হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ফেইলিওর আর কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের মধ্যে পার্থক্য কী?

হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ফেইলিওর আর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট, প্রচলিতভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেল আমরা হয় বলি হার্ট অ্যাটাকে মারা গিয়েছে, নয়ত বলি বলি হার্ট ফেইলিওরে মারা গিয়েছে। আবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে মারা গিয়েছে বলেও বলে থাকি।

কিন্তু হার্ট অ্যাটাক আর হার্ট ফেইলিওর কি একই জিনিস?

কিংবা হার্ট ফেইলিওর আর কার্ডিয়াক অ্যারেস্টও কি একই?

আমাদের আজকে ব্লগে আমরা এই তিনটি জিনিস সম্পর্কে জানবো। বুঝতে চেষ্টা করবো এগুলো কি আসলেই এক নাকি আমরা ভুল ক্রমে এই তিনটি জিনিসকে একই বলে মনে করছি।

এই তিনটি জিনিস সম্পর্কে জানার আগে চলুন খুব সংক্ষেপে হৃদপিন্ড কিভাবে কাজ করে সেটি একটু জেনে নেই।

হৃদপিন্ড কিভাবে কাজ করে?

হার্ট অ্যাটাক

মানবদেহের হৃদপিন্ড মূলত একটি পেশি। আকারে অনেকটা একজন পূর্ণ  বয়স্ক মানুষের হাতের মুঠোর মত। হৃদপিন্ডের কাজ শরীরে রক্ত পরিবহন করানো। হৃদপিন্ডে দুই ধরণের রক্তনালী রয়েছে। একটির নাম ধমনি যাকে ইংরেজিতে বলে আর্টারি (Artery) এবং আরেকটির নাম শিরা যাকে ইংরজিতে বলে ভেইন (Vein)। আর এই সম্পূর্ণ সিস্টেমটিকে বলে কার্ডিওভাস্কুলার সিস্টেম।

হৃদপিন্ডের চারটি চেম্বার রয়েছে। প্রতিটি চেম্বারের রয়েছে আলাদা আলাদা আলাদা কাজ।

জন্মগত কারণ থেকে শুরু করে জীবনযাপনের পদ্ধতির উপর নির্ভর করে হৃদপিন্ডে নানান ধরণের রোগ হতে পারে।



ব্যাস, হার্ট অ্যাটাক কী, হার্ট ফেইলিওর কী এবং কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট কী, এই তিনটি বুঝতে হলে আমাদেরকে হৃদপিন্ডে এইটুকু বুঝতে পারলে হবে। এর বেশি অতিরিক্ত ব্যাখ্যা প্রয়োজন নেই। আর কথা না বাড়িয়ে চলুন তাহলে ব্যাখায় চলে যাই।

প্রথমেই আমরা দেখে নেবো,

হার্ট অ্যাটাক কী?

হার্ট-অ্যাটাক

ধমনীতে প্লাক (Plaque) জমা হলে হৃৎপিণ্ডে রক্ত প্রবাহ ধীর হয়ে যায় এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। এই অবস্থাকেই হার্ট অ্যাটাক বলে। হার্ট অ্যাটাকের সময় পেশী মরে যেতে শুরু করে।


এই কারণেই, হার্ট অ্যাটাকের ঘটনায় রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্লাক অপসারণ করা ও পেশি পুনরুদ্ধার করতে সার্জারি প্রয়োজন হয়।



হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে বুকের ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা সপ্তাহব্যাপী ক্লান্তি। তবে এটিও লক্ষ রাখতে হবে যে লক্ষণগুলো ব্যক্তিভেদে আলাদাও হয়। যেমন, কেউ কেউ হার্ট অ্যাটাকের সময় পেটে ব্যথা অনুভব করেন। বদহজম ভেবে সময় নষ্ট হয় এবং অবশেষে মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

কোনো রোগীকে হার্ট অ্যাটাক হাত থেকে বাঁচানোর একমাত্র উপায় হ’ল অতি দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া।

তাহলে সংক্ষিপ্তভাবে বললে, হার্ট অ্যাটক হবে যখন ধমনিতে প্লাক জমে রক্ত চলাচলে বাধা দিবে এবং এক পর্যায়ে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

হার্ট অ্যাটাক সম্পর্কে বিস্তারিত পড়তে পড়ুন আমাদের তিন পর্বের হৃদরোগ সিরিজের তৃতীয় পর্বঃ
হার্ট অ্যাটাক (Heart Failure): হৃদরোগ সিরিজ – পর্ব ৩


তাহলে এবার আমরা জেনে নেই

হার্ট ফেইলিওর কী?

