রমজান মাসে সঠিক উপায়ে সিয়াম সাধনা এবং সকল ইবাদত করার জন্যে শারীরিক ভাবে সুস্থ্য থাকা অত্যন্ত জরুরী একটি বিষয়। গ্রীষ্মের প্রখর গরমের মাঝে সারাদিনের রোজা রেখে ইফতারে আমরা অনেক সময় ঐতিহ্যগত কারণে এমন সব খাবার খেয়ে থাকি যেগুলো আমাদের শরীরে বিরুপ প্রভাবের সৃষ্টি করে। শুধু তাই নয় সঠিক নিয়ম অনুযায়ী খাবার না খাওয়ার ফলে শারীরিক অস্বস্তি, বদহজম ছাড়াও নানান ধরণের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

রমজানের খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমেই সুস্থ থেকে এবং ইবাদত সঠিক ভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। সিয়াম সাধনার এই মাসে কোন খাবারগুলো আমাদের দৈনিক খাবারের তালিকায় রাখা উচিৎ সে বিষয়ে নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

রমজানের খাদ্য তালিকায় যা কিছু রাখতে পারেন

  • খাদ্য তালিকায় প্রথমেই আসে খেজুর বা খোরমা। শরীরের জন্যে উপকারী বহুউপাদান যেমন, কার্বোহাইড্রেট, সুগার, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, কপার, সালফার, ম্যাঙ্গানিজ, সিলিকন, ক্লোরিন ফাইবার ইত্যাদি রয়েছে খেজুর এবং খোরমাতে।
  • সারাদিনের রোজার শেষে ইফতারের সময় থেকে সেহরি পর্যন্ত পান করুণ কমপক্ষে আট থেকে দশ গ্লাস সাধারণ তাপমাত্রার পানি। এই পানি আপনার হজমে সহায়তা ছাড়াও শরীরকে ডিহাইড্রেট হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করবে।
  • তরল পানীয় যেমন ফলের শরবত, দৈয়ের শরবত, রুহ-আফজা ইত্যাদি রাখতে পারেন আপনার তালিকায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে স্বাদ বাড়ানোর জন্যে উপাদান যেমন – চিনি, দুধ ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে না।
  • ইফতার, সন্ধ্যারাতের খাবার অথবা সেহরি সকল ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যেন খাদ্য তালিকায় থাকে সুষম খাবার। আমিষ, শর্করা, চর্বি, ভিটামিন, দুধ, দই, মিনারেল, আঁশ ইত্যাদি মিলেই সুষম খাবার তৈরি করে।
  • মৌসুমী তাজা ফল এবং বিভিন্ন রকমের সবজি বা সবজি দিয়ে তৈরি খাবার যুক্ত করুণ রমজানের খাদ্য তালিকায়। নিয়মিত ফল ও সবজি গ্রহণ কোষ্ঠকাঠিন্যের মতন সমস্যা থেকে মুক্ত থাকতে সহায়তা করবে।
  • পেট এবং শরীরকে ঠান্ডা রাখার জন্যে খেতে পারেন সহজে হজমযোগ্য খাবার যেমন, দই, চিড়া ইত্যাদি। এই খাবার একই সাথে যেমন আপনার পেট ভরতে সাহায্য করবে তেমনি সহজে হজম হবে। 
  • ছোলা রোজার সময় এবং এর বাইরেও অনেকে খেয়ে থাকেন। শরীরের জন্যে বেশ উপকারী এই ছোলা আপনি রাখতে পারেন আপনার খাবারের তালিকায়। তবে খেয়াল রাখতে হবে যে তেলে ভুনা করা মসলা যুক্ত ছোলা থেকে কাঁচা ছোলা খাবার অভ্যাস করা ভালো।
  • রমজান মাসে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের ফলে অনেকের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দেখা দেয়। সে ক্ষেত্রে ইসবগুল পানির সাথে মিশিয়ে পান করতে পারেন।
  • ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার যেমন লাল আটা, বাদাম, ছোলা, ডাল ইত্যাদি রমজান মাসের খাদ্য তালকায় যুক্ত করতে পারেন। এ খাবারগুলো হজম হতে বেশ সময় লাগে তাই পেট ভরা থাকে দীর্ঘক্ষন।
  • গরমের দিনে রোজা রাখার ফলে অনেক সময় শারীরিক ভাবে দুর্বলতা অনুভূত হতে পারে, সে ক্ষেত্রে ইফতারে পান করতে পারেন ডাবের পানি বা খাবার স্যালাইন।
  • সকল পুষ্টিগুণ সম্পন্ন তরলদুধ বা দুগ্ধজাত স্বাস্থ্যকর খাবার রাখতে পারেন আপনার রমজানের খাদ্য তালিকায়।

রমজানের খাদ্যাভ্যাস কেমন হতে পারে আর সে তালিকায় যুক্ত করতে পারেন কোন খাবার সে হিসেব তো জানা হলো, চলুন এবার দেখি কোন খাবারগুলো রমজানের খাদ্য তালিকা থেকে আমাদের বাদ দেয়া উচিৎ। এই সব খাবার হয়তো খুবই সুস্বাদু, মুখরোচক এবং আমরা ঐতিহ্যগত ভাবে খেয়ে আসছি বহুকাল ধরে। কিন্তু সুস্থ্যতা এবং শারীরিক প্রশান্তির জন্যে এই খাবারগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো হবে।

