মাথা ঘোরানো ! কি এক ঝামেলা ! পৃথিবীতে ঘোরার এতো কিছু থাকতে মাথার ঘোরার দরকারটা কী?  কৌতুকের ছলেই বললেন ডাক্তার সায়েরা। কিন্তু বলা নেই, কওয়া নেই, হঠাৎ করেই মাথা ঘোরানোর সমস্যা শুরু হয় অনেকের। আমরা অনেকে আবার একে তোয়াক্কা না করে যার যার কাজ করে যেতে থাকি, যতক্ষণ পর্যন্ত না সমস্যা বড় আকার ধারণ করে। এটুকু বলে থামলেন তিনি। 

আজ বৃহস্পতিবার। অফিসের শেষ কর্মদিবস। এইদিন অফিসের এক এক টিমকে এক এক বিষয়ে স্বাস্থ্য পরামর্শ দেয়ার নিয়ম আছে সামিয়াদের অফিসে। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা একটু অন্যরকম লাগতো তার কাছে। কিন্তু এখন বেশ ভালোই লাগে। চল্লিশ মিনিটের এই লেকচারে এনজাইম বাংলাদেশ বলে এক সংস্থা থেকে নানান বিষয়ের বিশেষজ্ঞ আসেন প্রতি সপ্তাহে। তবে প্রতি সপ্তাহের সেশনে নাম থাকে না সবার। ঘুরে ঘুরে মাসে দুইবার লেকচার সেশন পরে সবার। 

আজকে যিনি এসেছেন, তিনি বেশ অভিজ্ঞ এবং হাসিখুশি একজন ডাক্তার। দেখেই কেমন একটা ভালোমানুষ ভাব আসে। সামিয়ার অন্তত তেমনই লাগলো। মাথাঘোরানো বা ডিজিনেস Dizziness বিষয়ে আলোচনা চলছে আজকে। প্রজেক্টর স্ক্রিনে বড় করে লেখা উঠে আছে এই সমস্যার ব্যপারে। তবে ডাঃসায়েরা সেদিকে না তাকিয়েই বলে চললেন, 

মাথা ঘোরানো বা মাথা ঘোরা কী?

মাথা ঘোরানো (Dizziness)

মাথা ঘোরানো বলতে দুর্বল অনুভব করা, মাথা হালকা অনুভব করা, মাথা ঝিমঝিম করা,ভারসাম্য হারানো, পড়ে যাওয়ার অনুভূতি হওয়া সেই সাথে শরীর টলমল করার মতো সমস্যাকে বোঝায়। এই সমস্যার কারণে চারপাশের সবকিছু ঘুরছে বা সরে যাচ্ছে বলে মনে হয়।

অনেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিই এই সমস্যায় ভুগে থাকেন। মাথা ঘোরানোর এই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা রোজকার কাজকর্মে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। মাথা ঘোরার কারণ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য লক্ষণের উপর নির্ভর করে কার্যকরভাবে এর চিকিৎসা করা সম্ভব।

এই রোগের সাথে বাদ বাকি সবার মতন সামিয়াও পরিচিত। যদিও তার যে খুব বেশি মাথা ঘোরানোর সমস্যা হয় বা হয়েছে সেটা না। এই কিছুদিন হলো গ্রাজুয়েশন শেষ করে অফিসে জুনিয়র অফিসার হিসেবে যোগ দিয়েছে সে। তবে বাসায় প্রায়ই তার মা আর দাদুকে এই কথা বলতে শোনে সামিয়া। তাই ডাঃ সায়েরা যখন এই রোগের কারণগুলো আলোচনা করা শুরু করলেন, তখন সে মনযোগ দিয়ে এগুলো শুনতে লাগলো। 

মাথা ঘোরানো বা মাথা ঘোরা সাধারণ কিছু কারণঃ 

• ভিটামিন ‘বি’এর অভাব জনিত রোগ (Vitamin B deficiency)
• রক্তস্বল্পতা (Anemia)
• অ্যাঞ্জাইনা (Angina)
• ক্রনিক রিউম্যাটিক ফিভার / ক্রনিক বাতজ্বর (Chronic rheumatic fever)
• মাইগ্রেইন (Migraine)
• হাইপোগ্লাইসেমিয়া (Hypoglycemia)
• আতঙ্কগ্রস্ততা (Panic attack)
• লৌহের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা (Iron deficiency anemia)
• কার্বন মনোক্সাইড পয়জনিং (Carbon monoxide poisoning)
• হিট স্ট্রোক (Heat stroke)
• কন্ডাক্টিভ হেয়ারিং লস (Conductive hearing loss)
• কনকাশন (Concussion)
• পয়জনিং ডিউ টু গ্যাস (Poisoning due to gas)
• ম্যালিগন্যান্ট হাইপারটেনশন (Malignant hypertension)
• অ্যাকিউট স্ট্রেস রিঅ্যাকশন/ডিজঅর্ডার (Acute stress reaction/disorder)

