“ মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া (Bleeding gums) সমস্যায় ভুগছেন? “

বিশাল এক ক্যানভাসে বড় করে এই লেখার পাশে ফোলা মুখে হাত দিয়ে দুঃখী চেহারার এক মডেলকে ড্যাব ড্যাব করে তার দিকেই যেন তাকিয়ে থাকতে দেখলো মিশা। মনের সুখে ছোলা চিবুতে চিবুতে পার্কের পাশের ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো সে। ভার্সিটির ক্লাস শেষে দুই বন্ধু মিশা আর শান্ত বাস থেকে নেমে এই পথেই হেঁটে বাড়ি ফেরে। নতুন বসানো বিলবোর্ডটা দুইজনেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। 

ঠোঙ্গা থেকে আড় কয়টা ছোলাবুট বের করে মুখে পুরে দিয়ে শান্ত বললো, “এই দাঁত আর মাড়ির সমস্যা খুব খারাপ, জীবন শেষ করে ফেলে একবারে।” “কেন? তোর হয়েছিলো নাকি?” জিজ্ঞাস করে মিশা। জবাবে মুখে একটা যন্ত্রনার ছাপ ফুটিয়ে তুলে শান্ত বলে, “হ্যাঁ, তখন কলেজে ছিলাম, আমারও মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়তো। বিচ্ছিরি অবস্থা!” 

“কাহিনী কি? খুলে বল ” জোর গলায় বললো মিশা। পার্কের শেষ মাথায় চলে এসেছে তারা ততক্ষনে। “ভয়ানক অভিজ্ঞতা রে, সময় লাগবে সব বলতে” উত্তর আসে শান্তের কাছ থেকে। “ আচ্ছা সর্টকাটে শুনবো, চল বসি ওই বেঞ্চটাতে।” বলে বেঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলো মিশা। অজ্ঞতা শান্তও পা বাড়ালো সে দিকে। নিজের অভিজ্ঞতা বলার আগে মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া সমস্যাটার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ মিশাকে শোনালো শান্ত। 

মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া (Bleeding gums) কী?

মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া (Bleeding gums)

মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া (Bleeding gums) মূলত মাড়ির এক ধরনের প্রদাহ। মাড়িতে কোনো ধরনের প্রদাহ হলে তাকে জিঞ্জিভাইটিস (Gingivitis) বলা হয়। যার কারণে মাড়ি লাল হয়ে যাওয়া, ক্ষত সৃষ্টি হওয়া, হালকা থেকে তীব্র ব্যথা অনুভুত হওয়া এবং মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। 

মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়ার পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে মাড়ি দূর্বল হয়ে যাওয়া, এর ফলে ব্রাশ বা ফ্লস করার সময় মাড়ি থেকে রক্ত পড়ে। এর সাথে সাথে মাড়ির টিস্যু ফুলেও যেতে পারে। 

অকপটে শান্ত স্বীকার করলো যে সে নিয়মিত দাঁত মাজতে চাইতো না, জাঙ্ক ফুড, কোল্ড ড্রিঙ্কস এগুলো প্রচুর পরিমানে খেতো। আর শুরুর দিকে ব্যথা হবার পরও এদিকে খেয়াল করে নি। পরে সমস্যা অনেক বেড়ে যাবার পর ডেন্টিস্টের কাছে যেয়ে দির্ঘ সময় চিকিৎসা করাতে হয়। 

“আচ্ছা এই সমস্যা হবার পেছনে আর কি কারণ থাকতে পারে?” প্রশ্ন মিশার। এবার একটু ঝামেলাতেই পরলো শান্ত। এতো বিস্তারিত তো সে জানে না। তাই ফোন বের করে গুগলে সার্চ করলো এই বিষয়ে। একেবারে প্রথমেই তার সামনে এলো বাংলায় লেখা একটা ব্লগ। অবাক হয়ে সেই বল্গে ঢুকলো সে। এনজাইম নামের একটা ওয়েবসাইটে থাকা ব্লগটায় একেবারে গুছিয়ে সব লেখা আছে। সেখান থেকে শান্ত পড়ে শোনালো, 

যে সব কারণে মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া সমস্যা দেখা দিতে পারেঃ 

  • মাড়ির রোগ (Gum disease)
  • ব্রোকেন টুথ (Broken tooth)
  • ফ্র্যাকচার অফ দি জো (Fracture of the jaw)
  • হিমোফিলিয়া (Hemophilia)
  • সিস্টিক ফাইব্রোসিস (Cystic fibrosis)
  • থ্রম্বোসাটোপেনিয়া (Thrombocytopenia)
  • লিউকেমিয়া/ব্লাড ক্যান্সার (Leukemia)

এটুকু পড়ে সাথে থাকা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়ার লক্ষণগুলোও একে একে পড়ে শোনালো সে মিশাকে। 

মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া (Bleeding gums)

মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়ার লক্ষণসমূহঃ 

  • দাঁতের ব্যথা (Toothache)
  • মাড়িতে ব্যথা (Gum pain)
  • জ্বর (Fever)
  • মাথা ধরা (Dizziness)দাঁত
  • মুখমণ্ডলে ব্যথা (Facial pain)
  • ঠোঁট ফুলে যাওয়া (Lip swelling)
  • নাক দিয়ে রক্ত পড়া (Nosebleed)

চিন্তিত মুখে সবটা শুনে নিজেকেই বিড়বিড় করে বলতে শোনা গেলো মিশাকে, “তাহলে যে কারো হুশহাশ করে মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া শূরু হতে পারে, নিশ্চই সবার এই রোগ হবার সম্ভবনা এক সমান না। তাই না?” ঝুঁকি কাদের বেশি এই ব্যপারেও এনজাইমের ব্লগটাতে বেশ কিছু পয়েন্ট আলোচনা করা ছিলো সেগুলো থেকে কয়েকটা বিশেষ পয়েন্ট মিশাকে পড়ে শোনালো শান্ত। 

“কই দেখি ? ফোনটা এদিকে দে” বলে শান্তর ফোন নিজের হাতে নিয়ে পুরো তালিকাটা পড়ে দেখলো মিশা। 

মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া রোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি কাদের বেশি? 

  • যারা নিয়মিত দাঁত পরিষ্কার করতে অনীহা প্রকাশ করেন
  • যারা নিয়মিত তামাক বা মাদকদ্রব্য সেবন করেন 
  • যে সকল ব্যক্তিদের ডায়াবেটিস সমস্যা রয়েছে
  • কারও মুখে ভাইরাল এবং ফাঙ্গাল ইনফেকশন থেকে থাকলে 
  • লিউকেমিয়া, এইচ-আই-ভি বা এইডস এ ধরনের দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় 
  • হরমোনগত পরিবর্তনের কারণে।  যেমন- গর্ভাবস্থা, মাসিক চক্র বা জন্মবিরতিকরণ পিলের ব্যবহার
  • কারও দাঁতের গঠনে সমস্যা থাকলে 
  • দীর্ঘদিন পুষ্টিহীনতায় ভুগতে থাকা ব্যক্তি 
  • বিশেষ ধরনের ঔষধ সেবনকারী ব্যক্তি 
  • বয়স্ক ব্যক্তি

“কিন্তু কারো যদি ধর মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া সমস্যা হয়েই যায় তখন তো ডাক্তারের কাছে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এই সমস্যা যাতে না হয় সে জন্যে কি কি করা যেতে পারে? এই বিষয়ে তোর কোনো আইডিয়া আছে?” বেঞ্চ থেকে উঠতে উঠতে জিজ্ঞাস করলো মিশা। “হ্যাঁ, আমি যে ডেন্টিস্টের কাছে গিয়েছিলাম, সেই ভাইয়া আমাকে বলে দিয়েছিলো কি কি করলে মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া সমস্যা হবার ঝুঁকি কমে আসবে।” আবারো বাসার দিকে হাঁটতে হাঁটতে নিজের স্মৃতি থেকে হেলথ টিপসগুলো জানালো শান্ত। 

মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া সমস্যার প্রতিরোধে ব্যবহারের বিশেষ কিছু হেলথ টিপসঃ 

  • সফট হেড বা নরম মাথার টুথব্রাশ ব্যবহার করতে হবে 
  • একটি টুথব্রাশ তিন থেকে চার মাসের বেশি সময় ব্যবহার করা যাবে না 
  • প্লাক ও দাঁতের ময়লা নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে
  • দৈনিক অন্তত দুই বেলা এবং প্রতিবার খাদ্য গ্রহণের পর দাঁত মাজার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে
  • দৈনিক কমপক্ষে একবার ফ্লস করতে হবে
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিসেপ্টিক মাউথওয়াশ ব্যবহার করতে হবে

আলোচনা শেষ, ছোলার ঠোঙ্গাও ফুরিয়েছে আরো আগেই। সে দিনের মত পরস্পরকে বিদায় জানিয়ে যার যার বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলো মিশা আর শান্ত। 

দাঁতের ক্ষয় রোগ (Dental caries) – অবহেলার কারণে যে রোগ নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায় বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আমাদের এই ব্লগটি পড়ে দেখুন।

মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া সমস্যার সম্পর্কে আপনার কোনো জিজ্ঞাসা বা পরামর্শ থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুণ ইমেইল, ফেসবুক অথবা ফোন করুণ +০৯৬৩৯০০৬৬২২ নম্বরে।

স্বাস্থ্য বিষয়ে আমাদের অন্যান্য ব্লগগুলো পড়তে ঘুরে আসুন আমাদের ব্লগসাইটের হোমপেজ থেকে।