সারা বছরের দৈনিক নিয়ম বেশ কিছু উপায়ে পরিবর্তন হয় এই রমজানের সময়। খাবারের সময়ের পরিবর্তন থেকে ঘুমানোর সময়ের পরিবর্তন, কাজের রুটিন থেকে মানসিক অবস্থা সব কিছুতেই পরিবর্তন আসে এই সময়টাতে।

আর সে জন্যেই বাকি বছরের জীবনধারা বা লাইফ স্টাইল থেকে বেরিয়ে এসে এই সময়টাতে আমাদের কিছু নিয়ম মেনে চলা উচিৎ। যাতে করে আমরা সুস্থ্য দেহে রমজানের আমেজের সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারি। চলুন জেনে নেয়ার চেষ্টা করি রমজান মাসে যে নিয়মগুলো মেনে চলা আমাদের জন্যে হতে পারে উপকারী।

রমজানে হাতের কাছে রাখুন পানযোগ্য পানিঃ  

সুস্থ্য থাকার জন্যে সব সময়ই শরীরের আর্দ্রতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরী। বিশেষ করে প্রচন্ড গরমের এই সময়টাতে এই বিষয়ে নজর রাখা দরকারী। রমজান মাসে যেহেতু সারা দিন কোন ধরণের তরল আমাদের শরীর পায় না, সে কারণে ইফতারের সময়ের পর থেকে সেহরির সময় পর্যন্ত চেষ্টা করুণ হাতের কাছে সুপেয় পানির ব্যবস্থা রাখার। সবচেয়ে ভালো হয় হাতের কাছে এক বোতল পানি রাখতে পারলে। সে ক্ষেত্রে পানি পান করার কথা সহজে মনেও পরবে আর শরীরও শুষ্কতা থেকে রক্ষা পাবে অনায়াসে।

রমজানে অতিভোজন থেকে বিরত রাখুন নিজেকেঃ

রোজার সময় অনেকের মনে হয়ে থাকে সারা দিন না খেয়ে থাকার ফলে শরীর থেকে মেদ তো ঝড়েই যাচ্ছে, তাই সন্ধ্যায় ভুরিভোজ করতে দোষ কি? কিন্তু এই ভুরিভোজ বা অতিভোজনের কারণে রোজা রেখেও সেই সব মানুষের ওজন তো কমেই না, বরং রমজান মাসের শেষে দেখা যায় ওজন বেড়ে গেছে কয়েক কেজি। সে কারণে রমজান মাসের সংযমের তালিকায় যুক্ত করুণ “অতিরিক্ত খাবার থেকে নিজেকে সংযম রাখা” কে।

ইফতার বা সেহরির জন্যে নির্বাচন করুন স্বাস্থ্যকর খাবারঃ

ঐতিহ্যগত ভাবে কিনবা স্বাদের জাদুর কারনেই হোক আমাদের অনেকেরই রমজানের খাবারের তালিকায় ভাজা-পোড়া ও তৈলাক্ত খাবার রাখার অভ্যাস রয়েছে। কিন্তু ডুবো তেলে ভাজা আলুর চপ, পিঁয়াজু, বেগুনী অথবা গুরুপাক খাবার যেমন, তেহারী, বিরিয়ানী, মোগলাই ইত্যাদি খেলে শারীরিক অস্বস্তি ছাড়াও হজমের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

সে জন্যে চেষ্টা করতে হবে সেহরি এবং ইফতারিতে এমন খাবার রাখার যেগুলো শরীরকে ঠাণ্ডা রাখে এবং হজমের জন্যে সহজ হয় যেমন – দই-চিড়া, ফল বা সবজির সালাদ, সাদা ভাত, কম মসলা যুক্ত মাছ-মাংসের তরকারি ইত্যাদি।   

দিনে অন্তত ২০ মিনিট সময় ব্যয় করুণ শারীরিক পরিশ্রমের জন্যে

রমজান মাসে দৈনন্দিন কাজের তালিকায় আসে নানান পরিবর্তন। ঘরের কাজ থেকে শুরু করে অফিসের কাজ কিনবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সব কিছুতেই সেই পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। রমজানের দিনগুলোতে শরীরের সাথে সামঞ্জ্যস্য রাখতে অনেক কাজ বাকি সারা বছরের মতন করা হয় না। কিন্তু রমজানের করনীয় কাজের তালিকায় অবশ্যই রাখতে হবে কমপক্ষে ২০ মিনিটের ব্যায়াম বা হাঁটার সময়।

দেহকে চাঙ্গা রাখতে এবং সক্ষম রাখতে কমপক্ষে এই ২০ মিনিটের শারীরিক কসরত আমাদের অবশ্যই করতে হবে।

নিয়ন্ত্রনে রাখার চেষ্টা করুণ ভারী কাজঃ

রমজান মাসে রোজা রাখার ফলে শরীর স্বাভাবিকভাবেই ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই রোজা রাখার সময়টাতে ভারী কাজ বর্জন করুন।

যদিও প্রয়োজনের তাগিদে যে সব কাজ করা লাগে সেই কাজ থেকে বিরত থাকা সম্ভব হয় না, কিন্তু তারপরও রমজান মাসে যেহেতু আমাদের শরীর সাধারণ সময়ের তুলনায় ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে থাকে তাই ভারী কাজকর্ম এ সময় যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে।   

স্বল্প সময়ের জন্যে পাওয়ার ন্যাপ নিনঃ  

রোজা রেখে সারাদিন কাজে ব্যস্ত থাকলে শরীর অনেক সময় প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে পরে। তখন শরীর খারাপ লাগা থেকে শুরু করে অন্য শারীরিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। রমজানের এই সময়টায় দুপুরের কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়ে নিতে পারলে বা পাওয়ার ন্যাপ নিতে পারেন।  

