স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাকের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে আজকের ব্লগটি লেখার পেছনে মূল কারণটি হচ্ছে, স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাক সম্পর্কে আমাদের মধ্যে থাক ভুল ধারনাগুলর অবসান ঘটানো।

স্ট্রোক সম্পর্কে একটি ভুল ধারনা আমাদের প্রায় সবার মধ্যেই আছে। যেমন আমরা বলি ব্রেইন স্ট্রোক। এটি বলা যে ভুল তা নয় তবে এটি একটি বাহুল্য। কারণ স্ট্রোক মানেই মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। ফলে ব্রেইন স্ট্রোক বলা অনেকটা “পায়ে পা ব্যথা হচ্ছে” বলার মত। পা ব্যথা বললেই হয়। একইভাবে স্ট্রোক বলা মানেই মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা রক্তনালী বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ব্রেইন আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই।

আবার অনেকের মুখে “হার্ট স্ট্রোক”-এর কথাও শোনা যায়। স্ট্রোক কখনও হার্ট মানে হৃদপিন্ডে হয় না। হার্ট ফেইলিওর হতে পারে তবে হার্টে স্ট্রোক হয় না। এটিও স্ট্রোকের একটি ভুল ব্যবহার।

তবে নামের ব্যবহারে ভুল হলেও স্ট্রোকের ভয়াবহতা তো আর তাতে কমে না! ফলে আমাদেরকে জানতে হবে স্ট্রোক কী। কেন হয়। আর কিভাবেই স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো যায়।

এছাড়াও স্ট্রোককে হার্ট অ্যাটাক বলা বা হার্ট অ্যাটাককে স্ট্রোক বলার ভুলও আমরা করে থাকি। আজকের ব্লগ আমরা এই দুটো কী এবং এগুলোর মধ্যকার পার্থক্যটা সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারনা প্রদান করবার চেষ্টা করবো।




স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাকের মধ্যে পার্থক্য কী?

স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাকের মধ্যে পার্থক্য

একবারেই মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে, স্ট্রোক হবে মস্তিষ্কে আর হার্ট অ্যাটাক হবে হৃদপিন্ডে।

পুরো বিষয়টি ভালো করে বোঝার জন্য আসুন স্ট্রোক সম্পর্কে একটু জেনে নেই।

স্ট্রোক কী?

স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটকের পার্থক্য

খুব সহজভাবে বললে, রক্তনালীতে রক্ত জমাট বেঁধে বা রক্তনালী ছিড়ে যাবার কারণে কারণে মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় সেটিই স্ট্রোক।

স্ট্রোক মূলত দুই ধরণের। হেমোরেজিক স্ট্রোক। রক্তনালী ছিড়ে গেলে এটি হয়। দ্বিতীয়টি হচ্ছে ইসকেমিক স্ট্রোক। রক্ত জমাট বেঁধে রক্তনালী আটকে গেলে এটি হয়। হেমোরেজিক স্ট্রোক সাধারণ অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হয়।



একটি বাজারের কথা ধরুন। আপনি প্রতিদিন সকালে বাজার থেকে আপনার প্রয়োজনীয় রসদ জোগাড় করেন। একদিন বাজারে রসদ আসলো না। যদি আমরা চিন্তা করি কেন আসলো না তাহলে মোটা দাগে দুটো কারণের কথা চিন্তা করতে পারি।

১. যে রাস্তা দিয়ে বাজারের রসদ বোঝাই গাড়িগুলো আসছিল সেগুলো রাস্তায় প্রচুর জ্যাম থাকার কারনে আটকে যাওয়ায় আসতে পারলো না, অথবা

২. যে রাস্তা দিয়ে আসছিল সেগুলোর কোনো একটির সেতু ভেঙে যাওয়ায় গাড়িগুলো আসতে পারলো না।

এবার তাহলে রসদ না আসলে আপনি কী সমস্যায় পড়তে পারেন সেটি বিবেচনা করি আমরা।

১. বাজার না থাকায় আপনি সেদিন বাজারে গিয়ে বাজার করতে পারলেন না।

২. অফিসে না খেয়ে গেলেন।

৩. বাসায় সবাই না খেয়ে থাকলো।

৪. অফিসে খালি পেতে যাওয়ার আপনার মেজাজ খারাপ থাকলো। কাজ ভাল করে করতে পারলেন না।

৫. বাসায় এসেও মেজাজ খিটখিটে। বাসাতে ঝগড়া হলো।

আমরা জানি এগুলো হবে না এবং হবার কোনো কারণ নেই তবুও উদাহরণটি আমরা এভাবে দিলাম যাতে স্ট্রোকের বিষয়টি সহজে বুঝিয়ে বলা যায়।

এবার তাহলে স্ট্রোকের বিষয়ে ফিরে আসি।

ধরে নিন, যে গাড়িগুলো আসতো সেগুলো হচ্ছে পুষ্টি।

যে রাস্তা ধরে আসতো সেগুলো হচ্ছে রক্তনালী।

আর বাজারটি হলো মস্তিষ্ক।

এবার আমরা তাহলে পুরো ঘটনাটিকে খাপে খাপে মিলিয়ে নেই।

রক্তনালীতে (রাস্তায়) করে পুষ্টি (গাড়ি রসদ) আনার সময় কোনো কারনে রক্তনালী বন্ধ হয়ে (জ্যামে আটকে) গেলে কিংবা রক্তনালী ফেটে গেলে (সেতু ভেঙে পড়লে) মস্তিষ্কে (বাজারে) পুষ্টি (গাড়ি) আসতে পারবে না।

