ব্লাড সুগার এর মোটাদাগে অর্থ দাঁড়ায় রক্তে যে চিনি আছে। তাহলে রক্ত কি মিষ্টি জাতীয় কিছু? তা তো না। অথচ এই নামে মিষ্টি কাজে মিষ্টিহীন নিরস ব্যাপারটার কারণে ডায়াবেটিস রোগ বাধিয়ে বসেছে যায়েদ। ডায়াবেটিস এমন কোনো রোগ নয় যেটার বিষয়ে যায়েদ আগে শোনেনি। কিন্তু এই ব্লাডসুগার বেড়ে ডায়াবেটিস হবার ব্যাপারটা কেমন যেন গোলমেলে লাগছে তার কাছে। 

বয়স যে খুব বেশি তার সেরকমও না। সবে ত্রিশের কোঠায় পা দিয়েছে সে। কিন্তু এটুকু সে জানে ডায়াবেটিস যে কোনো বয়সের যে কারোই হতে পারে। তবে আজ সে জানতে চাচ্ছে মূলত ডায়াবেটিসের পেছনের এই ব্যাপারটা, যাকে সবাই ব্লাড সুগার বলে। 

নিজের ল্যাপটপটা কোলের উপর নিয়ে বসলো সে। আজ ছুটির দিন, তাই নিজের শারীরিক সমস্যা বিষয়ে ইন্টারনেটে একটু গভীরভাবে খোঁজ করার সিধান্ত নিয়েছে সে।  ডায়াবেটিসের উপর সরাসরি বেশ কিছু লেখা পাওয়া গেলেও ব্লাড সুগার বা রক্তের গ্লূকোজের পরিমাণ বেড়ে যাবার বিষয়ে গোছানো লেখা পাচ্ছিলোনা সে। অবশেষে এনজাইম নামের বাংলা একটা ওয়েবসাইটে দেখলো যেখানে এ বিষয়ে গুছিয়ে লেখা আছে। প্রথম তার চোখে পড়লো এর সংজ্ঞায়। 

ব্লাড সুগার (Blood Sugar) কী?

ব্লাড সুগার

মানুষের রক্তে গ্লুকোজ বা সুগারের মাত্রাকেই ব্লাড সুগার বলা হয়ে থাকে। প্রতিটি মানুষের রক্তে নির্দিষ্ট ঘনত্বের সুগার বা শর্করা বিদ্যমান থাকে। শারীরিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে রক্তে ব্লাড সুগার কম বা বেশি হতে পারে।

 তার ধারনা একেবারে ভুল না দেখে মৃদু হাসলো যায়েদ। নিচের লেখা ব্যাখা পড়ায় মন দিলো।  

কারো ডায়াবেটিস সমস্যা থাকলে এর ফলে তাঁদের শরীরে  ইনসুলিন হরমোনের নিঃসরণ কমে যায়। এই ইনসুলিন মূলত আমাদের দেহের কোষে গ্লুকোজ পৌঁছে দেয়ার কাজ করে। মানবদেহের কোষ গ্লুকোজ ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করে, যার মাধ্যমে আমরা প্রতিদিনের সব কাজকর্ম করতে পারি। দেহে ইনসুলিন কম তৈরি হলে স্বভাবতই আক্রান্ত ব্যক্তির দৈনন্দিন কাজে অসুবিধার সৃষ্টি হয়ে থাকে। 

আঙ্গুলে সূচ ফুটিয়ে ব্লাডসুগারের পরিমাণ জানার ব্যবস্থা আছে সেটা যায়েদ জানে। তার নিজেরও তো সেভাবেই পরীক্ষা করা লাগছে গত কয়েকদিন। রক্তে ব্লাড সুগারের পরিমানের ভিত্তিতে যেহেতু ডায়াবেটিস আছে কি না, অথবা কি অবস্থায় আছে সেটা জানা যায়, যায়েদ সেই চার্টটা একবার দেখে নেয়ার আগ্রহ বোধ করলো। diabetes.co.uk এর ওয়েবসাইট থেকে সে তার কাঙ্ক্ষিত চার্টটি খুঁজে পেলো। 