এর মাঝে কিছু রোগের বিষয়ে ধারনা থাকলেও অনেকগুলোর বিষয় তেমন কোনো ধারনা সামিয়ার ছিলো না। তবে ডাঃ সায়েরা সংক্ষেপে বুঝিয়ে বলায় বেশ পরিষ্কার একটা ধারনা হয়ে গেলো সামিয়ার এ ব্যপারে। কারণ শেষ করে অল্প সময়ের বিরতি দিলেন ডাক্তার। জানালেন বিরতির পর মাথা ঘোরানোর লক্ষন নিয়ে আলোচনা করবেন তিনি। 

মিনিট দশেকের বিরতির পর আবার যখন আলোচনা শুরু হলো তখন স্লাইড বদলে মাথা ঘোরানোর লক্ষন বিষয়ে একটা স্লাইড খুলে নিলেন ডাঃ সায়েরা। মাথা ঘোরানোর সাথে সংশ্লিষ্ট লক্ষনগুলো এবার তিনি ব্যখ্যা করা শুরু করলেন। 

মাথা ঘোরানো বা মাথা ঘোরা
মাথা ঘোরানো বা মাথা ঘোরা

মাথা ঘোরানো বা মাথা ঘোরা সংশ্লিষ্ট লক্ষণসমূহঃ 

• মাথা ব্যথা(Headache)

• বমি বমি ভাব (Nausea)

• দুর্বলতা (Weakness)

• বুকের তীক্ষ্ণ ব্যথা (Sharp chest pain)

• বমি (Vomiting) শ্বাসকষ্ট (Shortness of breath)

• অজ্ঞান হয়ে যাওয়া (Fainting)

• বুক ধড়ফড় করা (Palpitations)

• অস্বাভাবিক অনৈচ্ছিক নড়াচড়া (Abnormal involuntary movements)

• নড়াচড়া করতে সমস্যা হওয়া (Problems with movement)

• কানে শোঁ শোঁ শব্দ হওয়া (Ringing in ear)

• অনিয়মিত হৃদস্পন্দন (Irregular heart beat) 

লক্ষন আলোচোনা শেষে ডাক্তার জানালেন এবার তিনি প্রশ্নের ভিত্তিতে কিছু বিষয় আলোচোনা করবেন। কারো কোনো প্রশ্ন থাকলে করতে পারে। সবার আগে প্রশ্ন করলেন সামিয়াদের ডিপার্টমেন্ট হেড, নওশাদ ভাইয়া। উনার মাঝে মাঝেই মাথা ঘোরানোর সমস্যা হয় সেটা সামিয়া অফিসে জয়েন করার পরই দেখেছে। 

ভাইয়ার প্রশ্নটি ছিলো, কোন ধরনের মানুষের মাঝে মাথা ঘোরানোর সমস্যা দেখা দেওয়ার সম্ভবনা বেশী? 

এই প্রশ্নের জবাবে ডাঃ সায়েরা জানালেন, 

যাদের মাঝে মাথা ঘোরানো বা মাথা ঘোরা সমস্যা দেখা দেওয়ার সম্ভবনা বেশীঃ 

  • সাধারণত বয়স্ক ব্যক্তি, বিশেষ করে ষাটোর্ধ ব্যক্তিদের মাঝে মাথা ঘোরানোর সমস্যা অধিক দেখতে পাওয়া যায়। কারণ এই বয়সের ব্যক্তিদের অনেকেই সেই সব রোগে আক্রান্ত হন যেগুলোর প্রধান কারণের মাঝে মাথা ঘোরানোর সমস্যা থাকে। 
  • বিশেষ ধরনের ঔষধ সেবনের কারণে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন –  উচ্চ রক্তচাপ, মৃগী রোগ, স্নায়বিক উত্তেজনা রোধকারী ঔষধ ও সিডেটিভ গ্রহণ করলে মাথা ঘোরার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
  • কারো যদি পূর্বে  মাথা ঘোরার সমস্যা থেকে থাকে সে ক্ষেত্রে পরবর্তীতে যে কোনো সময় এই সমস্যা আবারো তাদের মাঝে দেখা দিতে পারে। 

