স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্যই কত তথ্যই তো আমাদের কানে আসে। কোনোটি পরখ করে দেখি আবার কোনোটি শুনেই ভুলে যাই। আবার কিছু কিছু রয়েছে যেগুলো অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করার কারণে সেগুলো সঠিক কিনা সেটি পরখ করে দেখারও প্রয়োজন মনে করি না আমরা। অথচ মজার ব্যাপার হচ্ছে সেগুলো ভুলও তো হতে পারে!

এনজাইমের আজকের ব্লগে আমরা এমন ৮টি মেডিকেল ও স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য জানবো যেগুলোকে সব সময়েই আমরা সত্য বলে জানলেও আসলে সঠিক নয়।


এক নজরে



মেডিকেল ও স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য ১

আমরা আমাদের মস্তিষ্কের মাত্র ১০ ভাগ ব্যবহার করি?

“মানুষের সুপ্ত ক্ষমতাতে জাগিয়ে তোলার করার উপায় হিসেবে বিভিন্ন মোটিভেশনার স্পিকার এবং অন্যান্য আত্মসহায়তা (Self-help) প্রচারকারী গুরুরা ১৯৭০ সালের প্রথম দিকে এটিকে প্রচার করে আসছেন,” বললেন ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির স্কুল অফ মেডিসিনের ডঃ রেচেল ভ্রিমান এবং তার বইয়ের সহ-লেখক ডঃ অ্যারন ক্যারল। “কিন্তু এই সকল ব্যক্তিরা তাদের এই দাবির ভিত্তি হিসেবে বিজ্ঞানকে ব্যবহার করেনি।“


আজ, বিজ্ঞানীরা যেকোনো সময় মস্তিষ্কের স্ক্যান দেখতে পারেন, পরিমাপ করতে পারেন কার্যকলাপ। আর এই রূপকথায় প্রচুর হাসতেও পারেন। “আপনি তেমন কোনো নিষ্ক্রিয় অঞ্চল দেখতে পাবেন না,” ভ্রিমন বলেন। জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে এই ধারণাটি স্থির রয়েছে কারণ “আমরা ভাবতে চাই যে আমরা আমাদের সম্পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছিনি,” রেচেল ভ্রিমন বলেন।

মেডিকেল ও স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য ২

প্রতিদিন ৮ গ্লাস করে পানি খেতেই হবে?

আট গ্লাস পানি পানের এই কথাটি সম্ভবত ১৯৪৫ সালে শুরু হয়েছিল যখন আমেরিকার জাতীয় গবেষণা কাউন্সিলের (National Research Council) খাদ্য ও পুষ্টি বোর্ড বললো যে প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে প্রায় আড়াই লিটার পানি পান করা উচিত (প্রায় আট গ্লাসের সমতুল্য, বা গ্যালনের এক-তৃতীয়াংশ)। অধিকাংশ সংবাদপত্রই এটিকেই সত্য হিসেবে জানিয়ে তথ্যটিকে এখানেই থামিয়ে দিয়েছিল। অথচ কাউন্সিলটি আরও ব্যাখ্যা করেছিল যে 2.5 লিটারের বেশিরভাগই খাদ্য থেকে আসে।


ডাক্তার রেচেল ভ্রিমানের মতে, মানবদেহ তরল নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত দক্ষ। তিনি মনে করেন আট গ্লাসের কথাটি এভাবে বলা যেতে পারেঃ একদিনে প্রায় আট গ্লাস তরল পান করুন অথবা খান।

মেডিকেল ও স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য ৩

মশলাদার খাবার এবং মানসিক চাপের কারণে আলসার হয়?