ব্লাড সুগার (Blood Sugar) তালিকাঃ

ডায়াবেটিসের ধরণখাবার ৮ ঘণ্টা পর / ঘুম থেকে ওঠার পরখাবার গ্রহণের পূর্বেখাবার গ্রহণের কমপক্ষে ২ ঘণ্টা পরে
ডায়াবেটিস না থাকলেপ্রযোজ্য নয়৪ থেকে ৫.৯ mmol/L৭.৮ mmol/L থেকে কম
শিশুদের টাইপ ১ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে৪ থেকে ৭ mmol/l৪ থেকে ৭ mmol/l৫ থেকে ৯ mmol/l
প্রাপ্তবয়স্কদের টাইপ ১ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে৫ থেকে ৭ mmol/l৪ থেকে ৭ mmol/l৫ থেকে ৯ mmol/l
টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রেপ্রযোজ্য নয়৪ থেকে ৭ mmol/l৮.৫ mmol/l থেকে কম
*শুধুমাত্র “ডায়াবেটিস না থাকলে” অংশটি বাদে বাকি তালিকাটি NICE কর্তিক প্রস্তাবিত এবং ডায়াবেটিস না থাকলে অংশের তথ্যটি নেয়া হয়েছে diabetes.co.uk থেকে

ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো যায়েদের ভেতর থেকে। ভালোই তো ছিলো। সব চলছিলো ঠিকঠাক মতই। এখন এমন রোগ বাধিয়েছে যার জন্যে ব্লাড সুগার টেস্ট ছাড়াও বেশ কিছু নিয়ম তার মেনে চলতে হচ্ছে এবং চলতে হবে ভবিষ্যতেও। ডাক্তারের কাছে যেতে প্রথমে সে রাজি হচ্ছিলো না। কিন্তু যায়েদ যখন তার শারীরিক সমস্যাগুলো তার অফিসের ডাক্তারকে জানায়, তখন তিনি যায়েদকে ডায়াবেটিস টেস্ট করাতে এবং একজন ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে বলেন। সেই সাথে বলেন যায়েদ নিজে ইন্টারনেটে এ ব্যাপারে তথ্য খুঁজে দেখতে পারে। 

সেদিনই বাসায় এসে ইন্টারনেটে এই ব্যাপারে পড়তে বসে যায়েদ। 

রক্তে সুগারের পরিমাণ বেড়ে যাবার কিছু লক্ষনঃ 

১. রক্তে সুগারের পরিমাণ বেড়ে যাবার অন্যতম প্রধান লক্ষণ এই অবসন্ন ভাব। শরীরে অতিরিক্ত সুগার জমা হলে ক্লান্ত লাগে, রক্তে সুগারের পরিমাণ কমে গেলেও অবসন্ন ভাব লাগতে পারে। 

২. চোখে ঝাপসা দেখার সমস্যাও রক্তে সুগারের মাত্রা বেড়ে যাবার কারণে দেখা দিতে পারে। ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রনে না রাখলে অথবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না করালে এর ফলে চোখে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া রক্তের সুগারের মাত্রা বেড়ে গেলে চোখে ছানি আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়।

৩. যদিও মাথা ব্যাথা একটি সাধারণ সমস্যা কিন্তু বাকি লক্ষণগুলোর সাথে মিলিয়ে মাথা ব্যাথা হতে থাকলে সেটা ব্লাড সুগার বৃদ্ধির লক্ষণ হতে পারে। এটি আসলে রক্তের সুগারের পরিমাণ বৃদ্ধির একটি প্রাথমিক লক্ষণ।এই মাথাব্যাথা দীর্ঘস্থায়ী হয় যা কয়েকদিন থেকে এক সপ্তাহ পর্যন্তও স্থায়ী হতে পারে।   

৪. ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ আসা,  ডায়াবেটিসের সর্বাধিক প্রচলিত লক্ষণটি মূলত ব্লাড সুগার বৃদ্ধিরও অন্যতম লক্ষণ। ইনসুল উৎপাদন কমে গেলে শরীর যখন অতিরিক্ত সুগারের ব্যবস্থা করতে পারে না, তখন সেই চাপ যেয়ে পরে কিডনিতে। যার ফলে এই সমস্যা দেখা দেয়। ব্লাড সুগার বৃদ্ধির ফলে এই ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়ার বিষয়টিকে পলিউরা বলা হয়ে থাকে।