প্রশ্নের জবাব পেয়ে বেশ সন্তুষ্ট দেখালো নওশাদ ভাইয়াকে। পরবর্তী প্রশ্নের জন্যে এবার সামনের দিকে তাকালেন ডাঃ সায়েরা। সামিয়ার পেছন থেকে শিরিন আপু এবার প্রশ্ন করলেন। প্রশ্ন ঠিক না তিনি পরামর্শ চাইলেন।  মাথা ঘোরানোর সমস্যা যদি কারো থেকে থাকে সে ক্ষেত্রে তাদের জন্যে কি ধরনের হেলথ টিপস রয়েছে তাই জানতে চাইলেন শিরিন আপু। 

ডাঃ সায়েরা হেসে বললেন, হ্যাঁ খুব ভালো একটা ব্যপারে জানতে চেয়েছেন আপনি। আমি এমনিতেও এই বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করতাম। তবে আপনাদের কাছ থেকে প্রশ্নটা আশায় ভালো লাগলো। এ কথা বলে তিনি প্রজেক্টরের স্লাইড পাল্টে নতুন একটা স্লাইড চালু করলেন। যেখানে মাথা ঘোরানোর ব্যপারে বেশ কিছু হেলথ টিপস বুলেত পয়েন্ট আকারে লেখা রয়েছে। 

মাথা ঘোরানো বা মাথা ঘোরা বিষয়ক কিছু হেলথ টিপস্ঃ 

  • খেয়াল রাখতে হবে মাথা ঘোরানোর ফলে শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে যাতে আঘাত না পান, সে জন্যে এই সমস্যা দেখা দিলে প্রয়োজনে কোথাও বসে ধাতস্ত হয়ে নিন। 
  • এই সমস্যা শুরু হলে নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করুণ কারণ স্থান পরিবর্তন করতে গেলে বিপত্তি ঘটার সম্ভবনা বেড়ে যেতে পারে। 
  • মাথা ঘোরানো সমস্যা থাকলে ঘরের মেঝেতে এমন কোনো বস্তু রাখবেন না যা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে,যেমন- ইলেকট্রিক কর্ড বা পিচ্ছিল ম্যাট। 
  • মাথা ঘোরানো আরম্ভ হলে অবস্থান ভেদে সাথে সাথে বসে বা শুয়ে পড়ুন, তা সম্ভব না হলে নির্দিষ্ট স্থানে দাড়িয়ে থাকুন।
  • প্রায়ই মাথা ঘোরানোর সমস্যা থাকলে গাড়ি চালনা বা ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার মত কাজ করবেন না।
  • সিঁড়িতে এবং রাতে বিছানা থেকে উঠে হাঁটার পথে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখুন।
  • শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনে হাঁটার সময় লাঠি ব্যবহার করুন।
  • ক্যাফেইন, অ্যালকোহল ও তামাক গ্রহণ করা পরিহার করুন। অতিরিক্ত পরিমাণে এসব দ্রব্য গ্রহণের ফলে আপনার মাথা ঘোরানোর সমস্যা বৃদ্ধি পেতে পারে।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং প্রয়োজনে সে অনুযায়ী ঔষধ সেবন করুণ।  

হেলথ টিপসগুলো নিয়ে আলোচনার পর আরো কিছুক্ষন প্রশ্নউত্তোর পর্ব চললো। অবশেষে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে সেদিনের মত আলোচনা শেষ করলেন ডাঃ সায়েরা। আর মাথা ঘোরার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জেনে বাসার দিকে রওনা হলো সামিয়া। 

স্বাস্থ্য বিষয়ে আমাদের অন্যান্য ব্লগগুলো পড়তে ঘুরে আসুন আমাদের ব্লগসাইটের হোমপেজ থেকে।

মাথা ঘোরানো বা মাথা ঘোরা (Dizziness) সম্পর্কে আপনার কোনো জিজ্ঞাসা বা পরামর্শ থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুণ ইমেইল, ফেসবুক অথবা ফোন করুণ +০৯৬৩৯০০৬৬২২ নম্বরে।