রোগ বিষয়ে জানার যে খুব আগ্রহ আছে রিশাতের সেটা কখনোই না। কিন্তু তারপরও গত দুই ঘন্টা যাবত ইন্টারনেটে বিশেষ একটা রোগ নিয়ে পড়তে চেষ্টা করছে সে। ঢাকার বেশ জনপ্রিয় বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে সে। তবে তার লেখাপড়ার সাথে আজকের এই রোগের বিষয়ে পড়ার কোন সম্পর্ক নেই। 

আজ সকালে ভার্সিটির নোটিশ বোর্ডে রিশাত একটা নোটিশ দেখতে পায়। “হিমোফিলিয়া সোসাইটি অব বাংলাদেশ” থেকে একটি বিশেষ ক্যাম্পেইনে যোগ দিতে আগ্রহী ভলেন্টিয়ারদের যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। এমনিতে স্কুলে কলেজে থাকতে অনেক ভলেন্টারি কাজ করেছে সে। কিন্তু রোগ বিষয়ে সচেতনতার কোন কাজ সে আগে করে নি। আর সত্যি বলতে এ রোগের বিষয়ে তেমন কিছু জানে না সে। শুধু এটুকু ধারনা আছে রক্ত জমাট না বাঁধার কিছু বিষয় এই রোগের সাথে জড়িত। 

নিজে না জেনে অন্যকে কি বোঝাবে ভেবে কেমন একটা লজ্জাবোধ কাজ করছিলো রিশাতের ভেতরে। কিন্তু সাধারণ মানুষের উপকারে আসতে পারলে নিজের কাছে ভালো লাগবে সেটাও বেশ বুঝতে পারছিলো। তাই আগে হিমোফিলিয়া (Hemophilia) বিষয়ে নিজের ধারনা পরিষ্কার করে, ভলেন্টিয়ার হবার ফর্ম জমা দিবে বলে ঠিক করেছে রিশাত। তবে খুব বেশি সময়ও হাতে নেই তার কাছে। আগামীকাল ফর্ম জমা দেয়ার শেষ দিন । তাই ক্লাস শেষে ভার্সিটির ক্যাফেটেরিয়াতে যেয়ে বসলো সে। সবার আগে এই রোগ আসলে কী সে বিষয়ে নজর বোলালো রিশাত।

হিমোফিলিয়া কী?

হিমোফিলিয়া

মানুষের শরীরে রক্ত জমাট বাঁধার পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে রক্তের অণুচক্রিকা (Blood molecules) এবং বেশ কয়েক ধরনের ফ্যাক্টর কাজ করে থাকে। এই ফ্যাক্টরগুলোর বিশেষ দুটি ফ্যাক্টর অণুচক্রিকা (platelet) এবং প্লাজমা প্রোটিন (Plasma proteins কম মাত্রায় উৎপাদিত হলে রক্তের জমাট বাঁধায় সমস্যা দেখা দেয়। এই সমস্যাকেই হিমোফিলিয়া বলে।

এটি মূলত বংশানুক্রমিক জিনগত একটি রোগ। হিমোফিলিয়া রোগটি হিমোফিলিয়া ডিজঅর্ডার (Hemophilia disorder) নামেও পরিচিত।

সাধারণত এই রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তিদের যদি কোনো প্রকার আঘাত লাগে এবং রক্তপাত হয় তবে এই রক্ত জমাট বাঁধতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে।

আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার জনে একজনের এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই রোগ থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্তিলাভ সম্ভব নয়। তবে সঠিক চিকিৎসা এবং যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে এই রোগাক্রান্ত ব্যাক্তিরা স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবন যাপন করতে পারে।

এটুকু পড়া শেষ করতেই রিশাত দেখতে পেলো তার বন্ধু অরিন তাদের দুজনের জন্যে কফি হাতে নিয়ে এগিয়ে আসছে। সোসাইটির ক্যাম্পেইনে ওদের দুইজনেরই যাওয়ার ইচ্ছা। তাই একসাথে বসে আলোচনা করে এই রোগ সম্বন্ধে যতটা জেনে নেয়া যায় সে জন্যেই ক্যাফেতে বসা।

নিজের চেয়ারে বসতে বসতে রিশাত এখন পর্যন্ত কি তথ্য পেয়েছে সেটা জেনে নিলো অরিন। এবার অরিন আর রিশাত দুইজন মিলে হিমোফিলিয়া (Hemophilia) রোগের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য খুঁজে বের করতে শুরু করলো।

