মাইগ্রেইন- শুধুই কি মাথাব্যাথা ?

মাথায় একটা ঘোলাটে ব্যাথা নিয়ে ঘুম ভাঙলো শাওনের। ঘরের ভারি পর্দাগুলো সমান ভাবে টানা থাকায় বাইরের রোদ ঘরে ঢোকার উপায় নেই। কিন্তু শাওন বেশ বুঝতে পারছে বাইরে ভালোই বেলা হয়ে গেছে। গতরাতে এই মাথাব্যাথার কারনেই অনেক দেরি করে ঘুমাতে গিয়েছিলো সে। বেশ কয়েকদিন হয়ে গেল কিন্তু যাবার নাম নেই এই বিচ্ছিরি মাথা ব্যাথার। 

মাথার তালুর দিকের একটা নির্দিষ্ট অংশে ব্যথাটা হচ্ছে তার। কেমন একটা ধপধপ অনুভূতি সেটা। মনে হয় মাথার ওই জায়গাটায় বুঝি হৃদপিণ্ডের মতন লাফাচ্ছে। প্রথম দিকে এই ব্যাথাটাকে  খুব একটা পাত্তা দেয়নি শাওন। সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা যাচ্ছে, লেখাপড়ার চাপের কারণে মাথা ব্যাথা হচ্ছে হয়তো। একটু রেস্ট পেলেই কমে যাবে।কিন্তু ব্যাথা কমার জায়গায় যেন দ্বিগুণ হয়েছে সেটা। ঘরের জানালা দিয়ে আসা সূর্যের আলো কিনবা হঠাৎ করে বেজে ওঠা মোবাইলের শব্দে কেমন একটা স্পর্শকাতর অনুভুতি হচ্ছে। গতকাল রাতে ব্যাথার কারণে পেট নেড়ে বমিবমি ভাব হচ্ছিলো ভীষণ। তাই ঘুমাতে পারছিলো না। 

ঘুম ভেঙ্গে গেলেও বিছানায় শুয়েই থাকলো শাওন। মোবাইলে ফেসবুক স্ক্রল করতে যেয়ে চোখে পরলো এনজাইম বাংলাদেশ নামের পেইজের একটা বিজ্ঞাপন। শিরোনামে লেখা, “নিজের শারীরিক সমস্যার লক্ষন থেকে নিজেই নিজের রোগ সম্পর্কে জানুন” । মাথার ব্যাথাকে উপেক্ষা করে বিছানায় উঠে বসে বিজ্ঞাপনটা বিস্তারিত ভাবে পরে নিলো সে।

কিছুক্ষন পরে ফ্রেশ হয়ে এসে এনজাইমের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলো শাওন। রোগ নির্ণয়ের জন্যে বেশ ভালো একটা ব্যবস্থা দিয়েছে তারা। বেশ সহজেই এনজাইম সিম্পটম চেকার ব্যবহার করে, কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়ে কোন রোগ তার হয়ে থাকতে পারে সে বিষয়ে একটা ধারনা পেয়ে গেল শাওন। এনজাইম সিম্পটম চেকারের ভাষ্য অনুযায়ী শাওনের মাইগ্রেইন (Migraine) সমস্যা হবার সম্ভবনা রয়েছে। সামনের দেয়ালের দিকে কিছুক্ষন শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে শাওন ভাবলো এই “মাইগ্রেন” শব্দটা সাথে সে বেশ পরিচিত হলেও, এই সমস্যার লক্ষন, কারণ, সমাধান কোনটাই সে পরিষ্কার ভাবে জানে না।

প্রথমেই সে দেখে নিলো মাইগ্রেইন আসলে কী?

মাইগ্রেইন কী?

