বিটিভিতে অনুষ্ঠান হচ্ছিল। গর্ভবতী মায়েদের রক্তস্বল্পতা নিয়ে অনুষ্ঠান। বিকেলে আলসে শরীরে নিজের রুমে বসে সেটাই দেখছিল হাকিম মিয়া। শরীরটা তেমন ভালো না। ইদানিং প্রায়ই আলসেমী লাগে খুব।

লক্ষণ হিসেবে হাকিম মিয়ার তেমন কিছুই না, জাস্ট শারীরিক দূর্বলতা। কোনো কিছু করতেই যেন আর শক্তি পাচ্ছে না। মনোযোগও খুব একটা দিতে পারছিল না। কেমন একটা অবসাদ চেপে ধরে রাখে সব সময়। হাকিম ভেবেছেন যে হয়ত বয়সের কারণে। বুড়ো হলে দূর্বল তো হবেই।

পাশের বাড়ির অল্প বয়স্ক দারোয়ান মালেক বললো, হাকিম ভাই, তুমি ডাক্তারটা দেখায়া ফেলাও। তুমিও দারোয়ানের চাকরি করো, আমিও করি। সারাদিন এমনে শুইয়া থাকলে মালিক তোমারে চাকরিতে রাখবো কও?

হাকিম জিজ্ঞেস করলো, কিন্তু এই লকডাউনের মধ্যে ডাক্তার কই পাই?

মালেক বললো, আরে এহন কি আর সেই যুগ আছে নাকি? এহন ঘরে বইসাই ডাক্তার দেখান যায়।

হাকিম জিজ্ঞেস করলোম, কেমনে?

মালেক বললো, আমিও ঠিক জানি না তয় সেইদন ছোট সাহেব কইতেছিল ফোনে কারে জানি। ঐ সময় শুনছি। তুমি চাইলে আমি হের সাথে কথা বইলা তোমাকে কইতে পারুম।

হাকিম খুব জোর দিলো না কেমন যেন। তো মালেকও আর কথা বাড়ালো না।

তবে ঘটনাটি ঘটলো সপ্তাহ খানেক পরেই।

গোসল থেকে বের হচ্ছিল মাত্র মালেক। ঝট করে কানে আসলো হাকিমদের বাড়ির ওখানে জটলামত। অনেক মানুষ কথা বলছে। দৌড়ে বের হল। বের হয়ে দেখে একটা চেয়ায়ে হাকিমকে বসিয়ে রেখে তাকে ঘিরে ৫/৭ জন লোক দাঁড়িয়ে আছে। একজন মাথায় পানি দিচ্ছে। হাকিম চোখে বুঝে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে।

মালেক আন্দাজ করতে পারলো কী হয়েছে। তারপরেও জিজ্ঞেস করে বুঝতে পারলো যে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল হাকিম। মুখের একপাশ কেটেও গেছে।

মালেক বুঝলো যে এবার ডাক্তারের কাছে না নিলে সমস্যা হয়ে যাবে। বলতে থাকলো, “এরে আমি আগেই কইছিলাম ডাক্তার দেখাইতে। আমার কথা হুনলো না।“

হাকিম দূর্বল স্বরে কিছু বলতে চাইছিল। বোঝা যাচ্ছিল না। মালেক সিদ্ধান্ত নিল এখনই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে।

একটা রিকশা ডেকে কোনো হাসপাতালের নিতে পারলে ভালো হত কিন্তু লকডাউনের কারণে রিকশাও পাওয়া যাচ্ছে না। পুরো রাস্তা ফাঁকা। আর কোনো উপায় না পেয়ে মালেক সিদ্ধান্ত নিল তার ছোট সাহেবের সাথে কথা বলবে।

ছোট সাহেবকে সব খুলে বলার পর, তিনি বললেন, আচ্ছা, আমি দেখছি।

ছোট সাহেবের মোবাইলে আগে থেকেই Enzaime Ltd এর Enzaime Patient Care অ্যাপ ইন্সটল করা থাকায় তিনি সাথে সাথেই Enzaime Emergency-তে নক দিলেন। এখানে ২৪ ঘন্টা ডাক্তার থাকায় সাথেই সাথেই একজনকে অনলাইনে পাওয়া গেলো।