আপনি যদি ভেবে থাকেন যে গত রাতের ডিনারে যে তরকারিটি খেয়েছিলেন সেটির জন্য আপনার আলসার জেগে উঠেছে তাহলে আবার ভাবুন।

অতীতে চিকিৎসকরা মানসিক চাপ, লাইফস্টাইল বা মশলাদার খাবার ইত্যাদিকে আলসার কারণ হিসেবে ধরে নিলেও এখন জানা গিয়েছে যে বেশিরভাগ আলসার আসলে হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি (Helicobacter pylori) জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট। গ্যাস্ট্রাইটিস এবং পেপটিক আলসারে এই জীবানুর ভূমিকা আবিষ্কারের কারণে ২০০৫ সালে Barry J. Marshall এবং J. Robin Warren সম্মিলিতভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেন

খাদ্যনালী, পেট বা ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রথম অংশের আবরণের মধ্যে গড়ে ওঠা ঘা তথা আলসার নির্দিষ্ট ওষুধের কারণেও হতে পারে। নিউ ইয়র্ক সিটির লেনক্স হিল হাসপাতালে প্রদাহজনক বাউল ডিজিজ প্রোগ্রামের (Inflammatory Bowel Disease Program) পরিচালক ডাঃ অরুণ স্বামীনাথের মতে, অ্যাসপিরিন এবং আয়রন ট্যাবলেট হচ্ছে সবচেয়ে প্রচলিত কারণ।

আলসার অ্যাসিডিটি সম্পর্কে আওর বিস্তারিত জানা যাবে অ্যাসিডিটি (Acidity) – শুধুই বুক জ্বলার সমস্যা না তার থেকে বেশি কিছু ? ব্লগ থেকে।

মেডিকেল ও স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য ৪

রাতদুপুরে স্ন্যাকস আপনার ওজন বৃদ্ধির কারণ?


কাজের জন্য হোক বা কাজ ছাড়াই। বিনা কারণে কিংবা ইনসমনিয়া। যেকোনো কারণেই হোক না কেন, আমাদের মধ্যে প্রচুর রাত জাগা মানুষ রয়েছে। আর স্বাভাবিকভাবেই রাত জাগার কারণে ক্ষুধা লেগে যায়। আর তখনই শুরু হয় রান্নাঘরে যেয়ে বিস্কিটের বয়াম নয়ত ফ্রিজের দরজাটা খুলে কিছুমিছু বের করে খেতে খেতে কোনো ফিল্ম দেখা। বা গান শোনা।


আমরা এতদিন এই রাতে খাওয়া স্ন্যাক্সগুলোকে আমাদের মুটিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে জেনে এসেছি। বিভিন্ন ডাক্তার বা পুষ্টিবিদগণ আমাদেরকে রাতে খাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। নিজেকের নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে অপরাধী হয়ে থেকেছি নিজেদের কাছেই।

আজকে আমরা এই রাত জাগাদের জন্য সুখবর এনেছি!!

গবেষণা বলছে, শুধুমাত্র রাতে খাওয়া এই স্ন্যাক্সগুলো আলাদাভাবে আপনার মুটিয়ে যাবার কারণ নয়। মুটিয়ে যাওয়া অনেকগুলো বিষয়ের উপরে নির্ভর করে। মূলত ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণের উপরে।

একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের দৈনিক গড়পড়তা ২৫০০ থেকে ৩০০০ ক্যালোরি প্রয়োজন হয়। নারীদের জন্য যার পরিমাণ ১৫০০-২০০০ ক্যালোরি। দৈনিক এই পরিমাণের চাইতে বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করা মানে ধীরে ধীরে স্থুলতার দিকে এগিয়ে যাওয়া।

এখন প্রয়োজনীয়তার চাইতে অধিক ক্যালোরি আপনি দিন বা রাতে যখনই গ্রহণ করুন না কেন সেটি আপনার জন্য ক্ষতিকর হবে। ফলে লক্ষ্য হতে হবে পরিমিত ক্যালোরি গ্রহণ এবং নিয়ামানুযায়ী। রাতে খাবার মানেই স্থুলতা নয়।

মেডিকেল ও স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য ৫

ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট আপনাকে রাখবে সুস্থ?


