কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট (Cardiac Arrest), হার্ট ফেইলিওর (Hear Failure) এবং হার্ট অ্যাটাকের (Heart Attack) মধ্যে মৌলিক পার্থক্য থাকলেও আমাদের অনেকেরই সেটি হয়ত জানা নেই। বিষয়টি সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা দেয়ার জন্য তিন পর্বের হৃদরোগ সিরিজ-এর আজকে থাকছে তৃতীয় এবং শেষ পর্ব। এই পর্বে আলোচনা হবে হার্ট অ্যাটাক নিয়ে।

কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট নিয়ে লিখিত প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন এখানে
হার্ট ফেইলিওর নিয়ে লিখিত দ্বিতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন এখানে



মাসখানেক ধরেই হাসান সাহেবের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। সব সময় একটা দুর্বলতা ঘিরে থাকে পুরো শরীরে। একটু চিন্তিতই লাগছে। ভাবছেন ডাক্তারের কাছে যাবেন কিন্তু যাওয়া হচ্ছে না সময় করে।

নতুন বাড়ির কাজে হাত দিয়েছেন। সারাজীবনের জমানো টাকায় করা বাড়ি। খুব হিসেবে করে খরচ করতে হচ্ছে। যে কারণে সব জায়গা তার থাকতে হচ্ছে। নইলে অপচয় ঠেকাতে পারবেন না।

মনের মধ্যে আবার এটিও উঁকি দিচ্ছে যে হয়ত এই বাড়ির কাজের পেছনে লেগে থাকার কারণেই শরীরটা খারাপ করেছে। এই বয়সে এত পরিশ্রম নিতে পারছে না। কদিন বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। তৎপর হয়ে ডাক্তারের কাছে না যাওয়ার এটিও আরেকটি কারণ।

মনে ভয় ঢুকিয়ে দেয়া ঘটনাটি ঘটলো শুক্রবার। বাড়ির তৃতীয় তলার ছাদের ঢালাই চলছিল। প্রচন্ড ব্যস্ততা ভোর থেকেই। একটুও দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছেন না।

সকাল দশটা নাগাদ নীচতলায় এসে একটু বসলেন। মিনিট দশেক পরে হঠাৎ করেই কেমন যেন লাগলো শরীরটা। ঘামতে শুরু করলেন প্রচন্ড। মনে হচ্ছিল এখনিও জ্ঞান হারাবেন। দম আটকে আসছিল। খাবি খাচ্ছিলেন যেন পানির নীচে। দারোয়ান দেখতে পেয়ে দৌড়ে এসে মাথায় পানি দিল। বাতাস করতে থাকলো।

প্রায় আধা ঘন্টা পর কিছুটা সুস্থ হতে গাড়ি করে বাসায় চলে এলেন। রাতে খেতে বসে কথায় কথায় বললেন সকালের ঘটনার কথা। ছেলে হাসনাত ফার্মাসিস্ট। সাথেই সাথেই কান খাড়া করে শুনলো পুরো ঘটনাটা। এরপরে বললো কালকে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। তোমার হার্টে সমস্যা আছে।

হাসান সাহেব হেসেই উড়িয়ে দিতে চাইলেন।

কিন্তু হাসনাত খুব শান্তভাবে আবারও বলল, “কালকে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। সকালে বের হয়ো না। আমিও ছুটি নিচ্ছি কাল। আমি এখনই অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রাখছি।“

হাসনাতের গলার স্বরের বুঝলেন আর কথা বলে লাভ হবে না। শুধু বললেন এই রাতে ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিবি কিভাবে?

হাসনাত বললো, সে চিন্তা তোমার করতে হবে না। আমি যা বলেছি তাই করো। সকালে উঠে রেডি হয়ে বসে থাকবে। আমি নিয়ে যাবো ডাক্তারের কাছে।

হাসান সাহেব বললেন, ঠিক আছে।

হাসনাত খেয়ে রুমে ঢুকে এনজাইম লিমিটেডের Enzaime Patient Care অ্যাপটা নামিয়ে দেশের অন্যতম সেরা একজন কার্ডিওলজিস্টের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিল। উনি হাসনাতের পরিচিত। চাইলেই ফোনে এখন বললেও হত। তবে সেক্ষেত্রে উনি ভিজিট ফি রাখতেন না। যেটা হাসনাতের জন্য বিব্রতকর। সে কারণেই অনলাইনেই ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নিল কারণ Enzaime Patient Care অ্যাপে অনলাইনেই ভিজিট ফি দেয়া যায়। বিকাশে ও টাকাটা দিয়ে দিল।

সকাল ১১টায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট।

চেম্বারে ঢুকলেই ডাক্তার হাসনাতকে চিনতে পারলেন। অত্যন্ত আন্তরিকভাবে কুশলাদি বিনিময়ের পর হাসনাত ওর বাবার কথা বললো।