অরিন রিশাতকে দেখালো যে এনজাইম নামের বাংলাদেশী একটি ওয়েবসাইটে এই রোগের বিষয়ে বেশ সুন্দর গোছানো তথ্য রয়েছে। সেখান থেকে তারা এই রোগের কারনগুলো জেনে নিলো।

হিমোফিলিয়া রোগের কারণঃ

সাধারণত মানুষের শরীরের কোন অংশ থেকে রক্তক্ষরণ হলে নির্দিষ্ট কিছু রক্ত কণিকা (Blood cells) স্বাভাবিকভাবেই রক্তজমাট বাঁধতে সাহায্য করে। এই রক্ত কণিকার মাঝে উল্লেখযোগ্য অণুচক্রিকা (platelet) এবং প্লাজমা প্রোটিন (Plasma proteins)। এই দুইটি কণিকার মধ্যে কোনোটির অভাব দেখা যায় তখন এ রোগ হয়।

এটি মূলত একটি বংশগত রোগ হলেও প্রতি তিন জনের মাঝে একজন আক্রান্ত ব্যাক্তির বংশগত কারণ ছাড়াই এই রোগ হতে পারে।

হিমোফিলিয়ার প্রকারভেদঃ

রক্তজমাট বাঁধতে যে সব উপাদান কাজ করে এর যে কোনটির অভাবে এই রোগ হয়ে থাকে, এর উপর ভিত্তি করে এ রোগকে কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়, যেমন –

  1. হিমোফিলিয়া এ (Hemophilia A): ক্লটিং ফ্যাক্টর VIII এর অভাবে হিমোফিলিয়া এ হয়।
  2. হিমোফিলিয়া বি (Hemophilia B): ক্লটিং ফ্যাক্টর IX এর অভাবে হিমোফিলিয়া বি হয়।
  3. হিমোফিলিয়া সি (Hemophilia C): ক্লটিং ফ্যাক্টর XI এর অভাবে হিমোফিলিয়া সি হয়।

“এখন এ রোগের লক্ষনগুলোও তাহলে একটু খুঁজে বের করা দরকার।“ বললো রিশাত। অরিনকে এনজাইমের ওয়েবসাইটে আর কি তথ্য আছে সেটা বের করতে বলে সে নিজে এই রোগের লক্ষণগুলো ইন্টারনেট থেকে খুঁজে বের করে পড়ে শোনালো।

হিমোফিলিয়া

হিমোফিলিয়া রোগের লক্ষণ

হিমোফিলিয়া রোগের লক্ষণসমূহঃ

  • কেটে গেলে বা সামান্য আঘাত পেলে রক্তক্ষরণ হতে থাকা।
  • নির্দিষ্ট কোন কারণ ছাড়াই হাঁটু, পায়ের গোড়ালি ফুলে যাওয়া
  • দাঁতের মাড়ি, পাকস্থলী, মস্তিষ্ক সহ শরীরের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ অংশে রক্তক্ষরণ হওয়া।
  • কোনো পেশিতে রক্তক্ষরণ হলে সেখানে কালশিটে দাগ দেখা যাওয়া।

“শুরুতে যতটা সাধারণ রোগ মনে হয়েছিলো, এখন তো দেখা যাচ্ছে তার চাইতে অনেক মারাত্মক এই রোগ” বললো অরিন। সাথে একটা প্রশ্ন করলো সে,

“হিমোফিলিয়া (Hemophilia) রোগ কি চিকিৎসা করলে পুরোপুরি কমে যায়?

এ বিষয়ে কিছু পাওয়া যায় কিনা দ্যাখ তো? “

রিশাত এই ব্যাপারে খুঁজে যে উত্তর পেলো সেটা অরিনকে জানালো,

এই রোগ সম্পূর্ণভাবে নিরাময় করা যায় না। তবে যে কারণে এই রোগ হয় তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মানুষের রক্তে যে ফ্যাক্টরগুলোর ঘাটতির কারণে  হিমোফিলিয়া হয়ে থাকে, সেই উপাদানগুলো শরীরে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রবেশ করিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা করানোর ব্যবস্থা রয়েহচে। তবে এই চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অন্যদিকে, যথাযথ চিকিৎসার অভাবে এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি পঙ্গু হয়ে যেতে পারে এমনকি রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।

এবারের প্রশ্ন এলো রিশাতের কাছ থেকে। আগের প্রশ্নের সাথে যোগাযোগ আছে তার প্রশ্নের।

“ হিমোফিলিয়া (Hemophilia) রোগের চিকিৎসা কিভাবে করা হয়ে থাকে, আর সে চিকিৎসা করালে কি ধরনের সাইডইফেক্টস দেখা দিতে পারে?”