এরপরে মোবাইল নিয়ে দ্রুত মালেক চলে আসলো হাকিমের কাছে।

তারমানে মোবাইলে হাতে ধরে বসে থাকলো। ডাক্তারের সাথে হাকিম কথা বলতে থাকলো।

কিছুক্ষণ কথা বলার পর হাকিমকে ডাক্তার বললেন যে, “আপনার সমস্যাটা আমি ধরতে পেরেছি। এটাকে বলে অ্যানিমিয়া। বাংলায় বলে রক্তস্বল্পতা। মানে আপনার শরীরে রক্ত কমে গেছে।

মানুষের শরীর ঠিকঠাকভাবে চলার জন্য অক্সিজেন লাগে। সেই অক্সিজেন শরীরে পরিবহন করার জন্য প্রয়োজন হয় লোহিত কণিকা। এই লোহিত মানে লাল কণার কারণেই রক্ত লাল দেখা যায়। বুঝতে পেরেছেন?”

হাকিম দূর্বলভাবে মাথা নাড়লো। জিজ্ঞেস করলো, কিন্তু কেন হয় এইটা?

অ্যানিমিয়া কী?

অ্যানিমিয়া হল এমন একটি শারীরিক সমস্যা যার কারণে দেহের টিস্যুতে পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন পরিবহণের জন্য সুস্থ লোহিত কণিকার অভাব বা ঘাটতি দেখা যায়। অ্যানিমিয়া হলে শরীরে ক্লান্তি ও দুর্বলতা দেখা যায়। বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন ধরনের রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। তবে রক্তক্ষরণের জন্য রক্তস্বল্পতা বেশি দেখা যায়। রক্তস্বল্পতা ক্ষণস্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং এর প্রভাব মৃদু বা তীব্র হতে পারে। বিভিন্ন মেডিকেল প্রসিডিউরস এবং ঔষধের মাধ্যমে এর চিকিৎসা করা হয়ে থাকে। স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার মাধ্যমে বেশ কয়েক ধরনের রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করা সম্ভব। গুরুতর কোনো রোগের ফলে রক্তশূন্যতা হয়েছে বলে ধারণা হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিৎ।

রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়ার কারণ

ডাক্তার বললেন, রক্তস্বল্পতা বিভিন্ন কারণে হতে পারে, যেমনঃ

  • শরীর যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে লোহিত কণিকা উৎপাদন করতে না পারা।
  • রক্তক্ষরণের মাধ্যমে রক্তে লোহিত কণিকার পরিমাণ কমে যাওয়া।
  • লোহিত কণিকা উৎপাদনের চেয়ে ধ্বংসের হার বেশি হয়ে যাওয়া।

হাকিম বললো, আমার তো দূর্বলতা ছাড়া আর কোনো সমস্যা নাই। দূর্বলতা তো বিভিন্ন কারণেও হইতে পারে। রক্তস্বল্পতা বুঝলেন কেমনে?

রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়ার লক্ষণ

ডাক্তার বললেন, আপনি ভালো প্রশ্ন করেছেন। আমি বুঝতে পেরেছি আপনার সাথে কথা বলে আর আপনার আপনার কাছ থেকে লক্ষণগুলো জেনে। রক্তস্বল্পতার যে লক্ষণগুলো আছে সেগুলো হচ্ছেঃ

  • অবসাদ
  • দুর্বলতা
  • মাথা ধরা
  • শ্বাসকষ্ট
  • নাক দিয়ে রক্ত পড়া
  • কালো বর্ণের মল
  • রক্তবমি
  • মল দেখতে অস্বাভাবিক লাগা
  • চুল পড়ে যাওয়া
  • শরীর ও চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া।
  • বুক ধড়ফড় করা।
  • দুর্বলতা ও সামান্য পরিশ্রমে হাঁপিয়ে যাওয়া এবং ব্যায়ামের পর শ্বাসকষ্ট হওয়া।
  • কানে ঝিঁঝিঁ শব্দ শোনা।
  • খাবারে অরুচি ও ক্ষুধামন্দা।
  • নখ ভঙ্গুর হওয়া বা নখের আকৃতি চামচের মতো হওয়া।
  • কাজকর্ম-পড়ালেখায় অমনোযোগী হওয়া।
  • অপ্রত্যাশিত মাসিক
  • মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ

আপনার মধ্যে উপরের এই লক্ষণগুলোর অনেকগুলোই আছে। সেজন্য প্রাথমিকভাবে আমি ধরে নিচ্ছি আপনার এই সমস্যাই হয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়সমূহ

ডাক্তার সাহেব বলতে থাকলেন, যে যে বিষয়ের কারণে রক্তস্বল্পতা হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় সেগুলো হল:

  • যেসব খাবারে আয়রন, ভিটামিন এবং ফলিক এ্যাসিডের পরিমাণ কম এমন খাবার খেলে রক্তস্বল্পতা বেশি হয়।
  • ক্ষুদ্রান্ত্রের ব্যাধি যেমন সিলিয়াক ডিজিজ থাকলে ক্ষুদ্রান্ত্র পুষ্টি ঠিকমত শোষণ করতে পারে না। এই জন্য রক্তস্বল্পতার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
  • যেসব মহিলার মেনোপজ সঠিক সময়ে হয় না তাদের ঋতুস্রাবের সময় রক্তের সাথে লোহিত কণিকা অধিক পরিমাণে নির্গত হয়। তাই এদের রক্তস্বল্পতা হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
  • বিভিন্ন ক্রনিক ব্যাধি যেমন ক্যান্সার, কিডনি, লিভার ফেইলর বা অন্য কোনো ক্রনিক অবস্থার কারণে রক্তস্বল্পতা হয়ে থাকে।
  • যদি বাবা-মায়ের রক্তস্বল্পতা থাকে তবে সন্তানেরও রক্তস্বল্পতা হতে পারে।
  • বিভিন্ন ইনফেকশন, রক্তের ব্যাধি, অটোইমিউন ব্যাধি, মাদকাসক্তি, বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে থাকা এবং  লোহিত কণিকার জন্য ক্ষতিকর এমন কোনো ঔষধ গ্রহণ করলে রক্তস্বল্পতার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

হাকিম জিজ্ঞেস করলো, ডাক্তার সাহেব আমি তো অশিক্ষিত মানুষ, আমি তো এত কথা আসলে বুঝি না। আমার মধ্যে কি এই ঝুঁকি আছে?

যারা রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়ার ঝুঁকির মধ্যে আছে

ডাক্তার বললেন, পুরুষদের মধ্যে এই রোগ হবার সম্ভাবনা মহিলাদের তুলনায় কম। কিন্তু সবারই এটা হতে পারে।

রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়ার চিকিৎসা

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করা যায় না, তবে যে ধরনের রক্তস্বল্পতা আয়রন এবং ভিটামিনের অভাবে হয় অর্থাৎ অপুষ্টিজনিত কারণে হয় সেগুলো ভিটামিনযুক্ত এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এসব খাবারের মধ্যে রয়েছে-

  • আয়রনযুক্ত খাবার, যেমন- মাংস, শিম, ডাল, আয়রন-সমৃদ্ধ শস্য, সবুজ শাক-সবজি এবং ড্রাই ফুড।
  • ফলিক এসিড জাতীয় খাবার, যেমন- টক জাতীয় ফলমূল, এর নির্যাস বা জুস, কলা, সবুজ শাক-সবজি, উদ্ভিজ্জ বীজ, রুটি, শস্য এবং পাস্তা।
  • ভিটামিন বি ১২ যুক্ত খাবার, যেমন- মাংস এবং দুগ্ধজাতীয় খাবার।
  • ভিটামিন সি-যুক্ত খাবার, যেমন- টক জাতীয় ফলমূল, তরমুজ, বেরি প্রভৃতি।

আপনাকে আমি একটা ট্যাবলেট দিচ্ছি। এটা আপনার অয়রনের ঘাটতি কমাবে। নিয়মিত খাওয়া দাওয়া করবেন আর নিয়মিত ঘুমাবেন। দেখবেন কদিন পরেই সব ঠিক হয়ে গেছে।

এতক্ষণ পরে হাকিমের মুখে একটু হাসি দেখা গেলো।

ডাক্তার বললেন, একদমই ভয় পাবেন না। যা যা বললাম সেগুলো মেনে চলেন। এরপরে ১৫ দিন পরে আমার সাথে আবার যোগাযোগ করবেন। ঠিক আছে?

– জ্বি আচ্ছা।