এতে কী হবে? এতে করে মস্তিষ্কের কাজ করার জন্য যে প্রয়োজনীয় পুষ্টি মস্তিষ্কের কোষগুলোর প্রয়োজন সেটি সে পাবে না। কিছুটা বাজারে কোনো পণ্য খুঁজে না পাওয়া আপনার মত। ফলে মস্তিষ্কের কোষগুলো মারা যাবে। শরীরের অন্যান্য কোষের তুলনায় মস্তিষ্কের কোষ অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে মারা যায়। ফলে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই কোষগুলো মারা যায়। এই সম্পূর্ণ ঘটনাটিই স্ট্রোক।

স্ট্রোক কয় ধরনের

স্ট্রোক দুই ধরণেরঃ রাস্তা বন্ধ অর্থাৎ রক্তনালী আটকা পড়ে গেলে (সাধারণত রক্ত জমাট বেধে আটকে গেলে) যখন রক্ত যাতায়াত করতে পারে না তখন যে স্ট্রোক হয় সেটি, যার মেডিকেল নাম ইসকেমিক (Ischemic) স্ট্রোক।

আর রাস্তা খানাখন্দে ভরে গেলে অর্থাৎ রক্তনালী ফেটে গেলে যা হয় সেটির মেডিকেল নাম হেমোরেজিক (Hemorrhagic) স্ট্রোক। শারীরিকভাবে এই হেমোরেজিক স্ট্রোক বেশি মারাত্মক হয়।

মিনি স্ট্রোক বলে আরেকটি স্ট্রোক রয়েছে যখন রক্ত জমাট বেধে সাময়িকভাবে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এটিকে মেডিকেলের ভাষায় Transient Ischemic Attack (TIA) বলে। এটি সাময়িক এবং মস্তিষ্কে কোনো স্থায়ী ক্ষতি করে না।

এবার চলুন জেনে নেই হার্ট অ্যাটাক সম্পর্কে।

হার্ট অ্যাটাক কী?

সংক্ষেপে বললে, হৃদপিণ্ডে সাময়িকভাবে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়াকে হার্ট অ্যাটাক বলে।

করোনারি আর্টারি বা হৃদপিণ্ডে রক্তসরবরাহকারী ধমনীতে প্রতিবন্ধকতা বা ব্লকেজ তৈরি হলে হৃৎপিণ্ডে স্বাভাবিক রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়। ধমনীর গায়ে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, ফ্যাটি এসিড ও শ্বেত রক্ত কণিকা জমতে শুরু করলে (atherosclerotic plaque) এই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয় এবং হৃৎপিণ্ডে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে সেখানে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। এই সমস্যার কারণে হৃৎপিণ্ডের পেশীর ক্ষতি হয়, এমনকি তা স্থায়ীভাবে নষ্টও হয়ে যাতে পারে।

রোগটি মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (Myocardial infarction), সংক্ষেপে এম-আই (MI) বা একিউট মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (acute myocardial infarction), সংক্ষেপে এ-এম-আই (AMI) নামেও পরিচিত।

হার্ট অ্যাটাকের কারণ, হার্ট অ্যাটাক কেন হয়, হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণসহ রোগটি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন আমাদের ব্লগ হার্ট অ্যাটাক (Heart Attack): হৃদরোগ সিরিজ – পর্ব ৩

স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাকের মধ্যে পার্থক্য

স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের মধ্যে পার্থক্য

তাহলে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, স্ট্রোক হয় মস্তিষ্কে এবং হার্ট অ্যাটাক হয় হৃদপিন্ডে। দুটি ক্ষেত্রেই রক্তনালীতে রক্ত চলা বিঘ্ন ঘটলেও স্ট্রোকের ক্ষেত্রে এই বিঘ্ন ঘটে মস্তিষ্কে আর হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে এটি ঘটে হৃদপিন্ড বা আপনার হার্টে।

আমরা একটি টেবিলের মাধ্যমে এটিকে দেখাতে পারিঃ


হার্ট অ্যাটাক

স্ট্রোক

হৃদপিন্ডের রোগ

মস্তিষ্কের রোগ

রক্তনালী ৭০ ভাগ বা তারও বেশি বন্ধ হয়ে গেলে হয়

রক্তনালী বন্ধ হয়ে গেলে বা ছিড়ে গেলে হয়

শরীরের কোনো অংশ অবশ হবে না

শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যেতে পারে

ব্যথা হয়

সাধারণত ব্যথা হয় না

দ্রুত চিকিৎসা করাতে হয়

চিকিৎসার জন্য কিছুটা সময় পাওয়া যায়

প্রাথমিক পরীক্ষাঃ ইসিজি, কার্ডিয়াক এনজাইম ও ইকো

প্রাথমিক পরীক্ষাঃ সিটি স্ক্যান


হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ফেইলিওর এবং কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের মধ্যে পার্থক্য কী?

এনজাইম ব্লগ বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা পরিচালিত হেলথটেক সলিউশন Enzaime Ltd কর্তৃক পরিচালিত। স্বাস্থ্য সম্পর্কিত অন্যান্য ব্লগের জন্য ক্লিক করুন এখানে