মাইগ্রেইন

মাইগ্রেনের ফলে মাথার একটি নির্দিষ্ট অংশে ব্যথা অনুভুত হয় এবং সেই সাথে মাথায় ধপ্‌ধপ্‌ ধরনের অনুভূতি সৃষ্টি হয়।

অনেক ক্ষেত্রে এ সমস্যার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির আলো বা শব্দের প্রতি অত্যাধিক সংবেদনশীলতা বা স্পর্শকাতরতা দেখা দেয়।

মাইগ্রেইন অ্যাটাক কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েকদিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। কখনো কখনো মাইগ্রেইনের ব্যথা হওয়ার আগে বা ব্যথা হওয়ার সময় কিছু উপসর্গ দেখা দেয় যা Aura নামে পরিচিত। এই উপসর্গগুলো হলো চোখের সামনে আলোর ঝলকানি দেখা, বিন্দু বিন্দু দেখা বা হাতে ও পায়ে শিরশির অনুভূতি হওয়া।

মাইগ্রেইন সমস্যার লক্ষনগুলো কি সেটা নিয়ে একটু গুগল সার্চ করলো শাওন।

মাইগ্রেইন এর লক্ষনসমূহঃ

মাইগ্রেইন, মাথাব্যাথা

তালিকায় থাকা লক্ষনগুলোর অন্তত চারটা তার নিজের লক্ষনের সাথে মিলে যাচ্ছে। এবার ঠিক কি কারণে মাইগ্রেন সমস্যা হতে পারে সেটা জানার আগ্রহ বোধ করলো শাওন। কয়েকটা ওয়েবসাইট ঘেটে সে পেলোঃ 

মাইগ্রেইন সমস্যার সাধারণ কারণসমূহঃ

  • লবণযুক্ত ও প্রক্রিয়াজাত (Processed) খাবার খাওয়া।
  • দৈনন্দিন খাদ্যাভাসে অনিয়ম দেখা দেওয়া।
  • অ্যালকোহল গ্রহণ (বিশেষ করে ওয়াইন ও ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় পানের অভ্যাস থাকা)।
  • কাজের চাপ ও দুশ্চিন্তা।
  • তীব্র আলো বা সূর্যালোক, উচ্চশব্দ, পারফিউম বা রঙের তীব্র গন্ধ ও সিগারেটের ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসা।
  • নির্দিষ্ট কিছু ঔষধ গ্রহণ, যেমন- জন্ম বিরতিকরণ পিল, ভ্যাসোলিডেটর ও নাইট্রোগ্লিসারিন।

পড়া লেখার চাপের ব্যাপারটা নিজের সাথে মিলিয়ে নিতে পারলো শাওন। রাত জেগে পড়া লাগে বলে প্রচুর চা-কফিও খায় সে সারা রাত ধরে। লবণযুক্ত আর লবণ মুক্ত খাবারের ব্যাপারে তার তেমন কোন উৎসাহ নেই। যেটা যেভাবে পায় সেভাবেই খেয়ে অভ্যস্থ। কাজেই এই ব্যাপারটা নিশ্চিত করে বোঝা যাচ্ছে না। সূর্যের আলো আর শব্দে যে সমস্যা হচ্ছে সেটাও এখানে আছে দেখা যাচ্ছে। নিজের মাথার ভেতরে এই চিন্তাগুলোই ঘুরপাক খাচ্ছিলো শাওনের। তবে দিন দিন ব্যাথাটা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে দেখে ডাক্তার দেখাবে বলে মনস্থির করলো সে।

এনজাইমের যে ওয়েবসাইটটা তাকে রোগ নির্ণয় করে দিয়েছিলো, দেখা যাচ্ছে সেখানেই ডক্টর সার্চের ব্যবস্থাও আছে। নিজের এলাকার ভিত্তিতে ডাক্তার খুঁজে নিতে শাওনের খুব বেশি হলে তিন মিনিট সময় লাগলো। ডাক্তারের সাথে কিভাবে যোগাযোগ করবে সেটা নিয়ে বিস্তারিত জানতে যেয়ে শাওন আবিষ্কার করলো এনজাইম থেকে ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেয়াও সম্ভব। দেশি একটি কোম্পানীর এতো সূক্ষ্ম কাজ দেখে নিজের কাছেই ভালো লাগলো শাওনের। এনজাইম পেশেন্ট কেয়ারে একটা ফ্রি একাউন্ট খুলে সেদিন বিকেলের জন্যে একজন ডাক্তারের কাছে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নিলো সে।