এটাও আমাদের জানা দরকার।

এবার অরিন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করে রিশাতকে পড়ে শোনালো।

রোগীর অবস্থার উপর নির্ভর করে হিমোফিলিয়ার চিকিৎসা পরিবর্তিত হতে পারে। তবে, ফ্যাক্টর VIII এবং ফ্যাক্টর IX এর অভাবে যে হিমোফিলিয়া হয় সে ক্ষেত্রে রক্তের প্লাজমা পরিবর্তন করার প্রয়োজন পরে। এজন্য একই সাথে নানান ধরনের ইঞ্জেকশনও রোগীকে দেয়া হয়ে থাকে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হিমোফিলিয়া (Hemophilia) রোগীদের অনেক সময় সাধারণ রোগের কিছু ঔষধ সেবন থেকে বিরত থাকার প্রয়োজন হতে পারে। যেমন – এ্যাসপিরিন জাতীয় ঔষধ।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠলো রিশাত। “অনেক বেলা হয়ে গেছে। আর কিছু জানার মতন দেখলি কোথাও” বললো সে। অরিন জবাব দিলো, “কিছু হেলথ টিপস আছে এনজাইমের ওয়েব সাইটে। সেগুলো একটু দেখে নিয়ে বের হই চল।“

হিমোফিলিয়া রোগীদের জন্যে সাবধানতাঃ

হিমোফিলিয়া (Hemophilia) রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে লক্ষ্য সাবধানতা রক্ষা করা প্রথম ও প্রধান একটি কর্তব্য। সবসময় খেয়াল রাখতে হবে যেন তাদের শরীরে বাইরে অথবা ভেতরে রক্তপাত না হয়। তাছাড়া যে কোন ধরনের সমস্যা হলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া লাগবে। প্রাপ্ত বয়ষ ব্যক্তিদের তুলনায় এই রোগে আক্রান্ত শিশু কিশোরদের যেহেতু রক্তপাত হবার সম্ভবনা বেশি থাকে তাদের ক্ষেত্রে কিছু উপায় অবলম্বন করতে হবে:

  • শিশুর দোলনায় বা যে স্থানে শিশু ঘুমায় সেখানে কাপড়ের পুরু স্তর তৈরি করে দিতে হবে।
  • যেসব শিশুরা নতুন হাঁটা শিখছে তারা যেন আঘাতপ্রাপ্ত না হয় সেদিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে।
  • স্কুল-পড়ুয়া শিশুরা যাতে কোনো ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে অংশগ্রহন না করে সেটা অভভাবক এবং শিক্ষকদের খেয়াল রাখতে হবে।
  • এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হেপাটাইটিস এ এবং বি এর প্রতিষেধক নিতে হবে।
  • এ্যাস্পিরিন জাতীয় ঔষধ খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে কারণ তা রক্ত জমাট বাঁধা প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ করে।

বিকেল প্রায় শেষ হয়ে আসছে দেখে অরিন আর রিশাত দুইজন ক্যাফেটেরিয়া থেকে বের হয়ে যে যার বাসার দিকে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হলো। হিমোফিলিয়া (Hemophilia) রোগের বিষয়ে যেটুকু তারা জানতে পেরেছে ,তাতে করে এই রোগের ক্যাম্পেইনে অংশ নেয়ার আগ্রহ তাদের আরো বেড়ে গেছে। যত বেশি মানুষকে এই রোগের বিষয়ে জানানো যাবে অথবা আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যাবে ততই ভালো। তাই আগামীকাল সকালে এসেই ফর্ম জমা দেয়ার পরিকল্পনা নিয়ে সেদিনের মত তারা বিদায় নিলো। 

স্বাস্থ্য বিষয়ে আমাদের অন্যান্য ব্লগগুলো পড়তে ঘুরে আসুন আমাদের ব্লগসাইটের হোমপেজ থেকে।

হিমোফিলিয়া সম্পর্কে আপনার কোনো জিজ্ঞাসা বা পরামর্শ থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুণ ইমেইল, ফেসবুক অথবা ফোন করুণ +০৯৬৩৯০০৬৬২২ নম্বরে।