কিছু হলেই ভিটামিট ট্যাবলেট খাওয়া আমাদের মধ্যে খুবই প্রচলিত অভ্যাস। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে ভিটামিন সাপ্লিমেন্টগুলো কেবল অকার্যকরই নয় এমনকি বিপজ্জনকও হতে পারে।


উদাহরণস্বরূপ, ২০১৬ সালে প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে কিছু বয়স্ক মহিলা যারা ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন তাদের স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত 20 বছরের সাপ্লিমেন্ট গবেষণার একটি বিশাল পর্যালোচনাতে গবেষকরা দেখেছেন যে উচ্চ মাত্রার ভিটামিন গ্রহণ ক্যান্সারের ঝুঁকির সাথে সংশ্লিষ্ট হতে পারে।


রিপোর্টে জানা যাচ্ছে যে এই সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকিগুলো বাদেও সাপ্লিমেন্ট স্বল্পমেয়াদেও ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে সাপ্লিমেন্ট থেকে না নিয়ে ভিটামিন প্রকৃত খাবার থেকেই নিলেই ঝুঁকিমুক্ত থাকা সম্ভব।

মেডিকেল ও স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য ৬

আঙুলের নখ এবং চুল মৃত্যুর পরেও বাড়তে থাকে?


এই বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে একটি ভুল ধারণা এবং পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে না পারলেও বহু বছর ধরে অধিকাংশ চিকিৎসক এটিকে অস্বীকার করতে পারেননি। আপনার মৃত্যুর পরে আপনার নখ এবং চুলের আসলে যা ঘটে তা হলঃ
শরীরের ত্বক শুকিয়ে যাওয়ায় নরম টিস্যু, বিশেষত ত্বক কুচকে যায়। ত্বক শুকিয়ে যাওয়ার কারণে নখগুলোকে আরও বড় দেখা যায়। চুলের সাথে একই ঘটনা ঘটে তবে এটি তত স্পষ্ট বোঝা যায় না যতটা বোঝা যায় নখের ক্ষেত্রে।
অর্থাৎ মৃত্যুর পরে নখ ও চুল বৃদ্ধি পায় না, আসলে ত্বক শুকিয়ে যাওয়ার কারণে বড় মনে হয়।

মেডিকেল ও স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য ৭

ঘনঘন শেইভ করলে দাড়ি ঘন আর মোটা হয়?


বহু পুরুষের মধ্যেই এই ধারণা রয়েছে। খুব সহজেই এই ভুল বিশ্বাসটি ভেঙে যেতে পারে যদি কেউ একজন নিজের দাড়ির দিকে নজর দেন। আসলে আমাদের চোখে মনে হয় যে দাড়ি ঘন আর মোটা হয়েছে কিন্তু এটি সঠিক নয়। দাড়ি কাটলে ত্বকের বিপরীতে দাড়িকে ঘন মনে হয়।
মজার ব্যাপার হচ্ছে ১৯২৮ সালেই এই বিষয়ে একটি গবেষনাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। Anatomical Record জার্নালে ফরেন্সিক অ্যানথ্রপোলজিস্ট Mildred Trotter দেখান যে শেভিং-এর সাথে দাড়ি ঘন হবার কোনো সম্পর্কে নেই।

মেডিকেল ও স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য ৮

পিরিয়ডের সময় গর্ভধারণ হয় না?


যদিও ঋতুস্রাবের সময় কোনো মহিলার গর্ভবতী হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত নগন্য তবে এটি অসম্ভব নয়। শুক্রাণু এক সপ্তাহ পর্যন্ত নারীদেহের অভ্যন্তরে বিরাজ করতে পারে এবং ঋতুস্রাবের “রক্তপাত” পর্বের পরপরই (বা এমনকি রক্তপাত চলাকালেও) ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বানু নির্গত হতে পারে। ফলে কোনো নারী তার ঋতুচক্র চলাকালীন সময়েও গর্ভবতী হতে পারেন।