কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট (Cardiac Arrest), হার্ট ফেইলিওর (Hear Failure) এবং হার্ট অ্যাটাকের (Heart Attack) মধ্যে মৌলিক পার্থক্য থাকলেও আমাদের অনেকেরই সেটি হয়ত জানা নেই। বিষয়টি সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা দেয়ার জন্য তিন পর্বের হৃদরোগ সিরিজ-এর আজকে থাকছে দ্বিতীয় পর্ব। এই পর্বে আলোচনা হবে হার্ট ফেইলিওর নিয়ে।

প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন এখানে


বাবর সাহেবের শরীরটা কদিন যাবতই খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না। মাথা ঘোরা আর ক্লান্তিটা কোনোভাবেই যাচ্ছিল না। শুক্রবার জুমার নামাজ পড়ে এসে একটু শুয়ে ছিলেন। এর মধ্যেই দারোয়ান এসে বেল দিলে তিনি উঠে দরজা খুললেন। দোকানের একটা বিল বাকি ছিল। দিয়ে দরজা আটকে রুমে ঢুকে আবার শুয়ে পড়লেন একটু।

আজকে রফিকও অফিসে। শিফিটিং ডিউটি। রফিকের মা গোসলে ছিল। মাত্র বের হয়ে বারান্দায় কাপর শুকাতে দিচ্ছিল। বললেন,নামার শেষে আসার সময় মাছ টাছ কিছু পাওনি?

আনার মত কিছু পেলাম না। সব চাষের মাছ।

তো রাস্তায় কি তোমার জন্য নদীর মাছ নিয়ে বসে থাকবে? এতদিন বললাম কেরানিগঞ্জে একটু যাও। ওখানে নদী থেকে ধরেই রাস্তায় বসে পরে মাছ নিয়ে। গেলে না।

আচ্ছা যাবো যাবো। একদিন তোমাকে…….

কথা বলতে বলতে বাবর সাহেবের বুকে কেমন যেন করে উঠলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জ্ঞান হারালেন।

রফিকের মা বাবর সাহেবের কথা শেষ করতে না দেখে পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখেন বাবর সাহেব বুকে হাত দিয়ে চুপ করে শুয়ে আছে। বুকটা ধক করে উঠলো তার। কথা বলতে বলতে এভাবে ঘুমিয়ে যাবার মানুষ রফিকের বাবা নয়।

কাছে যেয়ে তিনি জোরে জোরে ডাকলেও সারা দিচ্ছিলেন না বাবার সাহেব। যা বোঝার ততক্ষনে রফিকের মা বুঝে গেছেন। গতবছর ইয়ারলি বডি চেক আপ করার সময় ডাক্তার বাবর সাহেবের ধূমপানের অভ্যাস নিয়ে কথা বলার সময় এই ধরণের পরিস্থিতির কথা বলেছিলেন।\

রফিকের মা নিজেকে শক্ত করলেন। বাসায় কেউ নেই। শান্ত মাথায় সবকিছু হ্যান্ডল করতে হবে।

তিনি প্রথমে ফোন দিলেন ড্রাইভারকে। বললেন, “এখনই বাসায় আসো, তোমার স্যার অসুস্থ। তাকে হাসপাতালে নিতে হবে।“

ডাইভার বাসার নীচেই ছিল। সাথে সাথেই দুজন দারোয়ানকে নিয়ে চলে এল। সবাই মিলে ধরে গাড়িতে উঠিয়ে ২০ মিনিটের মধ্যে এলাকার কাছাকাছি হাসপাতালে চলে এল।

গাড়িতে বসেই রফিকের মা রফিককে কল করেছিলেন। সে আসতে আরও ঘন্টাখানেক লেগে যেতে পারে।

ইমার্জেন্সি ডাক্তার উপসর্গ শুনে সাথে সাথে কয়েকটা টেস্ট করিয়ে ফেললেন। এর মধ্যেই তার চিকিৎসা শুরু করে দেয়া হয়েছে।

