তি ত্যাগ: স্বাভাবিকভাবে মনে হতে পারে যে মাদকদ্রব্য গ্রহণ করলে বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন কমে যায়। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে মাদকাসক্তির কারণে পরবর্তীতে বিষণ্ণতার লক্ষণগুলি আরও তীব্র রূপ ধারণ করে। তাই বিষণ্ণতায় আক্রান্ত কোন ব্যক্তির যদি মাদকাসক্তি থাকে সেটা যত দ্রুত সম্ভব কমিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে হবে। 

আলোচনা শেষ করে সবার দিকে আরেকবার তাকালেন ডাঃ জাকির। অনেকেই ব্যাপারগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনেছে বলেই মনে হলো তাঁর। এনজাইমের টিম থেকে ঘোষণা করা হলো আগামী এক ঘন্টা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডাঃ জাকির স্যার আজকের ওয়ার্কশপে অংশ নেয়া সদস্যদের কারো ব্যক্তিগত সমস্যা থাকলে সে ব্যাপারে আলোচনা করবেন। ডাঃ জাকির সাময়িক বিরতির জন্যে এগিয়ে গেলেন। 

স্বাস্থ্য সমস্যা এবং তার সমাধান বিষয়ে অন্যান্য ব্লগ পড়তে ঘুরে আসুন আমাদের ব্লগসাইটের হোমপেজ থেকে।

বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন বিষয়ে আপনার কোনো জিজ্ঞাসা বা পরামর্শ থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুণ ইমেইলফেসবুক অথবা ফোন করুণ +০৯৬৩৯০০৬৬২২ নম্বরে।

বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন বিষয়ক ভিডিওঃ