রমজানের খাদ্য তালিকা থেকে যা কিছু বাদ দিতে পারেনঃ

  • চিনি ও চিনিযুক্ত খাবার রমজানের খাদ্যাভ্যাস থেকে সরিয়ে দিয়ে হবে। চিনি যেহেতু রক্তে সুগারের মাত্রা এবং শরীরের ওজন বৃদ্ধি করে এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে, তাই শুধু রমজান মাসেই নয় সম্ভব হলে একেবারেই খাদ্য তালিকা থেকে এই চিনিযুক্ত খাবার বাদ দিতে পারা ভালো।
  • পরিহার করতে হবে ডুবোতেলে ভাজা খাবার, যেমন: ছোলা ভুনা, পেঁয়াজু, বেগুনি, চপ এবং ইফতারের মুখরোচক সব ঐতিহ্যবাহী খাবার।
  • গুরুপাক বা ভারী খাবার যেমন, হালিম, বিরিয়ানি, পোলাও, গ্রিল-নান ইত্যাদি যতটা সম্ভব এড়িয়ে চল্তে হবে এই রমজান মাসে। কারণ এই ধরনের খাবার হজম করা রমজান মাসের নাজুক পাকস্থলীর জন্য বেশ কষ্টসাধ্য।
  • রমজানের খাদ্য তালিকায় আমিষের জন্যে প্রতিবেলায় মাংসের উপর নির্ভরশীল না থেকে অনন্ত একবেলা মাছ রাখার চেষ্টা করতে হবে।
  • কেক, পেস্ট্রি, পাউরুটির মতন খাবারগুলো পেটে গ্যাসের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, তাই রমজানের সময়টাতে এই খাবারগুলো যতটা সম্ভব কমিয়ে খাওয়া ভালো হবে।
  • অধিক পরিমাণে লবণ গ্রহন করলে শরীরে পানির চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং অধিক পিপাসা পেতে পারে। তাই রমজানে লবণ যতটা সম্ভব কম গ্রহণ করা উচিৎ।
  • কোমল পানীয় শারীরিক নানান সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। করে তাই শুধু রমজান মাসের জন্যে বা সম্ভব হলে একেবারেই এই পানীয় গ্রহণ ত্যাগ করার চেষ্টা করতে হবে।
  • ক্যাফেইন পানীয় যেমন চা, কফি ইত্যাদি পান রমজান মাসে কমিয়ে আনতে হবে যাতে পানিশূন্যতা, কোষ্ঠকাঠিন্য, ঘুমের সমস্যা দেখা না দেয়।
রমজানের খাদ্যাভ্যাস থেকে সরিয়ে ফেলুন গুরুপাক সব খাবার

রমজান মাসে অথবা সারা বছর ডায়েট চার্ট তৈরি করে অনুযায়ী খাবার গ্রহণ করা আমাদের জন্যে জরুরী। এনজাইম ওয়েবসাইটে আপনি পাবেন নিজের শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী ডায়েটচার্ট তৈরি করার সুযোগ।

শুধু রমজানের খাদ্যাভ্যাস নয় বরং এর বাইরেও মেনে চলার জন্যে কিছু সাধারণ স্বাস্থ্য টিপস থাকছে আপনাদের জন্য। যে টিপসগুলো খেয়াল রাখলে আশা করা যায় আপনারা নির্বিঘ্নে সুস্থ্যভাবে রমজান মাস কাটাতে পারবেন।

রমজান মাসে মেনে চলার জন্য কিছু বিশেষ টিপসঃ

  • ইফতারের সময় হঠাৎ করে অধিক পরিমাণে খাদ্য গ্রহণ করবেন না, এতে অস্বস্তিবোধ ছাড়াও হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
  • পরিমানের চেয়ে অধিক বা কম সেহরি গ্রহণ করলে শারীরিক দুর্বলতা দেখা দিতে পারে তাই সে ব্যাপারে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে।
  • রমজান মাস ধূমপান বর্জনের জন্যে আদর্শ সময়। তাই নিজের সুস্থার জন্যে ধূমপান বর্জনের জন্যে এ সময়টি বেছে নিতে পারেন।
  • পানি, খেজুর , স্যুপ অথবা সালাদের মতন খাদ্য দ্রুত ক্ষুধা মিটায় তাই এগুলো আগে খেয়ে নিলে বাকি খাবার মাগরিবের নামাজ আদায়ের পর খেতে পারেন। এর ফলে আপনার হজম প্রক্রিয়া ভালোভাবে হবে।
রমজানের খাদ্যাভ্যাসে যুক্ত করুণ মুখরোচক কিন্তু স্বাস্থ্যকর সব খাবার

স্বাস্থ্য বিষয়ক আরো তথ্য আর আমাদের অন্য সব ব্লগ পড়তে ঘুরে আসুন এনজাইম ব্লগের হোমপেজ থেকে।