ডাক্তার সাহেব হাসান সাহেবের সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। হাসনাতের দিকে তাকিয়ে বললেন,

বাবাকে আমার কাছে এনে খুব ভালো করেছে। অবশ্যই টেস্ট করতে হবে তবে লক্ষণগুলো শুনে হার্টের দূর্বলতার কথা স্পষ্ট। আর এগুলো সবই হার্ট অ্যাটাক হবার আগের লক্ষণ। সো, ওয়েল ডান মাই বয়।

হাসান সাহেব ভয় পেয়ে গেলেন ভেতরে ভেতরে। বাইরে বুঝতে দিলেন না। জিজ্ঞেস করলেন একটু পরিষ্কার করে বললেন কি ডাক্তার সাহেব?

– অবশ্যই!

হার্ট অ্যাটাক কী?

রোগটি মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (Myocardial infarction), সংক্ষেপে এম-আই (MI) বা একিউট মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (acute myocardial infarction), সংক্ষেপে এ-এম-আই (AMI) নামেও পরিচিত।

হৃৎপিণ্ডে সাময়িকভাবে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়াকে হার্ট অ্যাটাক বলে। করোনারি আর্টারি বা হৃৎপিণ্ডে রক্তসরবরাহকারী ধমনীতে প্রতিবন্ধকতা বা ব্লকেজ তৈরি হলে হৃৎপিণ্ডে স্বাভাবিক রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়। ধমনীর গায়ে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, ফ্যাটি এসিড ও শ্বেত রক্ত কণিকা জমতে শুরু করলে (atherosclerotic plaque) এই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয় এবং হৃৎপিণ্ডে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে সেখানে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। এই সমস্যার কারণে হৃৎপিণ্ডের পেশীর ক্ষতি হয়, এমনকি তা স্থায়ীভাবে নষ্টও হয়ে যাতে পারে।

হাসান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু এটা কেন হয়?

হার্ট অ্যাটাকের কারণ

হৃৎপিণ্ডে রক্তসরবরাহকারী ধমনী বন্ধ হয়ে গেলে হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকে। সময়ের সাথে সাথে হৃৎপিণ্ডে রক্তসরবরাহকারী ধমনীতে বিভিন্ন পদার্থ জমতে থাকে, যেগুলিকে প্লাক বলা হয়। এগুলির কারণে ধমনী সরু হয়ে যায়। এ সমস্যাকে বলা হয় করোনারি আর্টারি ডিজিজ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে করোনারি আর্টারি ডিজিজের কারণে হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকে।

হার্ট অ্যাটাক তখনই হয় যখন এই প্লাক ফেটে যায় এবং কোলেস্টেরল ও অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ রক্তের সাথে মিশে যায়। ধমনীর যে স্থানে প্লাক ফেটে যায় ঐ স্থানে নতুন করে রক্ত জমাট বাঁধতে শুরু করে।  এটি আকারে বড় হয়ে গেলে পুরোপুরিভাবে হৃৎপিণ্ডে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

আবার ধমনীর অস্বাভাবিক ও দ্রুত সংকোচন-প্রসারণের জন্যও হৃৎপিণ্ডে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তামাক ও মাদকদ্রব্য ব্যবহারের কারণে এই সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়াও কোনো কারণে ধমনী ছিঁড়ে গেলেও (spontaneous coronary artery dissection) হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।

কিভাবে বুঝবো হার্ট অ্যাটাক হয়েছে?

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ

এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে আমরা যে যে লক্ষণ পাই তা হচ্ছে:

  • বুকে তীক্ষ্ণ ব্যথা (Sharp chest pain)
  • শ্বাসকষ্ট (Shortness of breath)
  • বুকের চাপা ব্যথা (Chest tightness)
  • বমি বমি ভাব (Nausea)
  • বাহুতে ব্যথা হওয়া (Arm pain)
  • অজ্ঞান হয়ে যাওয়া (Fainting)
  • ঘাম হওয়া (Sweating)
  • শরীরের নিম্নাংশে ব্যথা (Lower body pain)
  • বুক জ্বালা (Heartburn)
  • অনিয়মিত হৃদস্পন্দন (Irregular heart beat)
  • বুকে জ্বালাপোড়াসহ ব্যথা (Burning chest pain)
  • হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া (Increased heart rate) 

আমি তো সারাজীবন খুব মাপা জীবন যাপন করেছি। আমার কেন এসব হচ্ছে? জিজ্ঞেস করলেন হাসান সাহেব।