চিনি অথবা চিনিযুক্ত খাবার পরিহার করুনঃ 

চিনি বা চিনিযুক্ত খাবার শরীরের জন্যে সবসময়ই মারাত্মক ক্ষতিকর। কোলেস্টেরল বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি, ডায়েবেটিসের সমস্যা তৈরি করার মতন নানান স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে থাকে এ জাতীয় খাবার। রমজান মাসে শরবত, কোমল পানীয় অথবা বিভিন্ন স্পেশাল আইটেমে আমাদের চিনি খাবার প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু নিজেকে শারীরিক সমস্যা থেকে দূরে রাখতে হলে রমজানে অথবা রমজানের পরে সবসময়ই চিনিযুক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।

খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে সময় নিন এবং ধীরে গ্রহণ করুণঃ

অনেক সময় তাড়াহুড়ার কারণে আবার অনেক সময় বেশি ক্ষুধার্থ থাকার ফলে আমরা খুব দ্রুত খাবার খেয়ে থাকি। কিন্তু এই কাজ করা আসলে মোটেও উচিৎ নয় কারণ সারাদিন রোজা রাখার পরে হঠাৎ করে দ্রুত খাদ্য গ্রহণের ফলে শ্বাস নালীতে আটকে যাওয়া, খাবার ঠিক ভাবে হজম না হাওয়া সহ বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

সে জন্যে রমজানের খাবারের সময়গুলোতে সময় নিতে ধীরে চিবিয়ে খাবার গ্রহনের অভ্যাস করতে হবে। এতে যেমন খাবারের স্বাদ পাওয়া যাবে সঠিক ভাবে তেমনি খাবার হজমও হবে সহজে।

নিয়মিত নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি পান করুণঃ

নিজের দেহকে সুস্থ রাখার জন্যে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করার কোন বিকল্প নেই। বিশেষ করে গরমের দিনে এবং এই রমজান মাসে পানি পান করার পরিমাণ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরী। অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইফতারের সময় থেকে সেহরি পর্যন্ত ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি পান করা উচিৎ। তবে শরীরে আদ্রতা অক্ষুন্ন রাখতে শুধু পানি পান করতে হবে এমন নয়, স্বাস্থ্যকর তরল পানীয় যেমন ফলের শরবত, দৈয়ের শরবত ইত্যাদি রাখা যেতে পারে এই তালিকায়।

রমজানে সেহরি করুণ সময়মত

সেহরির সময় খাওয়া কোন ভাবেই বাদ দেবেন নাঃ

পুরো বছরের সাথে বিশেষ এ মাসের অন্যতম পার্থক্য এই সময়টায় আমরা সন্ধ্যা থেকে ভোররাত পর্যন্তই খাওয়াদাওয়া করে থাকি। আর এই খাবার দিয়েই সারাদিনের শরীরের পুষ্টির চাহিদা মিটে থাকে। তাই সেহরির সময়ে খাবার খাওয়া কোন ভাবেই বাদ দেয়া উচিৎ নয়। না খেয়ে রোজা রাখা বা সন্ধ্যা রাতের পর আর কিছু না খাওয়ার অভ্যাস পরিহার করে রমজান মাসে সেহরির সময় খাবার অভ্যাস করুণ।

সেহরির খাবারের তালিকায় যাতে  পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টি উপাদান থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন এবং সেহরির খাবারে কার্বোহাইড্রেট, আঁশযুক্ত খাবার এবং প্রোটিন উপাদান যেন থাকে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করুণ।

যতটা সম্ভব ক্যাফেইন থেকে দূরে থাকুনঃ

আমাদের অনেকেরই চা-কফি ইত্যাদি ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় পানের অভ্যাস রয়েছে। নিয়মিত সময়ের বিরতিতে এই সব ক্যাফেইন পানীয় সারা বছর ধরে খাওয়া হলেও রমজান মাসে চা-কফি খাবার সময় পাওয়া যায় কেবলমাত্র ইফতার থেকে সেহরির মাঝে। প্রথমত খালি পেটে চা-কফি পান করা কোন ভাবেই উচিৎ নয় তাই ইফতার, সেহরি খাবার পরে প্রয়োজনে ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় পান করুণ। তবে সবচেয়ে ভালো হয় যদি রমজান মাসে চা-কফি থেকে নিজেকে দূরে রাখা যায়। কারণ এই সময়ের নাজুক পাকস্থলির জন্যে ক্যাফেইন জাতীয় পানীয় সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। তাছাড়া অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করলে হজমের সমস্যা, অনিদ্রা সমস্যা ছাড়াও শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে।  

শারীরিক অবস্থা বুঝে রোজা রাখুনঃ

প্রতিটি মানুষের স্বাস্থ্যের অবস্থা ভিন্ন। সেই সাথে প্রত্যেকের শারীরিক সমস্যার ধরণ আলাদা। তাই রোজা রাখার ক্ষেত্রে নিজের শরীরের অবস্থা অবশ্যই আগে বিবেচনা করে নেয়া প্রয়োজন। কোন ধরণের অসুস্থতা অনুভব হলে অথবা নিয়মিত গ্রহণ করার ঔষধের ব্যাপারে আলোচণার জন্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিৎ।

স্বাস্থ্য বিষয়ক আরো তথ্য পেতে, নিজের শারীরিক সমস্যা অনুযায়ী রোগ নির্নয় করতে অথবা নিজের ডায়েট চার্ট নিজে তৈরি করতে ভিজিট করুণ এনজাইম ওয়েবসাইটে।