অবস্থা কিছুটা স্টেবল হলে তাকে কেবিনে ট্রান্সফার করা হয়।

বাবর সাহেবকে হাসপাতালে ভর্তির পরের দিন তাকে চিকিৎসা করা ডাক্তারের সাথে কথা বলার জন্য রফিক গেল। সালাম দিয়ে বসলো।জ্বি রফিক সাহেব বলুন।

আমি আসলে বাবার সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে একটু জানার জন্য এসেছি। তার আসলে কী হয়েছে, কেন হল এসব আর কী।

বুঝতে পেরেছি। বাবর সাহেবের হার্ট ফেইলিওর হয়েছিল। সৃষ্টিকর্তা অশেষ কৃপায় তিনি এখন ডেঞ্জার পার হয়ে এসেছেন। তবে খুব মেইনটেইনড লাইফ লিড করতে না পারলে ভবিষ্যতে খারাপ কিছু ঘটতে পারে?

কিন্তু হার্ট অ্যাটাকটা হল কেন?

রফিক সাহেব, আপনার বাবার হার্ট অ্যাটাক নয়, হার্ট ফেইলিওর হয়েছে।

ও আচ্ছা।

আপনার ভুল নয়, অধিকাংশ মানুষই এগুলোকে একই মনে করে।

হার্ট ফেইলিওর সম্পর্কে আমাকে কি একটু বিস্তারিত বলা যায়?

অবশ্যই।

ডাক্তার সাহেব বলা শুরু করলেন,

রফিক সাহেব, হার্ট ফেইলিওর বুঝতে হলে আজে জানতে হবে হার্ট কী আর কিভাবে কাজ করে।

হার্ট বা হৃৎপিন্ড হচ্ছে একটা পেশি। সাইজে আপনার হাতের মুঠোর মত হবে। যেই শিরা আর ধমনির একটা সম্মিলিত সিস্টেম বা ব্যবস্থার মাধ্যমে হার্ট সারা শরীরে রক্ত পাঠায় সেই সিস্টেমকে আমরা বলি কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেম।

তো হার্টের চারটি চেম্বার বা কুঠরি আছে। এর চার চেম্বারের আলাদা আলাদা কাজ আছে।

এই হচ্ছে হার্টের একদম বেসিক আইডিয়া।

এবার আসি হার্ট ফেইলিওর আসলে কী সেই প্রশ্নে।

হার্ট ফেইলিওর কী? হার্ট ফেইলিওর কাকে বলে?

হৃৎপিন্ডের কাজ রক্ত পাম্প করে পুরো শরীরে প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা। কোনো কারণে হৃৎপিণ্ডের এই পাম্প করার কাজটি বাধাপ্রাপ্ত হলে ও রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হলে তাকে হার্ট ফেইলিয়র বলে।

এ অবস্থায় বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে, যেমন- পা ফুলে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট ও অল্প পরিশ্রমে কান্ত হয়ে যাওয়া। ইকো-কার্ডিওগ্রাফির সাহায্যে হার্ট ফেইলিয়র সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।

কী কারণে হার্ট ফেইলিয়র হয়েছে তা রক্ত পরীক্ষার সাহায্যে নির্ণয় করা সম্ভব। এর কারণ ও তীব্রতার উপর এ রোগের চিকিৎসা নির্ভর করে। এটি কনজেসটিভ হার্ট ফেইলিয়র (congestive heart failure), সংক্ষেপে সি-এইচ-এফ (CHF) বা কনজেসটিভ কার্ডিয়াক ফেইলিয়র (congestive cardiac failure), সংক্ষেপে (CCF) নামে পরিচিত।

হার্ট ফেইলিওর হুট করে হয় না। যেহেতু হার্টের পেশির দূর্বল হয়ে যাবার কারণে এটি ঘটে থাকে ফলে এটি দীর্ঘ সময় ধরে হয়। চূড়ান্ত মুহূর্তের পূর্বে অনেক ধরনের উপসর্গ শরীর প্রদর্শন করতে থাকে। আমরা যদি এগুলো সাথে পরিচিত হই তাহলে অনেক অকাল মৃত্যুই এড়ানো সম্ভব।

রফিক জিজ্ঞেস করলো, কিন্তু হার্ট ফেইলিওর কেন হয়?