ডাঃ মুহাইমিনের চেম্বার শাওনের বাসা থেকে দশ মিনিটের হাঁটা পথ। শীতের দিন, রোদ একটু কমে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করে পায়ে হেঁটেই ডাক্তারের চেম্বারে যেয়ে উপস্থিত হলো শাওন। কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পর চেম্বারে তার ডাক পরলো। মাঝ বয়সী হাসিখুশি মানুষ ডাঃ মুহাইমিন। শাওনকে বসতে বলে তার সমস্যার ব্যাপারে বিস্তারিত জেনে নিলেন। সাথে দুই একটা প্রশ্ন করলেন,

ব্যথা হওয়ার আগে বা ব্যথা হওয়ার সময় কিছু বিশেষ উপসর্গ দেখা দিয়েছে কিনা, যেমন – চোখের সামনে আলোর ঝলকানি দেখা, বিন্দু বিন্দু দেখা বা হাতে ও পায়ে শিরশির অনুভূতি হওয়া। 

তিনি জানালেন এই উপসর্গ দেখা দেয়ার বিষয়টার আলাদা নাম রয়েছে। যা Aura নামে পরিচিত।  

আরো দুই একটা প্রশ্ন করে শাওনের জন্য প্রেসক্রিপশন লিখতে শুরু করলেন ডাঃ মুহাইমিন।

কথা প্রসঙ্গে তাঁর কাছ থেকে জানা গেল,

পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের এই সমস্যা দেখা দেয়ার সম্ভবনা কিছুটা বেশি। যদিও শৈশবে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের মাথাব্যথার সমস্যা বেশি হয়ে থাকে, কিন্তু বয়ঃসন্ধি ও এর পরবর্তী সময়ে মেয়েদের এই সমস্যা বেশি হতে দেখা যায়।

রোগ শনাক্ত করার জন্যে শাওন এনজাইম সিম্পটম চেকার (Enzaime Symptom Cheaker) ব্যবহার করেছে শুনে হাসি মুখে ডাক্তার বললেন, “ভাবতেই ভালো লাগে আমাদের দেশটাও হেলথ সেক্টরে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে। এনজাইমের কাজের ধরণ দেখে ভালো লাগাতেই আমিও ওদের ডক্টর পোর্টালে রেজিস্ট্রেশন করেছিলাম।“ এটুকু বলে আবারো মাইগ্রেন বিষয়ে আলোচনায় ফিরে এলেন তিনি। 

সেই আলোচনায় মাইগ্রেনের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাপারগুলো নিয়ে ডাঃ মুহাইমিনের কাছ থেকে বেশ কিছু তথ্য জানা গেল। 

যে সব বিষয় মাইগ্রেইন এর ঝুঁকি বৃদ্ধি করেঃ

  • ধারনা করা হয় এই সমস্যা বংশগত ভাবে হয়ে থাকে। পরিবারের কারো মাইগ্রেনের সমস্যা থাকলে অন্যদের এই রোগ হবার সম্ভবনা থাকে। মাইগ্রেইনে আক্রান্ত প্রায় ৯০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায় তাদের পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য আগে থেকেই একই সমস্যায় ভুগছেন। বিশেষ করে বাবা-মা যে কারো অথবা দুজনেরই যদি মাইগ্রেইনের সমস্যা থাকে তাহলে সন্তানের এই রোগ হবার ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়।
  • বয়স মাইগ্রেইন অ্যাটাকের ক্ষেত্রে অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়। যদিও মাইগ্রেইনের সমস্যা যেকোনো বয়সে শুরু হতে পারে তবে দেখা গেছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিকালে প্রথম মাইগ্রেইন অ্যাটাক হয়ে থাকে।
  • শরীরে হরমোনগত পরিবর্তনের ফলেও মাইগ্রেনের সমস্যার তারতম্য হতে পারে।

প্রেসক্রিপশন লেখা শেষ করে ডাক্তার শাওনকে জিজ্ঞাস করলেন তার কিছু জানার আছে কি না।

শাওন প্রশ্ন করলো,

মাইগ্রেন কি শরীরের অন্য কোন রোগের লক্ষণ হতে পারে?