৫. অতিরিক্ত পিপাসা পাওয়া, এই লক্ষণটিও ডায়াবেটিসের সাথে সম্পর্কিত এবং উপরের পয়েন্টের সাথেও এর যোগাযোগ রয়েছে। এই পিপাসা পাওয়া ব্লাড সুগার বেড়ে যাবার একটি লক্ষণ বলে বিবেচিত হয়। ঘন ঘন মুত্র ত্যাগের ফলে গলা শুকিয়ে যায় এবং পানি পান করার প্রয়োজন পরে। অতিরিক্ত পানি পিপাসা পাওয়ার এই সমস্যাকে পলিডিপসিয়া বলে।

৬. হাত এবং পায়ের আঙুল থেকে শুরু করে পুরো হাত বা পায়ে অবশ বোধ করা ব্লাড সুগার বৃদ্ধির আরো একটি লক্ষণ। পরিস্থিতি গুরুতর আকার ধারণ করলে মূলত এই লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

৭. কোনো ধরণের ডায়েট বা ব্যায়াম না করেও অধিক পরিমাণে ওজন কমতে থাকা রক্তে সুগারের মাত্রা বেড়ে যাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

৮.  শরীরের কোথাও কেটে শুকাতে প্রয়োজনের তুলনায় অধিক সময় লাগার বিষয়টি ব্লাড সুগার বৃদ্ধির একটি অন্যতম লক্ষণ।

এই লক্ষণগুলোর অনেকগুলোই যায়েদের শারীরিক অবস্থার সাথে মিলে যায়। তবু চিকিৎসকের কাছে যাবার আগে অনলাইনে যাচাই করার উদ্দেশ্যে এনজাইম সিম্পটম চেকার নামের একটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন ব্যবস্থায় নিজের তথ্য দিয়ে, ফলাফলে তার ডায়াবেটিস হবার সম্ভবনা আছে এই উত্তর পেলো। 

এটুকু দেখার পর সেদিনের মত খোঁজ খবর করায় ইতি টানলো সে। বিকেলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে যেয়ে খাবার অর্ডার করার সময় একটু দ্বিধাবোধ করতে লাগলো সে। সেটা দেখতে পেয়ে সাথের এক ডাক্তার বন্ধু জিজ্ঞাস করলো, “কি হয়েছে কোনো দিন তো তোকে খাবার অর্ডার করতে দেরী করতে দেখি নাই? আজকে এমন কি হলো যে এতো ভেবেও বের করতে পাড়ছিস না কি খাবি?”

একটু মনমড়া হয়ে নিজের বর্তমান অবস্থার কথা বন্ধুর কাছে খুলে বলতেই সে বন্ধুটি যায়েদকে বললো, “সেটা বললেই হতো। মাত্র ধরা পড়েছে বলে এতো বিচলিত হচ্ছিস, নিয়ন্ত্রণে রেখে চলতে থাক। দেখবি কিচ্ছু সমস্যা হবে না। কোন খাবারে ব্লাড সুগার বাড়ে সে বিষয়ে একটা লেখা তোকে পাঠাচ্ছি পড়ে দেখ, নিজেই আইডিয়া করে নিতে পারবি। “

যেসব কারণে রক্তে সুগারের পরিমাণ বাড়তে পারে:

  • অধিক পরিমাণে শর্করা জাতীয় খাবার (ভাত, বিরিয়ানি, রুটি, পরোটা) গ্রহণ করলে। 
  • তৈরিকৃত মিষ্টি জাতীয় খাবার যেমন – কেক, আইসক্রিম, সফট ড্রিঙ্ক, জেলি, চিনি যুক্ত চা বা ফলের জুস ইত্যাদি নিয়মিত খাবারের তালিকায় রাখলে। 
  • মাখন, ছানা, ঘি বা রেড মিট অধিক পরিমাণে গ্রহন করলে। 
  • নিয়মিত ফার্স্টফুড বা চাইনিজ খাবার গ্রহণের অভ্যাস থাকলে। 
  • দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম না হলে। 
  • অধিক পরিমাণে দুশ্চিন্তা করলে। 
  • কলা, তরমুজ ইত্যাদি মিষ্টি ফল যেগুলো পুষ্টিগুণে সমিদ্ধ হলেও প্রচুর গ্লুকোজ থাকার কারণে ব্লাড সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।   
  • শারীরিক পরিশ্রম না হলে রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকে না। 