ডাক্তার সাহেব বললেন,

যা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়

যেসব কারণে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় সেগুলি হলো-

  • বয়স: পুরুষদের ক্ষেত্রে যাদের বয়স ৪৫ বা এর বেশি এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে যাদের বয়স ৫৫ বা এর বেশি তাদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেশি থাকে।
  • ধূমপান: ধূমপানের কারণে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
  • উচ্চ রক্তচাপ: উচ্চ রক্তচাপের কারণে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে ধূমপান, স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের সাথে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকলে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
  • রক্তে কোলেস্টেরল বা ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রাঃ: লো-ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন কোলেস্টেরল হল এক প্রকারের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল। রক্তে এই কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেড়ে গেলে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। আবার রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের (এক ধরনের ফ্যাট) মাত্রা বেড়ে গেলেও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
  • ডায়বেটিস: মানবদেহে ইনসুলিনের প্রভাবে গ্লুকোজ ভেঙ্গে শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ডায়াবেটিস হলে অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নিঃসরণের পরিমাণ কমে যায়। ফলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়। ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে না রাখলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
  • পারিবারিক সূত্র: কোনো ব্যক্তির পরিবারের অন্য কারো হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকলে তার এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
  • কর্মবিমুখতা: শারীরিক পরিশ্রম কম করলে শরীরে মেদ বৃদ্ধি পায় ও রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যায়। ফলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
  • স্থূলতা: স্থূলতা অন্যান্য শারীরিক সমস্যা যেমন ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল ও উচ্চ রক্তচাপের জন্য দায়ী। তাই স্থূলতার কারণে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
  • দুশ্চিন্তাঃ মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

এর যেকোনো কারণেই হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। ভেবে দেখুন আপনার সাথে কোনটি মেলে।

যারা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকির মধ্যে আছে

পুরুষদের মধ্যে এই রোগ নির্ণয়ের গড়পড়তা সম্ভাবনা রয়েছে। মহিলাদের মধ্যে এই রোগ নির্ণয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম।

হাসান সাহেব জিজ্ঞেস করলেম, এঞ্জাইনা কি? এঞ্জাইনা ও হার্ট এ্যাটাকের মধ্যে কি পার্থক্য রয়েছে?

এঞ্জাইনা ও হার্ট এ্যাটাক এক নয়। এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ রক্তের অভাবে বুকে বারবার ব্যথা হলে তাকে এঞ্জাইনা বলে। এই ব্যথা কাঁধ, পিঠ, বাহু, ঘাড় ও চোয়ালেও হতে পারে। এই ব্যথার সাথে বুকে চাপ অনুভূত হয়, তবে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলে ও ঔষধ খেলে এ ব্যথা ভালো হয়ে যায়।

হাসান সাহেবের প্রশ্ন, হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা নেওয়ার পর কি কি নিয়ম মেনে চলতে হবে?

ডাক্তার সাহেব বললেন, একবার হার্ট অ্যাটাক হলে পরবর্তীতে এ রোগের ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত টেস্ট ও চেক-আপ করাতে হবে। একই সাথে ধূমপান পরিহার করতে হবে, খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনতে হবে ও পরিশ্রম করতে হবে। কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় ঔষধ গ্রহণ করতে হবে এবং এঞ্জাইনার জন্য অ্যাসপিরিন ও নাইট্রোগ্লিসারিন ট্যাবলেট খেতে হবে। একই সাথে বিভিন্ন রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রামেও অংশগ্রহণ করা যেতে পারে।

আমি আপনাকে কিছু পরামর্শ দেই, এগুলো মেনে চলবেন প্লিজ।

হেলথ টিপস্‌

  • ধূমপান পরিহার করতে হবে।
  • কোলেস্টেরল, রক্তচাপ ও ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এজন্য সর্বপ্রথম ওজন নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে ও খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনতে হবে।
  • নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে।

জ্বি বুঝতে পেরেছি।

ডাক্তার সাহেব বললেন, আর হাসনাত, আমি দুটো টেস্ট দিচ্ছি। এগুলোর রেজাল্ট নিয়ে আমার সাথে দ্রুত যোগাযোগ করবে, কেমন?

জ্বি আচ্ছ স্যার।

ঠিক আছে তাহলে।

জ্বি স্যার। আমরা তাহলে আজকে উঠি।

হ্যাঁ, আল্লাহ হাফেজ।

আসসালামু আলাইকুম স্যার।

ওয়ালাইকুম সালাম।





হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে কথা বলুন এনজাইম লিমিটেড (Enzaime Ltd) এর টেলিমেডিসিন সেবা গ্রহণ করার মাধ্যমে। অনলাইনে যেকোনো রোগের ডাক্তারের পরামর্শের জন্য আপনার চাহিদা অনুযায়ী ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন এখানে ক্লিক করে।

স্বাস্থ্য বিষয়ক অন্যান্য আরও ব্লগ পড়ার জন্য ক্লিক করুন এখানে