জবাবে ডাঃ মুহাইমিন বললেন,

এ্যালার্জি হলে মাইগ্রেইনের সমস্যা হতে পারে। এমনকি দাঁতের গঠনের কারণে খাবারে কামড় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেও মাইগ্রেইনের ব্যথা শুরু হতে পারে।  এই সমস্যা আসলে সরাসরি ভাবে কোন মানুষের জীবনযাত্রার সাথে সম্পর্কযুক্ত না।

উত্তরটা বুঝতে পেরে উৎসাহের সাথেই দ্বিতীয় প্রশ্ন করলো শাওন।

আচ্ছা স্যার, সূর্যের আলোর কারণে কি মাইগ্রেন অ্যাটাক হতে পারে?

ডাঃ মুহাইমিন উত্তরে জানালেন,

যেকোনো উদ্দীপকের (stimulator) প্রভাবে মাইগ্রেনে আক্রান্ত ব্যক্তির  এই অ্যাটাক হতে পারে। সূর্যের আলো একটি মাত্র উদ্দীপক।  তীব্র সূর্যের আলোতে মাইগ্রেনের ব্যথা শুরু হতে পারে। এই সমস্যা থেকে বাঁচতে অনেকে সানগ্লাস ব্যবহার করে।

এবার প্রেসক্রিপশনটা দেখে নিয়ে শাওন ডাঃ মুহাইমিনের কাছে তার শেষ প্রশ্নটা করলো।

স্যার মাইগ্রেইনের ব্যথা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ কোন হেলথ টিপস থাকলে যদি বলতেন, খুব ভালো হতো।

ডাক্তার এবার শাওনের জন্যে লেখা প্রেসক্রিপশনের সাথে একটা হেলথ টিপস লিফলেট যুক্ত করে দিলেন। শাওন নতুন কাগজটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বুঝতে পারলো এই জিনিসটাই সে চাচ্ছিলো।

মাইগ্রেইন বিষয়ক হেলথ টিপসঃ

  1. মাইগ্রেন অ্যাটাক দেখা দিলে বিভিন্ন মাসল রিলাক্সেশন এক্সারসাইজ (muscle relaxation exercise) করা যেতে পারে। যেমন-
  •  মেডিটেশন বা যোগব্যায়াম
  • প্রগ্রেসিভ মাসল রিলাক্সেশন (progressive muscle relaxation) (যা মাথা ব্যথার তীব্রতা কমাতে সাহায্য করে)।
  1. পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে ঘুমের পরিমাণ বেশি না হয়। সঠিক সময়ে ঘুমানোর সাথে সাথে সঠিক সময়ে ঘুম থেকে ওঠার নিয়মও মেনে চলতে হবে।
  2. মাথা ব্যথা যাতে তীব্র না হয় তাই হালকা মাথাব্যথা হলেই কোলাহল মুক্ত কোন স্থানে বিশ্রাম নিতে হবে। রুমের আলো কমিয়ে নিতে হবে।
  3. পাতলা কাপড়ে অল্প পরিমাণ বরফ জড়িয়ে ঘাড় ও মাথায় ম্যাসাজ করা যেতে পারে।

ডাক্তারের কাছ থেকে পাওয়া পরামর্শ আর ঔষধগুলো কাজে লাগিয়ে যত দ্রুত সম্ভব এই মাইগ্রেইন নামের আপদকে বিদায় করতে হবে মাথা থেকে। সামনের রবিবারেই তো আবার পরীক্ষা। এই কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই বাসার দিকে পা বাড়াল শাওন। 

স্বাস্থ্য বিষয়ে আমাদের অন্যান্য ব্লগগুলো পড়তে ঘুরে আসুন আমাদের ব্লগসাইটের হোমপেজ থেকে।

মাইগ্রেইন সম্পর্কে আপনার কোনো জিজ্ঞাসা বা পরামর্শ থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুণ ইমেইল, ফেসবুক অথবা ফোন করুণ +০৯৬৩৯০০৬৬২২ নম্বরে।