বাসায় এসে তবু মনটা খুঁতখুঁত করতে লাগলো। রোগ যেহেতু হয়েই গেছে সে নিয়ে মন খারাপ করে বসে না থেকে তাই কিভাবে ব্লাড সুগারকে নিয়ন্ত্রনে রাখা যায় সেটা নিয়ে বিস্তারিত পড়তে বসলো যায়েদ। যে চিকিৎসকের কাছে যায়েদ গিয়েছিলো, তিনি কিছু ঔষধের সাথে ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখার উপর একটা লিফলেট দিয়েছিলেন। সেটাই যায়েদ মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করলো।  

ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখার কিছু হেলথ টিপসঃ 

  • নিয়মিত ব্লাড সুগার পরীক্ষা করা এবং সেই পরিমাপ নজরদারিতে রাখা। কারণ নির্দিষ্ট পরিমানের অধিক বা কম কোনো মাত্রার ব্লাড সুগারই এ ক্ষেত্রে ভালো নয়।  
  • শরীরে ব্লাড সুগারের পরিমাণের উপর নির্ভর করে খাদ্য তালিকা তৈরি করা এবং সেই তালিকা কঠোর ভাবে অনুসরন করা। 
  • প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করা এবং কোনো ঔষধ সেবন করতে বলা হয়ে থাকলে সেটি নিয়মিত গ্রহণ করা।
  • সক্রিয় কাজে অংশগ্রহণ করা বা নিয়মিত ব্যায়াম করা।
  • নির্দিষ্ট সময়ে খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস করা এবং কোনো বেলার খাবার গ্রহণ খাদ্য তালিকা থেকে বাদ না দেয়া। 
  • অন্য যে কোনো ধরণের তরলের তুলনায় অধিক পরিমাণে সুপেয় পানি পান করার অভ্যাস করা। 
  • মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রনের জন্যে পছন্দের কাজে ব্যস্ত থাকা, পরিবার ও বন্ধুদের সময় দেয়া, যোগব্যায়ামের অভ্যাস করা। 
  • যেহেতু ঘুমের সমস্যার কারণে ব্লাড সুগার বৃদ্ধি পাবার আশঙ্কা থাকে, তাই পরিমিত এবং নিরবিচ্ছিন ঘুম যাতে হয় সেদিকে খেয়াল রাখা। 
  • নিয়মিত ওজন পরিমাপ করা এবং নিয়ন্ত্রনে রাখার চেষ্টা করা।

হেলথ টিপস পড়া শেষ করে যাবেদ নিজেকে বোঝালো আগামী কাল থেকে এই নতুন জীবনধারা তার মেনে চলতে হবে, হয়তো প্রথম প্রথম কিছুদিন নিয়মগুলো মেনে চলতে সমস্যা হতে পারে, কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা মানিয়ে নিতে পারলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।

ডায়াবেটিস সিরিজের প্রথম পর্ব – ডায়াবেটিস – ভয়, আতঙ্ক ? না নিয়ন্ত্রণ যোগ্য কোনো রোগ ? ব্লগটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে

টাইপ ১ ডায়াবেটিস ও টাইপ ২ ডায়াবেটিস এর পার্থক্য সেই সাথে ডায়াবেটিস থাকলে কোন রোগ হবার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় সে বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন টাইপ ১ ডায়াবেটিস ও টাইপ ২ ডায়াবেটিস এর পার্থক্য কী ? ডায়াবেটিস থাকলে কোন রোগ হবার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় ? ব্লগটি।

ডায়াবেটিস জনিত কিডনির রোগ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন ডায়াবেটিস জনিত কিডনির রোগ (Diabetic kidney disease) – নিয়ন্ত্রণ না করলে যে রোগ ঘটাতে পারে মৃত্যু পর্যন্ত ব্লগটি।

ব্লাড সুগার অথবা ডায়াবেটিস সম্পর্কে আপনার কোনো জিজ্ঞাসা বা পরামর্শ থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুণ ইমেইল, ফেসবুক অথবা ফোন করুণ +০৯৬৩৯০০৬৬২২ নম্বরে।

ব্লাড সুগার বিষয়ক ভিডিওঃ

ব্লাড সুগার বিষয়ক সংক্ষিপ্ত বিবরনী ভিডিও