হার্ট ফেইলিওর কেন হয়?

শারীরিক অসুস্থতার কারণে হার্ট দুর্বল হয়ে গেলে বা হার্টের কোনো ক্ষতি হলে হার্ট ফেইলিয়র হয়ে থাকে।  এছাড়াও হৃৎপেশি শক্ত হয়ে গেলে হৃৎপিণ্ড যথাযথভাবে রক্ত পাম্প করতে পারে না। এই কারণে হার্ট ফেইলিয়র হয়ে থাকে।

হার্ট ফেইলিয়র হলে হৃৎপিণ্ডের পাম্পিং চেম্বার বা ভেণ্ট্রিকলগুলো যথাযথভাবে কাজ করতে পারে না। আবার কোনো কারণে হৃৎপেশি দুর্বল হয়ে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্থ হলে হৃৎপিণ্ড থেকে পুরো দেহে রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হয় এবং এর ফলে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়।

কিন্তু ডাক্তার সাহেব, হার্ট ফেইলিওর যে হচ্ছে বা হবে এর কোনো লক্ষণ কি আছে? কোনো উপসর্গ?

আছে। হার্ট ফেইলিওরের উপসর্গগুলো হচ্ছেঃ


হার্ট ফেইলিওরের উপসর্গগুলো কী কী?


হার্ট ফেইলিওরের উপসর্গ
  • ওজন বৃদ্ধি
  • বমি বমি ভাব
  • ক্ষুধা মন্দা
  • গোড়ালি ফুলে যাওয়া
  • কাশি
  • মাথা ঘোরা
  • ক্লান্তি
  • রাতে প্রস্রাব বৃদ্ধি
  • দ্রুত শ্বাস
  • নীল ত্বক ইত্যাদি


হার্ট ফেইলিওরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো কী কী?


যে সব কারণে হার্ট ফেইলিয়রের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় সেগুলো হলো:

  • উচ্চ রক্তচাপ।
  • করোনারি হার্ট ডিজিজ।
  • হার্ট অ্যাটাক।
  • ডায়বেটিস।
  • ভলভিউলার হার্ট ডিজিজ (Valvular heart disease‌)।
  • ভাইরাল ইনফেকশন।
  • মদ্যপান ও ধূমপান।
  • স্থূলতা।
  • অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন।
  • ডায়াবেটিসের জন্য ব্যবহৃত ঔষধ যেমন রসিগ্লিট্যাজোন (rosiglitazone)- এ্যাভান্ডিয়া (Avandia) এবং পায়োগ্লিটাজোন (pioglitazone)- এক্টোস (Actos) গ্রহণ করা।
  • রাতে ঘুমানোর সময় দেহের অভ্যন্তরে অক্সিজেনের অভাবে শ্বাসকষ্ট ও হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিক হওয়া (Sleep apnea)।
  • জন্মগতভাবে হৃৎপিণ্ডে কোনো ত্রুটি থাকা (Congenital heart defects) ।

রফিক বলল, আমার মা-ও তো বয়স্ক মানুষ। তারও কি এই ঝুঁকি আছে?

যারা হার্ট ফেইলিওরের ঝুঁকির মধ্যে আছে


পুরুষদের মধ্যে এই রোগ নির্ণয়ের গড়পড়তা সম্ভাবনা রয়েছে। মহিলাদের মধ্যে এই রোগ নির্ণয়ের সম্ভাবনা ১ গুণ কম।

রফিক আবার জিজ্ঞেস করলো, সময়ের সাথে সাথে হার্ট ফেইলিয়র কি আরো খারাপের দিকে যেতে পারে?