হার্ট ফেইলিওর

যে পরিমাণ রক্ত পাঠানোর কথা হৃদপিন্ড যদি সেই পরিমাণ রক্ত পাম্প করতে ব্যর্থ হয় তখন তাকে হার্ট ফেইলিওর বলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই রোগটি দীর্ঘদিন সময় নেয় প্রদর্শিত হবার জন্য তবে কখনও কখনও এটি হুট করে হতে পারে। হৃদপিন্ডে রক্ত পাম্প করার পর্যাপ্ত শক্তি না থাকায় হৃদপিন্ডকে প্রয়োজনী রক্ত পাম্প করানোর জন্য শরীর তখন রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়।  


হার্ট ফেইলিওরের লক্ষণ

প্রাথমিকভাবে এই রোগের তেমন কোনো লক্ষণ দেখা না গেলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন ধরণের লক্ষণ প্রদর্শিত হতে থাকে। যেমন, ওজন বৃদ্ধি, বমি বমি ভাব, কাশি, মাথা ঘোরা, ক্লান্তি, রাতে প্রস্রাব বৃদ্ধি, দ্রুত শ্বাস, নীল ত্বক ইত্যাদি।

প্রায়শই হার্ট ফেইলিওর বিভিন্ন হৃদরোগ, থাইরয়েড গ্রন্থিজনিত সমস্যা, কিডনিতে ফেইলিওর ইত্যাদির মতো অন্যান্য রোগের লক্ষন হিসেবে দেখা দেয়। যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।

তাহলে সংক্ষিপ্তভাবে বললে, হৃদপিন্ড পর্যাপ্ত পরিমাণ রক্ত শরীরে পাঠাতে না পারলে হার্ট ফেইলিওর হয়।

হার্ট অ্যাটাক সম্পর্কে বিস্তারিত পড়তে পড়ুন আমাদের তিন পর্বের হৃদরোগ সিরিজের দ্বিতীয় পর্বঃ হার্ট ফেইলিওর (Heart Failure): হৃদরোগ সিরিজ – পর্ব ২


এবার আমরা জানবো,

কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট কী

কার্ডিয়াক-অ্যারেস্ট-enzaime

কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট মানে হচ্ছে হৃদপিন্ডের কার্যক্রম সহসা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া। হৃদপিন্ডের কাজ একদম বন্ধ হয়ে যাওয়া। হার্ট অ্যাটাকের সময় রক্ত পরিবহনে সমস্যা হয় আর কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সময় হৃদপিন্ড বন্ধ হয়ে যায় এবং একে কম্পিউটার, মোবাইলের মত স্মার্ট ডিভাইসগুলোর মত রিস্টার্ট দিতে হয়। এটি সাময়িক হলেও সময় মত যদি চিকিৎসা প্রদান করা না যায় তাহলে কয়েক মিনিটের মধ্যে রোগী মৃত্যুবরণ করতে পারে।



কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের লক্ষণ

মাথা ঘোরা, চেতনা হারানো, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি হল কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের লক্ষণগুলোর মধ্যে কয়েকটি। আক্রান্ত ব্যক্তি দ্রুত সময়ের মধ্যে অসার হয়ে যায় এবং শ্বাস নিতে সমস্যা হয়।

কার্ডিওপালমোনারি সিসাসিটেশন (সিপিআর) এর সাহায্যে ক্ষতিগ্রস্থদের বেঁচে থাকার হার ২৩% পর্যন্ত বৃদ্ধি হতে পারে।

রোগীকে চেতনা ফেরানোর আরেকটি পদ্ধতি হল অটোমেটেড এক্সটার্নাল ডিফিব্রিলেটর (এইডি) ব্যবহার করা।

তাহলে সংক্ষিপ্তভাবে বললে, হৃদপিন্ড যখন সহসা শাট ডাউন অর্থাৎ বন্ধ হয়ে যায় তখন তাকে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বলে।

কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন আমাদের তিন পর্বের হৃদরোগ সিরিজের প্রথম পর্বঃ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট (Cardiac Arrest): হৃদরোগ সিরিজ – পর্ব ১

পাঠকদের সুবিধার জন্য নীচে একটি টেবিলে ছক আকারে হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ফেইলিওর এবং কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের মধ্যে পার্থক্য দেখানো হলঃ

হার্ট অ্যাটাকহার্ট ফেইলিওরকার্ডিয়াক অ্যাটাক
ধমনিতে প্লাক জমে রক্ত চলাচলে বাধা দিবে এবং এক পর্যায়ে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।হৃদপিন্ড পর্যাপ্ত পরিমাণ রক্ত শরীরে পাঠাতে পারে নাহৃদপিন্ড সহসা বন্ধ হয়ে যায়



অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সামান্য কিছু বিষয় আমাদের চোখে এড়িয়ে যাবার কারণে আমরা হৃদযন্ত্রের গুরুতর অনেক সমস্যা ধরতে পারি না। উপরে উল্লিখিত বিষয়গুলো সম্পর্কে একটু চোখ কান খোলা রাখলেই আমরা হয়ত বাঁচাতে পারি অকাল অনেক মৃত্যুই।


বাংলাদেশের ১০ জন শীর্ষ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়ে আমাদের ব্লগ “বাংলাদেশের ১০ জন শীর্ষ জনপ্রিয় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ” পড়ে দেখতে পারেন।

এনজাইমের স্বাস্থ্য বিষয়ক সকল ব্লগ পড়তে ক্লিক করুন এখানে

আপনার প্রয়োজনীয় ডাক্তার অনলাইনেই খুঁজে নিন এখান থেকে