হার্ট ফেইলিয়র একটি গুরুতর ও ক্রনিক রোগ, যা ধীরে ধীরে আরো খারাপের দিকে যেতে থাকে। এমনকি এর কারণে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। তবে একবার হার্ট ফেইলিয়রের পর রোগীর অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অবস্থার অবনতি হওয়ার আগেও এর লক্ষণগুলোর মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসে না। প্রায় কয়েক মাসের জন্য লক্ষণগুলি একই অবস্থায় থাকে। আবার কখনো কখনো এই লক্ষণগুলো খুব দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে এবং এ অবস্থায় হার্ট অ্যাটাক, ফুসফুসে ইনফেকশন বা হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে।

হার্ট ফেইলিওরের কতদিন পর একজন রোগী স্বাভাবিক কাজে কর্মে ফেরত যেতে পারেন?

অধিকাংশ ব্যক্তি কয়েক দিন পরই ছোটখাট কাজ করতে পারে, তবে ভারী কোনো কাজ করতে পারে না। অধিক শারীরিক পরিশ্রম প্রয়োজন এমন কাজ হার্ট ফেইলিয়রের পর এড়িয়ে চলা উচিত। তবে বসে থেকে যেসব কাজ করা সম্ভব সেগুলি করা যেতে পারে। হার্ট ফেইলিয়র যদি মারাত্মক না হয় তবে সামান্য হাঁটাচলা বা দাঁড়িয়ে থেকেও কাজ করা যেতে পারে। কর্মক্ষমতা পুনরায় স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য নিয়মিত ব্যায়াম ও স্ট্রেস টেস্ট করা প্রয়োজন।

হার্ট ফেইলিওর থেকে বাচার উপায় কী?

ডাক্তার সাহেব বললেন,

হেলথ টিপস্‌

হার্ট ফেইলিয়রের ঝুঁকি কমানো সম্ভব:

  • খাবারে লবণ ও চিনির মাত্রা কমাতে হবে। প্রতিদিন ৬ গ্রামের বেশি লবণ খাওয়া উচিত নয়।
  • স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় প্রচুর পরিমাণ ফলমূল ও শাকসবজি, আঁশযুক্ত খাবার, পরিমিত পরিমাণ দুধ ও দুগ্ধজাতীয় খাবার এবং মাংস, মাছ, ডিম ও দুগ্ধজাতীয় খাবার বাদে অন্যান্য প্রোটিনের উৎস থাকতে হবে।
  • দেহের ক্ষতি করে এমন চর্বিযুক্ত খাবার কম খেতে হবে।
  • ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

ডাক্তার সাহেব, আমি যা বুঝতে পারলাম তা হচ্ছে আব্বাকে নিয়মিত চেক আপের মধ্যে রাখতে হবে। একে করোনা ভাইরাসের ক্রাইসিস তার উপরে বাবা বয়ষ্ক মানুষ। নিয়মিত চেক আপের বিষয়ে আপনার কোনো পরামর্শ কি আছে?

আমি অনলাইনে রোগী দেখি। এনজাইম লিমিটেডের হেলথকেয়ার অ্যাপ Enzaime Patient Care-এ আমাকে আপনি পাবেন। অথবা ওদের ওয়েবসাইটে।। অনলাইনেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট, পেমেন্টসহ ভিডিও কলের মাধ্যমে টেলিমেডিসিন সার্ভিস দেই আমি। আপনার যখন প্রয়োজন হবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নিয়েন। আমি দেখে দিব আপনার বাবাকে।

তাহলে তো খুবই ভালো হয়! আমি তাহলে সেটাই করবো। আজকে তাহলে আসি ডাক্তার সাহেব।

জ্বি আসুন।


হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে কথা বলুন এনজাইম লিমিটেড (Enzaime Ltd) এর টেলিমেডিসিন সেবা গ্রহণ করার মাধ্যমে। অনলাইনে যেকোনো রোগের ডাক্তারের পরামর্শের জন্য আপনার চাহিদা অনুযায়ী ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন এখানে ক্লিক করে।

স্বাস্থ্য বিষয়ক অন্যান্য আরও ব্লগ পড়ার জন্য ক্লিক করুন এখানে